• সায়নী ঘটক
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

জয় করে তবু ভয় কেন?

করোনাজয়ীরাই পারেন অন্যকে সাহস জোগাতে। পোস্ট কোভিড কেয়ার কী ভাবে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে সচেতন হন

Corona Care

করোনা সংক্রমণের বর্ধিত হার দেখে প্রত্যেক দিন সকালে যেমন কপালে ভাঁজ পড়ছে অনেকের, তেমনই মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে সেরে ওঠা মানুষের সংখ্যাও। করোনাকে জয় করে বহু মানুষ ফের ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন, কাজে ফিরছেন আগের মতোই, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে। করোনাজয়ীদের টিম হাত মিলিয়ে কাজ করছেন ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে। তবে করোনামুক্ত হওয়ার পরেও কি ফের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়? পোস্ট-কোভিড পিরিয়ডে কি কোনও বিশেষ যত্নের প্রয়োজন রয়েছে? রোগীর পরিবারের লোকদেরই বা কী করণীয়? করোনা সংক্রমণ ও আইসোলেশনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিও। সেই সঙ্গে সমাজ, প্রতিবেশী, সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। করোনা থেকে মুক্ত হওয়ার পরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভয়, দুশ্চিন্তা, আশঙ্কা কাজ করে। সে সব নিয়ে চিন্তা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প নিন।

 

ভাইরাসের জের

অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার দিন কয়েকের মধ্যেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন সাধারণত। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রকোপ কাটিয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেও দুর্বলতা কাবু করে রাখতে পারে তার পরেও বেশ অনেক দিন। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে ফের আগের মতো শক্তি ও কর্মক্ষমতা ফিরে পেতে রীতিমতো সময় লাগে। তাই পোস্ট-কোভিড কেয়ার রুটিনে আবশ্যিক দু’সপ্তাহের সম্পূর্ণ বিশ্রাম। তার পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন, কাজকর্মে ফেরা যেতে পারে। অবশ্য এর তারতম্য হতে পারে, যা সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর করে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও সহনশীলতার উপরে। দুর্বলতা কাটাতে মাঝের সময়টুকু হাই-এনার্জি ডায়েট, মাল্টি-ভিটামিন ও মিনারেল সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

এ প্রসঙ্গে ডা. অরুণাংশু তালুকদার জানালেন, কোভিড-১৯ ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে যে রোগী সেরে ওঠেন, তাঁর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং তা পরের এক-দেড় মাস পর্যন্ত দেহে সক্রিয় ভাবে থাকে। তাই ওই সময়ের মধ্যে রোগীর ফের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে আড়াই-তিন মাস পর থেকে এর পরিমাণ কমতে থাকে। ‘‘একবার করোনামুক্ত হয়ে যাওয়ার পরে পুনরায় সংক্রমণ হতে পারে কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনও আসেনি। আমরা এই ধরনের কয়েকটি কেসও দেখেছি সাম্প্রতিক অতীতে,’’ বললেন ডা. তালুকদার। তাই তাঁর পরামর্শ, পোস্ট-কোভিড কেয়ারের প্রাথমিক শর্ত বিশ্রাম, দেহে যাতে লং-টার্ম ইমিউনিটি তৈরি হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং বাড়ির বাইরে বেরোলে যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা। কোভিড-১৯ সারভাইভারকে এই তিনটি জিনিস মাথায় রেখে চলতেই হবে। সুস্থ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কাজে যোগ না দিয়ে ধীরে ধীরে ফিরতে হবে স্বাভাবিক ছন্দে। যে কাজেই ফিরুন না কেন, উপযুক্ত প্রোটেকশন নেওয়া প্রয়োজন, করোনা সারভাইভারদেরও।

