মাঝরাতের তখনও ঘণ্টাখানেক বাকি। ঘড়িতে ১১টা বেজে ৪ মিনিট। রবিবারের হঠাৎ বৃষ্টিতে তাপমান যন্ত্রের পারদ নেমেছে। সাত তাড়াতাড়ি নিঝুম হয়েছে শহর। রবীন্দ্র সদন মেট্রো সংলগ্ন এক্সাইড মোড় ধু ধু করছে। অথচ সেখান থেকে কয়েকশো মিটার দূরত্বে অন্য দৃশ্যপট। এক রেস্তোরাঁ চত্বরের আবহাওয়া তপ্ত হচ্ছে একটু একটু করে। কারণ, ড্রাইভওয়েতে তখন এসে দাঁড়িয়েছে এক সাদা লাক্সারি এসইউভি। ভিতর থেকে নেমে এসেছেন সানি লিয়োনি। যিনি এমন বহু রাতে বহু জনের দীর্ঘশ্বাসের কারণ।
গাড়িতে বসে একটু ত্রস্ত চোখেই চারপাশ মেপে নিচ্ছিলেন। তার পরে ঝট করে নেমে পড়লেন। চারপাশে জমা ভিড় উদ্বেল হল। ঝলমলে অতি সংক্ষিপ্ত স্কার্ট, আঁটোসাঁটো টিউব টপ, গোলাপি রঙের গ্লসি জ্যাকেট আর লাল রিবন বাঁধা ঝিকমিকে স্নিকার্স পায়ে সানি যত কাছে এলেন, ততই স্পষ্ট হতে থাকল তাঁর পুতুল পুতুল ভাব। ঈষৎ কোঁকড়ানো, হাইলাইট করা পিঠ ছোঁয়া খোলা চুল। চোখে পুতুলের মতোই নীলচে আভা। মেদহীন ঝরঝরে নিখুঁত চেহারা।
এক হাত তুলে নিজেই নেচে নিলেন। ছবি: সৌম্যজিৎ দে।
আসার আগে উইকিপিডিয়ায় সানির বয়স জানতে চেয়েছিলাম, ৪৫। সামনাসামনি দেখে মনে হল চেহারার দৌলতে তাঁকে বিশ বছরের তন্বী বলেও চালিয়ে দেওয়া যায়... সে সব ভাবতে ভাবতেই মুখের সামনে তিনি। একনজরেই স্পষ্ট হল চড়া মেক আপ। পুতুল পুতুল ভাব ধরে রাখার পরিশ্রম কম নয়। বয়সের সমস্ত রেখাচিত্র ঢাকতে হয়। কারণ, পুতুলদের বলিরেখা পড়ে না।
তত ক্ষণে সানিকে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন দেহরক্ষীরা। রেস্তরাঁ কাম নাইট ক্লাবের ভিতরে সঞ্চালক ঘোষণা করছেন, ‘‘বেবি ডল ইন দ্য হাউস’’। সেই ঘোষণা শেষ হতে না হতেই গম গম করে বাজতে শুরু করল, ‘রাগিণী এমএমএস’-এ সানির আইটেম সং— ‘ও বেবি ডল ম্যায় সোনে দি, ও বেবি ডল ম্যায় সোনে দি...’ যাঁর জন্য গান, ঘোষণা, তিনি অবশ্য নির্বিকার। তিনি জানেন, এর পরে তাঁকে কী করতে হবে।
সবার চোখ আটকে সানিতে। — নিজস্ব চিত্র।
ছোট্ট সিঁড়ি পার করে উঠলেন দোতলায়, যেখান থেকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন নাইট ক্লাবের রাতের চাকা বা ডিস্ক। হবেন মধ্যরাতের ডিস্ক জকি বা ডিজে, যা চাক্ষুষ করার জন্য লাখ টাকার টিকিটও ছিল ভবানীপুরের ‘লা সোয়ারে’ রেস্তোরাঁয়। ছিল বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে