আপনি কি খুব অতিথিবৎসল? মাঝে মাঝেই বাড়িতে বন্ধু বান্ধবদের ডেকে জমিয়ে আড্ডা মারেন? তা হলে নিশ্চিন্ত থাকুন। ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত ছোটখাটো অসুখ আপনার কিস্যু করতে পারবে না।
এমনটাই জানাচ্ছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাঁদের মতে, নিমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গেই চলে আসে অনাহূত অতিথিরা—জীবাণু অর্থাৎ কোটি কোটি ব্যাক্টেরিয়া এবং ভাইরাস। কিন্তু তাতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। ক্ষতির চেয়ে বেশি উপকারই হয় এতে। এইসব অনাহূত, অবাঞ্ছিত অতিথিরা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে বলেই তাঁদের দাবি।
গবেষকদের মতে, বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই প্রত্যেক অতিথির শরীর থেকে প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে চার কোটি ব্যাক্টেরিয়া বাতাসে মিশতে থাকে। শুধু তাই নয়, যদি তাঁরা নিঃশ্বাস বন্ধ করেও থাকেন, তা হলেও শুধুমাত্র ত্বক থেকেই প্রতি ঘণ্টায় এক কোটিরও বেশি জীবাণু ঝরে পড়ে। কিন্তু এরা সকলেই ক্ষতিকারক নয়। বরং বেশিরভাগই ভালমানুষ গোছের। শরীরে প্রবেশ করে অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এমনটা যে হতেই পারে তা জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরাও। মাইক্রোবায়োলজিস্ট ভাস্কর নারায়ণ চৌধুরী বলছেন, মানুষের শরীরে কোষের চেয়ে ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ বেশি। এবং পরিবেশে যে সব জীবাণু রয়েছে তারা সবাই ক্ষতিকারক নয়। বরং এদের মধ্যে শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগই উপকারী। তাঁর কথায়, ‘‘এরা অনেকটা ভ্যাকসিনের মতো কাজ করে।’’
কী রকম?
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পরিবেশের মধ্যে থেকে বিভিন্ন জীবাণুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে মানুষ এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। একে বলে অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনিটি। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে কোনও একটি জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে শরীরকে ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করা হয়। ভাস্করবাবু বলছেন, শরীরের নিজস্ব সুরক্ষাবলয় আছে। জীবাণু ঢুকলেই যে রোগ হবে তার কোনও মানে নেই। রোগব্যাধি হওয়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় জীবাণু সংক্রমণ হতে হয়। ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলে ‘ইনফেকটিভ ডোজ’। কোনও বিশেষ রোগের জীবাণু যদি এই নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কম পরিমাণে শরীরে ঢোকে তখন তাকে বাধা দিতে দিতে শরীর তার বিরুদ্ধে একটি নিজস্ব প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলে। তাই পরে সেই রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। উদাহরণ হিসেবে ভাস্করবাবু বলছেন, যেমন একবার চিকেন পক্স হলে পরে আর কখনও হয় না। কিংবা পোলিও ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে শিশুদের বর্জ্যের মাধ্যমে জীবাণু জলবাহিত হয়ে অন্য শিশুর শরীরে প্রবেশ করে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। তাঁর কথায়, ‘‘স্কুলে পড়াকালীন বাচ্চাদের ঘন ঘন জ্বর হওয়া ভাল। এর থেকে বোঝা যায়, শরীর নতুন নতুন জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করছে।’’
একই মত মাইক্রোবায়োলজিস্ট ইন্দ্রনীল রায়ের। পাশাপাশি তিনি জানালেন, বিভিন্ন গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাও অনেক সময় রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গেও জড়িয়ে সেই সব জীবাণুরা। জন্মের পর প্রকৃতির মধ্যে থেকেই মানুষ তার প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। কিন্তু ইদানীং মানুষ চায় ধুলো বালি থেকে যতটা সম্ভব গা বাঁচিয়ে চলতে। শিশুদেরও অতিরিক্ত যত্নে রাখা হয়। আর সে জন্যই প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশুরা। ভাস্করবাবুর মতে, আগে শিশুদের মাটিতে শোয়ানো হতো, খালিপায়ে হাঁটানো হতো। তারা মাঠে ঘাটে ধুলোবালি মেখে অবাধে খেলা করত। আর প্রকৃতির আশীর্বাদে হয়ে উঠত শক্ত ধাতের। তিনি বলেন, ‘‘যে জন্য চিকিৎসকেরা সিজার করার চেয়ে নরমাল ডেলিভারি করাতে চান। এতে শিশুটি জন্মের সময়েই বিভিন্ন জীবাণুর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে আর প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে।’’
তা বলে ভাস্করবাবু বা ইন্দ্রনীলবাবু কেউই অপরিষ্কার থাকার বা হাত না ধুয়ে খাবার খাওয়ার নিদান দিচ্ছেন না। তাঁরা জানাচ্ছেন, প্রয়োজনীয় সতর্কতা সবসময়ই অবলম্বন করতে হবে। কারণ কিছু জীবাণু বেশ ক্ষতিকারক। কিন্তু অতিথি-বন্ধুদের সঙ্গে যে হেতু অনেক অচেনা-অজানা জীবাণু বাড়িতে চলে আসে তাই তাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। আর যত বেশি জীবাণুর সঙ্গে চেনাজানা, তত রোগবালাই কম হওয়ার সম্ভাবনা। ভাস্করবাবু বললেন, ‘‘তাই আড্ডা হোক জমিয়ে।’’
আরও দেখুন:
ওজন কমাতে ভরা পেটে এগুলো এড়িয়ে চলুন