বিজ্ঞানের ‘অস্ত্র’-এই ‘জখম’ হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! মার্কিন মুলুকেই।

কথায়-বার্তায়, আচার-আচরণে, বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপে গত দু’বছরে যিনি নিজেকে কার্যত, প্রমাণ করেছেন বিজ্ঞানবিরোধী হিসেবে, মার্কিন মুলুকে সদ্যসমাপ্ত মাঝপর্বের নির্বাচনে সেই ট্রাম্পেরই বিজ্ঞান নীতিকে জোর ধাক্কা দিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। বিজ্ঞানকেই ‘হাতিয়ার’ করে।

বহু মানুষের সমর্থন পিছনে নিয়ে ভোটে লড়লেন এমন অন্তত ৫০ জন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রয়েছে যাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতায়। জয়ী হলেন ১১ জন। এর আগে কোনও মার্কিন নির্বাচনে বায়ো়ডেটায় বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা থাকা এত জন প্রার্থী এক সঙ্গে লড়তে নামেননি। এত জন প্রার্থী একই নির্বাচনে জয়ীও হননি। এঁদের মধ্যে অনেকেই আছেন, কস্মিন কালেও যাঁরা রাজনীতির সীমানা মাড়াননি। আমেরিকায় নির্বাচনের ইতিহাসে যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড। বায়োডেটায় বিজ্ঞান থাকা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাও ছিল নজরকাড়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ফলাফল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিজ্ঞানবিরোধী একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপকেই কার্যত, চ্যালেঞ্জ জানাল। বায়োডেটায় বিজ্ঞান থাকা যে ৫০ জন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এ বার ভোটে লড়তে নেমেছিলেন মার্কিন মুলুকে, তাঁদের প্রায় অর্ধেকই এত দিন রীতিমতো অনভিজ্ঞ ছিলেন রাজনীতিতে। রাজনীতিকে তাঁরা এত দিন দূরেই রেখেছিলেন। কিন্তু অনায়াসেই তাঁরা পেরিয়ে গিয়েছেন ভোটপর্বের প্রাথমিক ধাপে প্রাইমারিগুলির নির্বাচন।

আরও পড়ুন- রাশিয়ার ভূত তাড়া করছে ট্রাম্পকে, অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট​

আরও পড়ুন- হাউস খুইয়েও স্বমেজাজে ট্রাম্প, ‘জাদুকর’ তকমা দিলেন নিজেকে!​

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুই বিজ্ঞান নয়, মহিলারাও যোগ্য জবাব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। তিনটি বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বীতস্পৃহার কথা সকলেরই জানা আছে। প্রথমত, তিনি মুসলিমদের পছন্দ করেন না। দ্বিতীয়ত, তিনি পছন্দ করেন না লাতিন আমেরিকার বাসিন্দা বা ‘ল্যাতিনো’দের। আর, তৃতীয়ত, সব সময় মহিলাদের তিনি হেয় করতে ভালবাসেন। কারণে-অকারণে অপমান করতে ভালবাসেন মহিলাদের। ট্রাম্পের সেই ‘সহজাত অভ্যাস’কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতেই এ বার মার্কিন মুলুকের মাঝপর্বের নির্বাচনে বায়োডেটায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থাকা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের মধ্যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল মহিলাদের। অনুপাতের অঙ্কে পুরুষ প্রার্থীর তুলনায় তাঁরা মোটেই খুব একটা পিছিয়ে ছিলেন না।

ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর তাই ভাগেনিনজেনের নেদারল্যান্ডস ইনস্টিটিউট অফ ইকোলজির বিশিষ্ট বিজ্ঞানী কেলি রামিরেজ তাঁর বন্ধুদের পাঠানো মোবাইল মেসেজে লিখেছেন, ‘‘আমেরিকায় আবার ফিরে এলেন মহিলা বিজ্ঞানীরা। অনেক তো কান্নাকাটি হল! এ বার সত্যি-সত্যিই একটা কিছু হোক!’’

রাশিয়া নয়। উত্তর কোরিয়া নয়। লাতিন আমেরিকার কমিউনিস্ট দেশগুলিও নয়। বছরদু’য়েক আগে ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হয়েই রক্তচক্ষু দেখাতে শুরু করেন নিরীহ বিজ্ঞানীদের। একের পর এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদক্ষেপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুঝিয়ে দিতে সময় নেননি যে, বিজ্ঞান তাঁর একেবারেই না-পসন্দ! জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত যাবতীয় গবেষণা, নাসার যাবতীয় ভূবিজ্ঞান গবেষণাকে ‘দুর ছাই’ করে তাদের বাজেট কাটছাঁট করতেও দ্বিধা করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তারই জবাব পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সদ্যসমাপ্ত মাঝপর্বের নির্বাচনে। জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণায় বেশ কয়েকটি পরিচিত নাম। যেমন, ভার্জিনিয়ায় জয়ী হয়েছেন এলেইন লুরিয়া। যিনি এক সময় কাজ করতেন মার্কিন নৌবাহিনীতে। শিক্ষাগত যোগ্যতায় যিনি নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ার। পেনসিলভানিয়ায় জয়ী হয়েছেন ক্রিসি হাওলাহান। প্রাক্তন বিজনেস এগজিকিউটিভ ক্রিসির ডিগ্রি রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। ইলিনয়ে বিজয়ী হয়েছেন লরেন আন্ডারউড। পেশায় যিনি এক জন নার্স আর যাঁকে অনেকেই চেনেন। ইলিনয়েই জয়ী হয়েছেন বায়োকেমিস্ট্রি ও ইঞ্জিনিয়ারি-এর দু’টি ডিগ্রিধারী সিন কাস্টেন। বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী সিন এক সময় ছিলেন মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানবকল্যাণ দফতরের সিনিয়র উপদেষ্টা। চার জনই জিতেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দু’বছরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেওয়া কার্বন ট্যাক্স নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন নীতি, মহাকাশে অস্ত্র-প্রতিযোগিতা নীতি ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ওপর সরকারি জোরজবরদস্তির নীতিই এ বার বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে তুলেছিল মার্কিন মুলুকের মাঝপর্বের নির্বাচনে।