Advertisement
E-Paper

আনারসি বেনারসিতে ঝলমলে পুতুল, কিন্তু প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল কই! স্টাইল আর ফ্যাশন কোথায় আলাদা?

ফ্যাশন আর স্টাইল নিয়ে দু-চার কথা লিখতে বসেই মনে পড়ে গেল বহু যুগ আগে করা রবিঠাকুরের উক্তি—“ফ্যাশনটা হল মুখোশ আর স্টাইলটা হল মুখশ্রী।’’

শর্মিলা বসুঠাকুর

শর্মিলা বসুঠাকুর

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৯:২১
The relation between style and fashion

মিমি রাধাকৃষ্ণণ। — নিজস্ব চিত্র।

রবিঠাকুর আমাদের বড় সুবিধে করে দিয়ে গিয়েছেন। যে কোনও বিষয় নিয়ে ভাবতে গেলে বা লিখতে বসলে, সময়মতো তিনি ঠিক উঁকি দেবেন মনের জানলায়। মুশকিল আসানের একেবারে ক্লাসিক্যাল উদাহরণ হলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই ফ্যাশন আর স্টাইল নিয়ে দু-চার কথা লিখতে বসেই মনে পড়ে গেল বহু যুগ আগেই তাঁর উক্তি—“ফ্যাশনটা হল মুখোশ আর স্টাইলটা হল মুখশ্রী।“

এই উক্তি বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায়, তা হল ফ্যাশনের নিজস্ব কোনও সত্তা নেই। এ যেন এক বাহ্যিক আবরণ। আরোপিত সত্তায় আচ্ছাদিত। ফ্যাশনের একটা অ্যস্পিরশনাল আঙ্গিক আছে অবশ্যই। হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা আছে। ঘোড়দৌড়ে সামিল হওয়ার বাসনা আছে। তাই তীব্র গতির হাতছানিতে সে লালায়িত। আজ স্টিলেটো তো কাল ওয়েজ হিল, আজ প্রায় আভূমি লম্বা পোশাক তো কাল ব্ল্যাক লিট্‌ল ড্রেস। কোনওটাই স্থায়ী নয়। রেসের প্রতিযোগিতা যেন। ফ্যাশনের দুরন্ত গতির প্রথা-প্রকরণের জালে জড়ালে, আমি যা নই, তা-ই হওয়ার চেষ্টায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও ব্রতী হতে হবে। তাই সে মুখোশ।

গতিশীল বলেই ফ্যাশন পরিবর্তনশীল। দেশ, কাল, সমাজ, ঋতু, সংস্কৃতি-নির্ভর। আবার পরিবর্তনশীল বলেই তার একটা বহমানতা আছে। ফল উইন্টার কালেকশন, স্প্রিং সামার কালেকশন কথাগুলোয় প্রকৃতির মায়াবী রূপ বদলের অনুষঙ্গ ধরা পড়ে। আরেকটি নজরে পড়ার বিষয়, ফ্যাশনের এই গতির স্বভাব হল মাঝে মাঝে ফিরে দেখা। নানা ধরনের আগমন ও প্রত্যাবর্তন নিয়ে ফ্যাশনের যাত্রাপথ। মায়ের বানিয়ে দেওয়া ম্যাক্সি ড্রেস পরে বন্ধুমহলে কত সুখ্যাতি কুড়িয়েছি কিশোর বেলায়। ও মা! ফ্যাশন উইকে সব্যসাচীর কালেকশনে তো সেই একই ম্যাক্সি ড্রেস! মায়েদের আমলের ঘটি হাতা ব্লাউজ়, জ্যাকেট ব্লাউজ় তো আজ সৌখিনীদের হট ফেভারিট। ফ্যাশনের এত রকম বিন্যাসের বিলাসে নিজ বৈশিষ্ট্য কি করেই বা হালে পানি পাবে! তাই তো ফ্যাশন মুখোশ। স্বীয় সত্তাকে ঢাকা দেয় এই মুখোশ। যদিও এ-ও এক ধরনের আত্মপ্রকাশ। এই প্রকাশ প্রয়োজনের, ঠাটবাটের, অহঙ্কারের, দেখনদারির। এই পরিধান লৌকিক।

পোশাকের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা তখনই বাঙ্ময় হয়ে ওঠে, যখন ব্যক্তি ও বস্ত্রের মধ্যে রসঘন রসায়ন তৈরি হয়।