কড়া-নরম পানীয় হাতে সানির ডিজে ‘গিগ’ উপভোগ করার প্ল্যাটিনাম টেবিল। দাম দেড় লাখ টাকা। এ ছাড়া গোল্ড আর সিলভার টেবিলের দাম ১ লক্ষ ২০ হাজার এবং ৬০ হাজার টাকা। ছিল ৪৫ হাজার টাকার টেবিলও। তবে সেখানে সানির স্বপ্নবাস্তব বাতাবরণ আরও ঘনিয়ে তোলার সুরা কম। সানিকে শুধু চোখের দেখার ন্যূনতম মূল্য ছিল ২০০০ টাকা। আর দেখা করে কুশল বিনিময় করতে হলে জনপ্রতি দিতে হবে এক লক্ষ টাকা করে।
সানি প্রথমেই কুশল বিনিময়ের কাজ সেরে নিলেন। বিশেষ অতিথিদের জন্য ছিল আলাদা লাউঞ্জ। সেখানে ঘণ্টাখানেক ধরেই অপেক্ষা চলছিল। প্রায় মিনিট ১৫ সেখানে থেকে সানি এলেন ডিজে কনসোলের সামনে। তখন সাড়ে ১১টা। কানে গোলাপি স্ফটিক বসানো ঝকমকে হেডফোন চাপিয়ে মুহূর্তেই ভোল পাল্টে ফেললেন। এত ক্ষণের মাপা হাসি উধাও। আপাদমস্তক ‘এন্টারটেনার’ মেজাজে মাইক হাতে তাঁর বিদেশি উচ্চারণের ইংরেজিতে বললেন, "কলকাতা খবর কী? পার্টির জন্য রেডি তো?" তার পরেই কনসোলে বোতাম টিপে বাজালেন, ধুরন্ধরের গান ‘তেনু শরারত শিখাওয়া জাদো নেয়না মিলাওয়া...’ শরারত অর্থাৎ দুষ্টুমি। সানি যিনি কি না একদা জনপ্রিয় পর্ন তারকা ছিলেন এবং পরে বলিউড অভিনেত্রী হয়েছেন, তিনি যদি বলেন ‘দুষ্টুমি শেখাবেন’, তবে উপস্থিত জনের মনে ঢেউ উঠতে পারে। সানি বোধ হয় সে কথা বুঝেই পরের গানে বললেন, ‘রাত নশেলি ম্যায় শরারতি হুঁ হাঁ...’ আবার ঘুরে ফিরে শরারত অর্থাৎ দুষ্টুমি। জনতাও বোধহয় সানির দুষ্টুমি বুঝল। ডিজে কনসোলের সামনে হাত তুলে দুলতে থাকা সানির তালে হালকা দোল লাগল নীচের ফ্লোরেও।
ঝলমলে স্কার্ট, টপ আর গ্লসি গোলাপি জ্যাকেটে হাজির হলেন সানি। — নিজস্ব চিত্র।
একটু পরে সানি শোনালেন, আশা ভোঁসলের ‘লায়লা ম্যায় লায়লা’, আবার কখনও হাতে সুরার বোতল তুলে বললেন, ‘‘আপনাদের হাতেও এটা আছে তো, আমার কাছে কিন্তু আছে”। বলেই ছোট্ট গ্লাসে বোতলের পানীয় ঢেলে উল্টো দিকে ফিরে পর পর চুমুক। ঘুরে দাঁড়িয়ে চালিয়ে দিলেন, হনী সিংহের পার্টি সং ‘চার বোতল ভদকা’ সঙ্গে চলতে থাকল সানির দুলে দুলে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচ।
‘লা সোয়ারে’র ফ্লোর জুড়ে টেবিলে টেবিলে উৎসাহী জনগণের ভিড়। হুক্কার ধোঁয়ায় ভরেছে চারপাশ। ষাটোর্ধ্ব এক দল মহিলা, পুরুষকে দেখা গেল সামনের দিকের টেবিলে। হাতে পানীয়ের গ্লাস আর হুক্কার পাইপ নিয়ে গানের তালে দুলছেন চার জন। দেখা গেল সিঁদুর, টিপ, লাল চুড়া (অবাঙালি বিবাহিত মহিলাদের হাতে পরার চুড়ি) পরিহিতা নববধূকেও। স্বামীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে ফ্রাই খেতে খেতে পায়ে তাল দিচ্ছেন তিনি। কলেজপড়ুয়া প্রেমিক-প্রেমিকা থেকে শুরু করে মাঝবয়সি বন্ধুদের দল, সবাই যে যার জায়গায় বসে দুলছিলেন। ‘লা সোয়ারে’ তো ঠিক ডিস্কোথেক নয়, যে ফ্লোরে নেমে নাচবেন লোকজন। কিন্তু সানির বোধ হয় সেটা পছন্দ হল না। নিজের ক্ষমতার ব্যাপারেই খানিক সন্দেহ হল কি? রাত ১২টা বাজতেই তিনি চোখে পরে নিলেন কালো রঙের চশমা, তাতে গোলাপি ক্রিস্টালে লেখা ‘সানি লিয়োনি’। কনসোলের বোতাম টিপে চালালেন ‘কালা চশমা’। হেডফোনে এক হাত রেখে অন্য হাত মাথায় তুলে লাফাতে শুরু করলেন অভিনেত্রী। এর পরেও জনতা নড়ল না। তবে নড়ল না তাঁদের দৃষ্টিও।
ছবি: সৌম্যজিৎ দে।
চার-পাঁচজন পুরুষ বন্ধুকে নিয়ে এক তরুণী এসেছিলেন পার্টিতে। তরুণী সুন্দরী। পোশাক পরেছেন নজর কাড়ার মতোই। ‘কালা চশমা’র তালে নাচছিলেন, বন্ধুদেরও অনুরোধ করছিলেন নাচতে। কিন্তু তাঁরা নাচবেন কী! নীচের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে চার তরুণের দৃষ্টি আটকে সানিতেই। চোখ ফেরালে নিজেদের মধ্যে কিছু হাসাহাসি, তার পরে আবার স্থির তাঁরা। সানি বুঝলেন কি না জানা নেই, তবে জনতা বুঝল ৪৫-এর তরুণী এখনও না বলা মন্ত্রে বশ করার ক্ষমতা ধরেন। তিনি জানেন, তাঁর কাজ মানুষকে আনন্দ দেওয়া। আর তার জন্য ৪৫ পেরিয়ে যদি নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, তবে সেটিই কায়মনে করবেন এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়ে তবেই ছাড়বেন। এক জন পর্ন তারকা থেকে মূল ধারার অভিনেত্রী হওয়ার সানির যে যাত্রাপথ, তা সম্ভবত ওই জেদেরই পরিণাম। যে জেদ হয়তো তাঁর বয়সরেখার মতোই পুতুল পুতুল দেখতে চড়া মেক আপের আড়ালে ছাইচাপা আগুনের মতো ঢাকা পড়ে থাকে।
ভাবতে ভাবতেই দেখলাম ক্যালেন্ডারের তারিখ পাল্টে গিয়েছে। ঘড়িতে ১২টা ৫। গত ৩৫ মিনিট ধরে এক বারও না থেমে ডিজেগিরি চালিয়ে যাচ্ছেন অভিনেত্রী। আরও কিছু ক্ষণ থাকবেন, যত ক্ষণ থাকার কথা তাঁর। কাজ শেষ হলে কলকাতার ভিজে রাস্তা তাতিয়ে ফিরবেন বাড়ি। পরের দিন দুপুরে তাঁকে নিয়ে গল্প জমাবেন দর্শকেরা।