খাইখাই কবিতায় সুকুমার রায় লিখেছেন, ‘জ্যাঠা ছেলে বিড়ি খায় কান ধরে টানিও’। জ্যাঠা ছেলে যদি সত্যিই বিড়ি বা সিগারেট খায় কান ধরে তো টানাই উচিত। কারণ, প্রতিটি সিগারেট ১১ মিনিট করে আয়ু কমায়। ধূমপায়ীদের আয়ু গড়ে ১৪ বছর কমে যায়। জ্যাঠা ছেলে জন্মেই ধূমপান শুরু করে না। সে শেখে। শেখে বড়দের, বন্ধুদের কাছ থেকে। ইতিহাস বলে মায়া সভ্যতার সময় থেকেই মানুষ ধূমপান করে আসছে। তখন ধূমপান হত উৎসবে উপলক্ষে। নবম শতকে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকায় ধূমপানের প্রবণতা বাড়তে থাকে। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে ইউরোপে। সেই সময় ধূমপান করতে গাছের পাতা ব্যবহার করা হত। স্পেনের বাসিন্দারা ভুট্টার খোসা ব্যবহার করত। সপ্তদশ শতকে প্রথম কাগজের ব্যবহার শুরু হয়। 

১৮৩০ সালে ফরাসীরা প্রথম সিগারেট নামটি দেয়। তখন হাতে সিগারেট তৈরি হত। ১৮৪৭ সালে জুয়ান নেপোমুশিনো নামে এক মেক্সিকান প্রথম সিগারেট তৈরির যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তবে সিগারেট তৈরি তুঙ্গে উঠল ১৮৮০ সালে জেমস এলবার্ট বনস্যাকের একটি উন্নত মানের যন্ত্র আবিষ্কারের পরে। আম জনতার মধ্যে সিগারেটের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে বিংশ শতাব্দীর ধারেপাশে। তা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, এমনকি, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়েও সৈন্যদের রেশনে বিনামূল্যে সিগারেট দেওয়া হত। ১৯৭৫ সালে মার্কিন সরকার তা বন্ধ করে। ১৯৬৫ সালে দেখা যায় পুরুষদের মধ্যে ৫০ শতাংশ আর মহিলাদের ৩৩ শতাংশ বছরে ১০০টির বেশি সিগারেট ব্যবহার করছেন। ২০০০ সালে তা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩০ ও ২২ শতাংশ। ২০০৬ সালে দেখা যায় মোট জনসংখ্যার একুশ শতাংশ ধূমপায়ী। জাপানিরা সবচেয়ে বেশি ধূমপান করেন। 

ভারতবর্ষে ধূমপানের উল্লেখ আছে অথর্ববেদে। মনে করা হত, ধূমপান করলে কিছু রোগ সেরে যায়। প্রাচীন কাল থেকে গাঁজা, ভাঙের প্রচলন থাকলেও সিগারেটের প্রতি ভারতীয়দের আসক্তি জন্মায় ইউরোপীয়দের দেখেই। আসক্তি এমনই যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র হিসেবে বিশ্বের মোট ধূমপায়ীদের ১২ শতাংশ ভারতের। প্রায় ১২কোটি মানুষ ধূমপান করেন। এর মধ্যে এক কোটি মানুষ কোনও না কোনও তামাকজাত রোগে মারা যান। ভারতে তামাকজাত রোগে বছরে আট লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০২ সালে হু-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এ দেশে ৭০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কা মহিলা ধূমপান করেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রকের একটি সমীক্ষা দেখাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বেশি ধূমপায়ী আছেন কলকাতায়। এখানে শতকরা ৫৬.৬ জন ধূমপান করেন। এর মধ্যে ৮২ শতাংশ পুরুষ ও ২৩.৫ শতাংশ মহিলা। সবচেয়ে বেশি সিগারেট তৈরি হয় অন্ধ্রপ্রদেশ।

তামাক সেবন করলে যে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় ঊনবিংশ শতকে তা প্রথম অনুমান করেন জার্মানির চিকিৎসকেরা। সিগারেট খেলে যে ফুসফুস ক্যানসারের আশঙ্কা বাড়ে তাঁরাই তা সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। গবেষণায় দেখা যায়, সিগারেটে সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক পদার্থ আছে। তামাক ছাড়াও আছে আর্সেনিক, ফর্ম্যাল্ডিহাইড, সিসা, সায়ানাইড, ইথিলিন অক্সাইড, এসিট্যালডিহাইড, ১.৩ বুটাডিন, এক্রাইলোনাইট্রাইল, এক্রোলিন ইত্যাদি। এর মধ্যে ৭০ থেকে ১০০টি পদার্থ থেকে ক্যানসারের প্রবল আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া, সিগারেট থেকে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, সিওপিডি, হাইপারটেনশন, পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজ এবং গর্ভাবস্থায় ধূমপান করলে গর্ভস্থ শিশুর নানা ক্ষতি হতে পারে। এ তথ্য তো সবারই জানা।