পোশাকের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা তখনই বাঙ্ময় হয়ে ওঠে, যখন ব্যক্তি ও বস্ত্রের মধ্যে রসঘন রসায়ন তৈরি হয়। — নিজস্ব চিত্র

এই আত্মপ্রকাশই আরও বেশি অন্তরের হয়ে ওঠে, স্বতন্ত্র স্বচ্ছন্দ মাধ্যম হিসেবে সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, যখন সে একটু থিতু হয়ে বসে। জমিয়ে ভাব জমায় তার সঙ্গে, যার আলিঙ্গনে সে নিজে তৃপ্ত হবে, পূর্ণ হবে, ঋদ্ধ হবে। সামান্য একটা শাল জড়িয়ে নেওয়ার ধরনে বা পথ চলতে মাঠের ধারে ফুটে থাকা ফুল মাথায় গোঁজার আদলেই সেই আত্মপ্রকাশ, নিজস্ব শৈলীর উদ্‌যাপন, স্টাইল। মৌলিক মায়া, মেধা ও মননের ত্রিবেণী সঙ্গম হল স্টাইল ।

দাঁড়ান, মিমিদির গল্প বলি। তা হলে স্টাইল ব্যাপারটা জলবৎ তরলম হয়ে যাবে আপনাদের কাছে। মিমি রাধাকৃষ্ণণ। শিল্পী। দিল্লি, শান্তিনিকেতন আর কলকাতা মিলিয়ে বসবাস তাঁর। ক্যানভাসে যেমন অনায়াসে রং চড়ান, তুখোড় হাতে গ্রাফিকের কাজ করেন, কাপড়ে সুচের ফোঁড় তোলেন, তেমনই নিমগ্ন সূক্ষতায়। বাড়ি সাজান এমন নান্দনিক বোধে, মনে হয় দু’দণ্ড বসি। অতিথি আপ্যায়নেও সেই একই রুচি। পিরিচ-পেয়ালায় সেই অনন্যতা, যা মিমির বাড়িতেই পাওয়া যায়। সাজে, স্বাদে, সরস রসিকতায় শুধুই স্টাইল। তসরের শাড়ি কিংবা খাদির ঢোলা প্যান্ট, মটকা শাড়ির সঙ্গে এম্ব্রয়ডার্ড মাশরু ব্লাউজ়, সবেতেই আর পাঁচজনের থেকে একেবারে আলাদা। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এই আলাদা হওয়াটা চেষ্টকৃত নয়। আপন বিশ্বাস, বোধ সঞ্জাত।

নির্ধারিত সময়ে হাজির হলাম তাঁর শান্তিনিকেতনের বাড়িতে। নাম ‘মিমির বাড়ি’। দরজা খুলে এক গাল হাসিতে আপ্যায়ন। মরচেরঙা লিনেন সিল্কের শাড়ি, সঙ্গে রুপোর গয়না, মাথায় সাদা ফুল। “এমন এস্থেটিক সেন্স কোথায় পেলে বলো তো?” আমার প্রশ্ন। সোফায় জমিয়ে বসতে বসতে মিমি শুরু করেন—

ক্যানভাসে যেমন অনায়াসে রং চড়ান, তুখোড় হাতে গ্রাফিকের কাজ করেন, কাপড়ে সুচের ফোঁড় তোলেন, তেমনই নিমগ্ন সূক্ষতায়।

ক্যানভাসে যেমন অনায়াসে রং চড়ান, তুখোড় হাতে গ্রাফিকের কাজ করেন, কাপড়ে সুচের ফোঁড় তোলেন, তেমনই নিমগ্ন সূক্ষতায়। — নিজস্ব চিত্র

