কাঁধে ঝোলা ব্যাগ আর ঢলঢলে পাজামা পাঞ্জাবি এক কালে ফ্যাশন ছিল বাঙালি ‘ইন্টেলেকচুয়াল’দের। শিক্ষিত বেকার থেকে শুরু করে বইপাড়ার কফি হাউসে আড্ডাধারী শিল্পী-গায়ক-কবি বা গল্পকার— ঝোলা ব্যাগে অভ্যস্ত ছিলেন সকলেই। সে কালের সেই ফ্যাশন যুগের হাওয়ায় ‘সেকেলে’ হয়ে গেল একটা সময়। আধুনিক পুরুষদের কাঁধে উঠল ‘পুরুষোচিত’ ব্যাগ। কিন্তু ফ্যাশন বরাবর আবর্তিত হয়েছে। ফিরেও এসেছে শিকড়ের কাছে। ঝোলা ব্যাগের ক্ষেত্রেও কি তাই হল? এ যুগে নতুন মোড়কে কি তা ফিরে এল পুরুষদের টোটব্যাগ হয়ে? এ বারের গল্পটা খানিক আলাদা।
শান্তিনিকেতনি ঝোলা থেকে টোট ব্যাগের বিবর্তনে ব্যাগের গড়ন এবং আদল খানিক বদলেছে। আগের মতোই চেনহীন খোলা মুখ আর ঝুলে থাকা হালকা অবিন্যস্ত ভাব থাকলেও ব্যাগের হাঁ-মুখ বড় হয়েছে। দৈর্ঘ্যও কিছুটা ছোট হয়ে উঠে ঝোলা ব্যাগ এসেছে কোমরের উপরে। আর সেই ব্যাগ জিম-ট্রেন্ড পেশল শরীরের ‘আলট্রা মেল’রা দিব্যি কাঁধে নিয়ে বেরোচ্ছেন অফিস থেকে আড্ডা কিংবা ডেটিং, সর্বত্র। তাতে তাঁদের ‘স্মার্টনেস’ বিন্দুমাত্র নষ্ট হচ্ছে না। বরং ফুটে বেরোচ্ছে এক অন্য ধরনের আত্মবিশ্বাস।
হলিউডের নায়কদের ইদানীং আকছার এমন ব্যাগ কাঁধে রাস্তায় বেরোতে দেখা যাচ্ছে। বড় বড় আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলি মার্জার সরণিতে পুরুষ মডেলদের হাঁটাচ্ছে স্যুট-প্যান্ট আর টোটব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে। সেই ফ্যাশনের ঢেউ এসে লেগেছে আরবসাগরের তীরে বলিউডেও। নতুন প্রজন্মের নায়ক ইশান খট্টর কিছু দিন আগে টোটব্যাগ কাঁধে নিজের কয়েকটি ছবি দিয়েছিলেন ইনস্টাগ্রামে।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইশানের কাঁধের ঝোলা ব্যাগের ভিতর থেকে উঁকি মারছে এক গোছা ল্যাভেন্ডার ফুল। সেই ব্যাগ কাঁধে হাতে জোড়া কফির কাপ নিয়ে কানে হেডফোন গুঁজে তাড়াহীন ব্যস্ততায় বাইরে বেরিয়েছেন ইশান। যেখানেই যান, তাঁর পেশিবহুল শরীরে লেপ্টে থাকা ছাইরঙা টি শার্ট আর সামান্য ঢোলা জিন্সের কায়দাকে ছাপিয়ে ওই ব্যাগ কিছুটা বাড়তি নম্বর দেবে। কারণ, তাঁকে এক ঝলক দেখলেই বোঝা যাবে, ইনি গুছিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন। পছন্দ করেন পরিচ্ছন্নতা। আর ‘ঝোলা ব্যাগ কাঁধে নিলে স্মার্টনেস নষ্ট হবে’ ভেবে অনাবশ্যক আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন না।
এ সমাজে পুরুষেরা নিজেদের ভাবমূর্তি নিয়ে অনেক সময়ই একটু বাড়তি সচেতন হয়ে পড়েন। অনেকেই এমন কিছু করতে চান না, যা তাঁর ব্যক্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। তার কারণ অবশ্য সমাজই। কারণ, এ সমাজে দাড়ি-গোঁফহীন পুরুষকে এখনও ‘মেয়েলি দেখতে’ শুনতে হয়। কিংবা গলায় হার, কানে দুল, চোখে সুরমা পরে সাজলে শুনতে হয় ‘মেয়েদের মতো সেজেছে’। সেখানে দাঁড়িয়ে টোট ব্যাগ কাঁধে তুলতে গিয়ে যে পুরুষেরা 'কিন্তু' বোধ করবেন, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পথ দেখানোর জন্য বিপ্লব ইতিমধ্যেই ঘটে গিয়েছে।
যাঁদের দেখে মানুষ ফ্যাশন শেখেন, তাঁরাই দিব্যি কাঁধে টোট ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরোচ্ছেন বাইরে এবং সাজগোজের ধরনের জন্য প্রশংসিতও হচ্ছেন। ফলে গৎ ভাঙার সেই রাস্তায় শামিল হতে আর লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বরং এ যুগে ওই ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নিজের ফ্যাশনবোধ জাহির করার সময় এসেছে।
তবে এ ছাড়া পুরুষের টোট ব্যাগ ব্যবহারের ব্যাপারে আরও কিছু যুক্তি দেওয়া যেতে পারে।
১। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলেন পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে। আর গরমে শার্টের পিছনে ব্যাগের চাপে তৈরি হল ঘামের মানচিত্র। বদলে কাঁধে যদি একখানি হালকা কাপড়ের কেতাদুরস্ত টোট ব্যাগ ঝুলিয়ে নেওয়া যায়, তবে যেমন হাতের নাগালে দরকারি জিনিস থাকবে, তেমনই ফুরফুরেও দেখাবে।
২। পরিচ্ছদের অনুষঙ্গ হিসাবে ব্যাগ নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পুরুষেরা সেখানে কেবল কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকপ্যাক, অফিস ব্যাগ, স্লিং আর ল্যাপটপ ব্যাগে আটকে থাকবেন কেন? ক্যাজ়ুয়াল পোশাক পরলে ব্যাগ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন পুরুষেরাও। জিন্স আর টি-শার্টের সঙ্গে একটি কেতাদুরস্ত রঙিন ক্যানভাস টোট ব্যাগ নিলেই এক রকম নির্ভার ভাব আসবে স্টাইলে।
৩। অনেকে ভাবেন, চওড়া কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিলে তা ‘পুরুষোচিত টানটান সাজপোশাক’-এ শৈথিল্য আনবে। কিন্তু জো জোনাস থেকে শুরু করে স্যামুয়েল এল জ্যাকসন, হ্যারি স্টাইলসের মতো হলিউডের তারকারা দেখিয়ে দিয়েছেন, পেশল শরীরে ওই ধরনের ব্যাগের বৈপরীত্যই আসলে সাহসী ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
৪। চাইলে ল্যাপটপ রাখতে পারেন, চাইলে জলের বোতল, এমনকি জিমে যাওয়ার জুতো, তোয়ালে, এক দিনের পোশাকও এঁটে যায় এই ব্যাগে। ফলে জায়গার অভাব নেই কোনও। মোটা কাপড়ে তৈরি হওয়ায় এই ব্যাগ মজবুতও। আর টি শার্টের মতো, এতে বিস্তৃত ক্যানভাসপট রয়েছে। যেখানে ইচ্ছেমতো বার্তা দেওয়ার বা না দেওয়ারও সুযোগ থাকবে।
সব মিলিয়ে ম্যান টোট ব্যাগ বা ম্যান ব্যাগ এ যুগের সংস্কারমুক্ত আত্মবিশ্বাসী পুরুষকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা হওয়ার সুযোগ দেয়। তাই এ বার থেকে সঙ্গিনী নিজের কাঁধের ঝোলা ব্যাগটি আপনাকে ধরতে দিলে বিব্রত বোধ করবেন না। বরং নিজেই চেয়ে নিয়ে দাপটের সঙ্গে স্টাইল করুন।