টেস্ট রিপোর্ট পজ়িটিভ আসার ১৪ দিন পরে ফের তা নেগেটিভ হল কি না, পরীক্ষা করার জন্য আবার যে টেস্ট করানো হচ্ছে, সে ব্যাপারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন ডা. তালুকদার। তাঁর কথায়, ‘‘১৪ দিন একটা গড়। সেটা কারও ক্ষেত্রে ১৬ দিন বা ১৮ দিনও হচ্ছে। আমরা এমন কেসও দেখেছি, যেখানে প্রায় এক মাস হতে চলল, রোগী পজ়িটিভই রয়েছেন। দ্বিতীয় বার টেস্ট করানোর ক্ষেত্রে কিছু জিনিস মাথায় রাখা দরকার। প্রথমত, ১৪ বা ১৬ দিন পরের দ্বিতীয় টেস্টে যদি পজ়িটিভ আসে, তার দুটো অর্থ হতে পারে। এক, ভিতরে ভাইরাসটি রয়ে গিয়েছে এবং তার সব লক্ষণও পরিস্ফূট, তাই পজ়িটিভ। দুই, কোনও লক্ষণ নেই অথচ রিপোর্ট পজ়িটিভ। এর মানে হল, যে পদ্ধতিতে টেস্ট করা হয়, তাতে শুধু দেখা হয় এই ভাইরাসের প্রোটিন টনসিলে আছে না নেই। তা জীবিত না মৃত, তা পরীক্ষা করার কিন্তু উপায় নেই। তাই কেউ সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও কিন্তু ফুসফুস বা গলায় সেই ভাইরাসের কিছু প্রোটিন থেকে যেতে পারে। তখন লালারস পরীক্ষা করলে দেখা যাবে রিপোর্ট পজ়িটিভ আসছে। কিন্তু তা নিষ্ক্রিয় বা মৃত অবস্থায় থাকায় দেহে কোনও লক্ষণ নেই।’’ এই একই কারণে এখন সরকারি তরফে নির্দেশিকা দিয়ে জানানো হয়েছে যে, ১৪ দিন পরের দ্বিতীয় টেস্টটি করা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আইসিএমআর-এর গাইডলাইনও তাই বলছে। তবে যাঁরা সিরিয়াস কন্ডিশনের রোগী, যাঁদের কো-মর্বিডিটি হাই কিংবা কোনও জটিল অসুখ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বা তৃতীয় টেস্টে নেগেটিভ আসার পরেই ছুটি মিলছে। ৭০-৮০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় বার টেস্ট করার পরামর্শ দিচ্ছেন না চিকিৎসকরা। কারণ তাতে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ভয় থেকে যায়।

 

একঘরে নয়

আইসোলেশনের দীর্ঘ একাকিত্ব ডেকে আনতে পারে অবসাদ। প্রতিবেশী ও সমাজের ভ্রুকুঞ্চনে একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। অন্যদের ‘ইলনেস অ্যাংজ়াইটি’ অর্থাৎ সংক্রমিত হয়ে পড়ার ভয় সারাক্ষণ কাজ করে মনের মধ্যে। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি করোনাভাইরাসের প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ভীষণ ভাবে। মনোবিদ ডা. আবীর মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘‘যা আমাদের হাতে নেই, তা নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করবেন না। যে করেই হোক, মাইন্ড ডাইভার্ট করতে হবে, নিজেকে কাজে বা বিনোদনে এনগেজড রাখতে হবে। যাঁরা হোম আইসোলেশনে থাকছেন, তাঁদের থাকার জায়গা থেকে যেন খোলা আকাশ দেখা যায় এক টুকরো। শরীর পারমিট করলে নিজস্ব ছাদে বা বারন্দায় হেঁটে আসা যায়, বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে আড্ডা দেওয়া যায়, এমনকি ওয়র্ক ফ্রম হোমও সম্ভব। আর বই পড়া, ওয়েব সিরিজ় দেখা তো রয়েছেই।’’

সোশ্যাল স্টিগমার প্রভাবে বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী বা ফ্রন্টলাইন ওয়র্কাররা অনেক সময়ে সামাজিক ভাবে ব্রাত্য হয়ে পড়ছেন। তাঁরা আবার চিন্তা করছেন পরিবারের অন্যদের নিয়ে। জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে টেস্ট করাচ্ছেন না, হোম কালেকশনের সঙ্কোচ এড়াতে।

তাই এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। আইসোলেশনে থাকা পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো, ফোনে খবর নিয়ে তাঁদের দরজার বাইরে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিংবা বাজার রেখে আসা, এটুকু করতেই পারেন প্রতিবেশীরা। সমবেত চেষ্টাই মোকাবিলা করবে এই অতিমারির।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন