মাছের ঝোল থেকে সব্জি সেদ্ধ, ভাত থেকে স্যুপ, রান্নায় মুখ্য ভূমিকায় থাকে জল ফোটানোর নানা ধাপ। কিন্তু যত সহজে ‘জল ফোটানো’ বলা হচ্ছে, আদপে কিন্তু তত সহজ নয়। এই জল কত তাপমাত্রায় ফুটছে, কত ক্ষণ ধরে ফুটছে, টগবগ করছে না কি বুদ্বুদ বেরোচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে রান্নার স্বাদ থেকে লক্ষ্য। ইংরেজি অভিধায় এক এক প্রকারের এক এক নাম। বয়েলিং, সিমারিং এবং ব্লাঞ্চিং।
সবই সেই জল ফোটানো, কিন্তু খাবারে এদের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন। কখন টগবগে জলে সেদ্ধ করতে হবে, কখন ঢিমে আঁচে আস্তে আস্তে রান্না হবে, আর কখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফুটন্ত জলে ডুবিয়ে তুলে নিতে হবে— এই সূক্ষ্ম পার্থক্যই বদলে দেয় স্বাদ, রং আর গঠন। এই তিনটি আলাদা পদ্ধতি বুঝে নেওয়াই রান্নার প্রথম পাঠ। এই তিনের অর্থ, ফারাক এবং প্রয়োগ কেমন?
বয়েলিং
টগবগ করে ফোটানো জল। ছবি: সংগৃহীত
রান্নার পাত্রে জল এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি টগবগ করে ফুটতে থাকে। ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায় জলের তাপমাত্রা। জলের উপরের পৃষ্ঠ স্থির থাকে না। সম্পূর্ণ ভাবে সেই ফুটন্ত জলের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয় খাবার। আলু, ডিম, ডাল, ভাত, নুডল্স বা নানা সব্জি দ্রুত সেদ্ধ করতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। খাবার থেকে অতিরিক্ত জলীয় ভাব কমাতেও টগবগ করে ফোটানো হয়। তাপ বেশি থাকে, তাই রান্নাও দ্রুত হয়। তবে বেশি সময় ধরে রাখলে অনেক সময় সব্জি নরম হয়ে গলে যেতে পারে বা স্বাভাবিক স্বাদ হারাতে পারে।
সিমারিং
ঢিমে আঁচে জল ফোটানো। ছবি: সংগৃহীত
এ ক্ষেত্রেও জল ফোটে, খাবার তার মধ্যে থাকে। কিন্তু পার্থক্য থাকে তাপমাত্রায়। টগবগ করে ফোটার ঠিক আগের মুহূর্তে রাখতে হয় জলের তাপমাত্রা। জলে ছোট ছোট বুদ্বুদ ওঠে, কিন্তু টগবগ করে না। আঁচ মাঝারি বা কম রাখা হয়। এই পদ্ধতিতে রান্না ধীরে হয়। ঝোল, পাতলা তরকারি, স্যুপের মতো পদে এই কৌশল দারুণ কাজ করে। ধীরে রান্না হওয়ায় মশলার গন্ধ ভাল ভাবে মিশে যায় পদে। খাবারের গঠনও অক্ষুণ্ণ থাকে।
ব্লাঞ্চিং
জলে ফুটিয়ে সব্জি তুলে নেওয়া। ছবি: সংগৃহীত
জল ফোটে টগবগিয়ে। কিন্তু সব্জি ঢালার কায়দায় মূল তফাৎ এখানে। পুরোপুরি ফুটিয়ে নেওয়ার পর সব্জি বা অন্য উপকরণ কয়েক সেকেন্ডের জন্য জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। তার পর সঙ্গে সঙ্গে হিমশীতল জলে ঢেলে দেওয়া হয়, অথবা কলের ঠান্ডা জলের তলায় রাখা হয়। ফলে কয়েক সেকেন্ডে যে তাপ পেয়েছিল উপকরণগুলি, নিমেষের মধ্যে সেটি উধাও হয়ে যায়। এই পদ্ধতিতে সব্জির প্রাকৃতিক রং উজ্জ্বল হয়, খোসা ছাড়ানো সহজ হয়, আর রান্নার পরবর্তী ধাপের জন্য উপকরণগুলি খানিক প্রস্তুত হয়ে যায়। এই পদ্ধতিটি আসলে রান্নার ধাপ নয়, বরং প্রস্তুতির ধাপ। অনেক ক্ষেত্রে সব্জির পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ রাখতেও এই পদ্ধতিতে আগে প্রস্তুত করে নেওয়া হয় শাকসব্জি। যেমন পালংশাক আগে ব্লাঞ্চিং করে নিয়ে তার পর স্যুপ বানিয়ে খেলে সবচেয়ে ভাল উপকার মেলে।
আরও পড়ুন:
রান্না মানে কেবল রেসিপি অনুকরণ করা নয়। পদের আচরণ বুঝে জলকে নানা ভাবে ব্যবহার করা হয় রান্নায়। আঁচ একটু কম বা বেশি হলেই ফল আলাদা হতে পারে।