এই সব তথ্য দেখে ১৯৫০ সালে সিগারেটে তামাক ও টারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নিষিদ্ধ করা হল না। ব্যতিক্রম ভূটান। তারা তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করল ২০১০ সালে। বছর দুয়েক পরে এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করল ব্রাজিলও। ১৯৮৫ সালে ছোট্ট দেশ আইসল্যান্ড সিগারেট প্যাকেটের উপর প্রথম সতর্কবার্তা আনল। দেখাদেখি আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপের বাকি দেশগুলি, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, হংকং, সিঙ্গাপুরও তাই করল। ভারতে প্রথম ধূমপান বিরোধী আইন আসে ১৯৭৫ সালে। মানুষকে আরও সচেতন করতে সিগারেটের প্যাকেটের ৪০ শতাংশ জুড়ে যাতে ছবি থাকে সে আইন আনা হল ২০০৯ সালে। তার আগে কড়া পদক্ষেপ করল কেরল হাইকোর্ট। ১৯৯৯ সালের ১২ জুলাই তারা প্রথম জনসমক্ষে ধূমপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ২০০৮ সালের ২ অক্টোবর জনসমক্ষে ধূমপান নিষিদ্ধ হল। ২০০৪ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রিও নিষিদ্ধ হয়। ২০০৭ সালে হেমন্ত গোস্বামীর নেতৃত্ব চণ্ডীগড় হয় ভারতের প্রথম ধূমপান বর্জিত শহর। 

আশার কথা শুনিয়েছে গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে (গ্যাটস)-র রিপোর্ট। তাদের সমীক্ষা বলছে, ভারতে গত সাত বছরে তামাকজাত ধূমপান কমেছে ছ’শতাংশ। হু-র রিপোর্ট বলছে, ২০০০ সালে ধূমপায়ী ছিলেন ১৯.৪ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা কমে হয় ১১.৫ শতাংশ। তাদের আশা, ২০২০ এবং ২০২৫ সালে সংখ্যাটি হবে ৯.৮ ও ৮.৫ শতাংশ।

ধূমপান ছাড়াতে ইচ্ছাশক্তির পাশাপাশি, নিকোটিন গাম, নিকোটিন প্যাচ, লজেন্স, নাকের স্প্রে ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। চেষ্টা করা হয় বুপ্রোপিওন, ভ্যারেনিক্লিন প্রভৃতি ওষুধ দিয়েও। নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি যে খুব ফলপ্রসূ হয় তা নয়। এ ব্যাপারে নবতম সংযোজন হল ই সিগারেট। এটি আবিষ্কার করেন চাইনিজ ফার্মাসিস্ট হন লিক। ২০০৪ সালে এটি প্রথম বাজারে আসে। বছর দশকের মধ্যেই এর ব্যবহার ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০১৪ সালে ১২.৬ শতাংশ আমেরিকান অন্তত এক বার এটি পান করেছেন। ব্রিটেনে ই-সিগারেট ব্যবহার করেন ১৮ শতাংশ ধূমপায়ী। এর ভিতরে যে তরল থাকে তার নাম ই-লিক্যুয়িড বা ই-জুস। এই তরল গরম করে এরোসল বা ভেপার সৃষ্টি করে সুখটান দিতে হয়। তরল হিসেবে থাকে প্রপিলিন গ্লাইকল, গ্লিসারিন, নানা সুগন্ধী। কোনওটাতে তামাক দেওয়া হয়। কোনওটাতে নয়। ছাই থাকে না, গন্ধ থাকে না, কার্বন মনোক্সাইড বেরোয় না, থাকে না টার। তাই মনে করা হয় ই-সিগারেট কম ক্ষতিকর। তবু ই-সিগারেট যে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে সে দাবি করা যায় না। এখনও ধুমপান ছাড়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হল ইচ্ছাশক্তি। পাশাপাশি, শুধু শুকনো সতর্কবার্তা নয় ধূমপানকে বেআইনি ঘোষণা করতেই হবে। আগামী বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবসে এই হোক আমাদের দাবি।

অণ্ডালের চিকিৎসক ও সাহিত্যকর্মী