“আমার মা ছিলেন দারুণ এক রুচিশীলা মহিলা। স্কুলে পড়াতেন। ছিমছাম, ফিটফাট। দারুণ সেলাই করতেন। মায়ের হাতে স্মকিং করা ফ্রক পরে বড় হয়েছি। কিছু কিছু জিনিস থাকে পারিবারিক, জানো। আমার এই সুন্দর ভাবে থাকার পিছনে আমার বেড়ে ওঠার আবহের অনেক অবদান।“ পড়াশোনা, কাজ, সংসার, নানা সূত্রে নানা সময়ে নানা দেশে থাকা। সেই স্থানিক প্রভাবও একজন মানুষের সাজপোশাকে রেখাপাত করে বইকি। “যখন শান্তিনিকেতনে পড়তে এলাম, ডুরে শাড়ি, ছিটের ব্লাউজ়, মেলার রুপদস্তার দুল। অনেকটা চুলের টানটান বিনুনি। সাইকেল চালাতাম। তাই কোমরে শক্ত করে গোঁজা শাড়ি। কোনও এলানো ব্যাপার ছিল না আমার। বরোদা গেলাম যখন, লম্বা চুলে গুজরাতি পরান্দি। ওরা খুব এমব্রয়ডারি করা ব্লাউজ় পরত। আমি অ্যাফোর্ড করতে পারতাম না তখন। কাপড় কিনে নিজেই এম্ব্রয়ডারি করে নিতাম। তার পর দিল্লিতে। স্কুলে পড়িয়েছি কিছু দিন। কিন্তু অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সিন্থেটিক শাড়ি কিনে পরে উঠতে পারিনি। প্লিট করে পিন লাগিয়ে শাড়িও পরিনি। মলে মলে ঘুরে চারটি জিনিস কিনতে আজও ভালবাসি না। এগুলো যে খারাপ, তা বলছি না, কিন্তু আমার ভাবনা, রুচি, পছন্দের সঙ্গে মেলে না।” এই যে স্রোতে গা না ভাসিয়ে নিজের মতো থাকা, নিজস্ব একটা যাপন তৈরি করা, সেটাই স্টাইল। আজও সেলাই তাঁর নেশা। মেডিটেশনের মতো মনে হয় তাঁর। জলা-জঙ্গলে জন্মানো ঘেঁটফুল মাথায় গুঁজে, তার মাতাল করা সুগন্ধে নিজেই বিমোহিত যিনি হতে পারেন, তিনি আদ্যন্ত এক শিল্পী বটে। তাই তো অতি সহজেই বলতে পারেন, “ এই যে সেলাই করি, সেটা তো নানা ভাবনাচিন্তা করতে করতে এগোয়। সামান্য কড়াইশুঁটি ছাড়াতে ছাড়াতেও ভাবনা এগোতে পারে। যে কোনও কাজই তো ডিজ়াইন। ছবি আঁকা, গ্রাফিক, এম্ব্রয়ডারি যা-ই করো না কেন, এগুলি তো ভিতর থেকেই আসে। নান্দনিক বোধও তাই। “

স্টাইল বা স্বকীয় শৈলীর দ্বারা ভিড় থেকে, গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে আলাদা থাকার মননশীলতা বা মেধা কম মানুষেরই থাকে। ঠিক যেমন মুখশ্রী। সাজপোশাক তো সবাই করে। কিন্তু অনুকরণের স্রোতে গা ভাসানো বেশির ভাগ সুন্দরীই বড় একঘেয়ে। আজকাল যে কোনও অনুষ্ঠানে গেলে সুবেশা, সুসজ্জিতা মহিলাদের কেমন যেন এক রকম লাগে। প্রায় সকলেরই হাইলাইট করা সোজা সোজা চুল। দামি শাড়ি বা ড্রেস পরনে। আর ছবি তোলার সময় স্বাভাবিক দাঁড়ানোর ভঙ্গী তো সবাই ভুলেই গিয়েছে! এগুলো কোনটাই খারাপ নয়। কিন্তু আমার কাছে মেকি মনে হয়। এ আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত। সবাই কেতাদুরস্ত, ফ্যাশনেব্‌ল, ঝলমলে, কিন্তু প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়নি যেন। সব্বাই ঝকঝকে, সুন্দর। কিন্তু কেন কাউকে দেখে মনে হয় না, আহা! আর এক বার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি।

আসলে পোশাকের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা তখনই বাঙ্ময় হয়ে ওঠে, যখন ব্যক্তি ও বস্ত্রের মধ্যে রসঘন রসায়ন তৈরি হয়। তখনই ঘাড় ঘুরিয়ে আর এক বার দেখতে ইচ্ছে হয়। এই ‘এক্স ফ্যাক্টর’ই স্টাইল। যার এই স্টাইল প্রতিভা থাকে, চটকদার আনারসি বেনারসির মাঝেও খাদি শাড়িতে তাকে দেখে চোখ জুড়োয়। শুধুমাত্র তার পরার গুণে।

(ছবি: সহেলি দাস মুখোপাধ্যায়, ভাবনা ও পরিকল্পনা: শর্মিলা বসুঠাকুর)

Fashion Tips Style
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy