জাতীয় নগর স্বাস্থ্য মিশনের অর্থে এ বার রেলশহরে ৬টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়তে চলেছে স্বাস্থ্য দফতর। মঙ্গলবার খড়্গপুর মহকুমা হাসপাতালে এক সাংবাদিক বৈঠকে এমনটাই জানিয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরিশচন্দ্র বেরা।
এ দিন পুরসভায় একটি বৈঠকও করেন স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা। খড়্গপুর পুর-এলাকায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানোন্নয়নে পুরসভার সহযোগিতায় ওই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি গড়ে তোলা হবে। পুরসভার ‘ইন্ডিয়ান পপুলেশন প্রজেক্টে’ (আইপিপি)-এর আওতায় থাকা বেহাল ৪টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ঢেলে সাজিয়ে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সেই সঙ্গে মহকুমা হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে বলেও জানানো হয়েছে। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরিশবাবু বলেন, ‘‘পুরসভার সঙ্গে ছ’টি আর্বান প্রাইমারি হেলথ সেন্টার খোলা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। আমরা পুরসভার মাধ্যমেই ওই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি গড়ে তুলব। পুরসভার চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’’ ১০ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুরে জেলা পর্যায়ের একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সেখানে পুরসভার পুরপ্রধানেরা ও ন্যাশনাল আর্বান হেলথ মিশনের প্রতিনিধিরা থাকবেন বলে জানা গিয়েছে।
জাতীয় নগর স্বাস্থ্য মিশনের টাকায় পশ্চিম মেদিনীপুরের চারটি শহরে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ঢেলে সাজছে স্বাস্থ্য দফতর। সদ্য ঝাড়গ্রাম ও মেদিনীপুরে সেই কাজ শুরু হয়েছে। এ বার খড়্গপুর মহকুমাতেও শুরু হবে। পুরসভার মাধ্যমে টাকা খরচের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য দফতর। ২০০৯ সালে শহরের নাগরিকদের চিকিৎসা পরিষেবার স্বার্থে কেন্দ্রের আইপিপি-এর আওতায় রাজ্যের ১০টি পুরসভা এলাকায় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নত করার সিদ্ধান্ত হয়। দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী শহরের বাসিন্দাদের জন্যই বিশ্ব ব্যাঙ্কের অর্থ সহযোগিতায় সেই প্রকল্প চালু হয়েছিল। তখন খড়্গপুরের ইন্দা, মালঞ্চ, রাজগ্রাম ও আয়মায় নতুন ভবন গড়ে মোট চারটি ‘হেলথ পোস্ট’ খোলা হয়। পুরনো ৩০টি ওয়ার্ডেও একটি করে ‘সাব-হেলথ্ পোস্ট’ চালু হয়েছিল। কথা ছিল, সাব-হেলথ্ পোস্টে সপ্তাহে তিন দিন চিকিৎসক বসবেন। আর হেলথ্ পোস্টগুলিতে প্রতিদিনই চিকিৎসক থাকবেন। প্রথম দিকে ওই চিকিৎসা কেন্দ্রগুলি শহরে সাড়া ফেললেও ক্রমেই পরিকাঠামোর অভাব ও দায়সারা চিকিৎসার অভিযোগে জনপ্রিয়তা হারায়। বেহাল হয়ে পড়ে হেলথ্ পোস্টের ভবনগুলি।
জাতীয় নগর স্বাস্থ্য মিশনের বরাদ্দ টাকায় নতুন যে ছ’টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার মধ্যে চারটির জন্য আইপিপির হেলথ পোস্টের ভবনগুলিকে কাজে লাগাতে চাইছে স্বাস্থ্য দফতর। আর নতুন করে দু’টি ভবন তৈরি হবে। ৭৫ লক্ষ টাকা করে নতুন দু’টি ভবন গড়তে ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ও পুরনো চারটি ভবনের সংস্কারে ১০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই এক জন মেডিক্যাল অফিসার, এক জন চিকিৎসক, এক জন আংশিক সময়ের চিকিৎসক, দু’জন নার্স, তিন থেকে পাঁচ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। প্রতি হাজার শহরবাসীর জন্য এক জন করে মোট ১২১ জন আশাকর্মীও নিয়োগ করা হবে। বস্তি এলাকায় চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ।
গত ৬ জুন খড়্গপুর মহকুমা হাসপাতালে এক কিশোরের ভাঙা হাতে অস্ত্রোপচারের পরে কিডনি চুরির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল গ্রামবাসী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন, সুনীল মুর্মু নামে ওই কিশোরের হাতে অস্ত্রোপচারের সময় ‘বোন চিপ’ প্রয়োজন হওয়ায় কোমর থেকে তা নেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনায় জেলার উপ-মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গড়া হয়েছিলে। তদন্ত শেষে এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে জানানো হয়, অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে হাসপাতালের অস্থি বিশেষজ্ঞ বিশ্বব্রত হাতি হিপ-জয়েন্ট থেকে অস্থিখণ্ড নিয়েছিলেন। সে কথা জানানো হয়েছিল রোগীর পরিজনদেরও। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক গিরিশবাবু বলেন, “আমরা তদন্ত করে দেখেছি এই ধরনের অস্ত্রোপচার মহকুমা হাসপাতালে বিরল। কিন্তু বিশ্বব্রত হাতি দক্ষতার সঙ্গে তা করেছিলেন। তারপরে যে ভাবে হাসপাতালে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছিল তা দুর্ভাগ্যজনক।’’
তবে ওই বিক্ষোভে কারা ছিল তা শনাক্ত করতে পারেননি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রাজ্যের মহকুমা হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তার স্বার্থে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কথা বলা হয়েছে। জেলার ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালে তা রয়েওছে। এ বার দশটি ব্লকের মানুষের চাপ সামলানো খড়্গপুর মহকুমা হাসপাতালেও সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কথা ভাবছে জেলা স্বাস্থ্য দফতর। এ দিন উপ-মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সৌম্য সারেঙ্গি বলেন, ‘‘রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বিমা যোজনায় আয় হলে এই হাসপাতালের সব দিকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। আপাতত নিরাপত্তার কথা ভেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কথা ভাবা হচ্ছে।’’ এ দিনের সাংবাদিক বৈঠকে গিরিশচন্দ্র বেরা ও সৌম্য সারেঙ্গি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক দেবাশিস পাল, খড়্গপুর হাসপাতালের সুপার কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।