ছাপচিত্রর জগতে লিনোকাট পেন্টিং অনেক পুরনো পদ্ধতি। তারও আগে হত উডকাট। কাঠের ব্লকে কোনও ছবি এঁকে কোনও কাটার দিয়ে কেটে সেই ছবি ফুটিয়ে তোলা হত। তার পরে সেই ছবির উপরে রং বুলিয়ে তার ছাপ তুলে নেওয়া হত কাগজে। একই পদ্ধতিতে পরে লিনোলিয়াম ব্লকের উপরে ছবি তুলে ছাপ নিয়ে শুরু হয় লিনোকাট পেন্টিং। যদিও লিনোলিয়াম প্রথম ১৮৬০-এর দশকে আবিষ্কৃত হয়েছিল, কিন্তু ছাপার মাধ্যম হিসেবে এর ব্যবহার শুরু হয় উনিশ শতকের গোড়ার দিকে জার্মানিতে। তখন এটি ওয়ালপেপারে নকশা তৈরির জন্য ব্যবহার করা হত। পাবলো পিকাসোর মতো শিল্পীরা লিনোকাট তৈরি করেছেন এবং পরে শিল্পীমহলে এই পদ্ধতি জনপ্রিয়তা লাভ করে।
শান্তিনিকেতনে কলাভবনেও এই পদ্ধতিতে একাধিক কাজ রয়েছে শিল্পী নন্দলাল বসুর। তাঁর হাতে করা লিনোকাটের মহাত্মা গান্ধীর ছাপচিত্র অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ। ‘সহজপাঠ’-এর ছবিগুলোও এই ধরনের ছাপচিত্র পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে করা। রাণী চন্দও এই মাধ্যমে কাজ করেছেন।
লিনোকাট আসলে কী?
অনেকটা স্ট্যাম্পের মতো এই লিনোকাটের কাজ। স্ট্যাম্প বা ব্লক প্রিন্টে যেমন ছাপ চলে আসে, লিনোকাট পেন্টিং-এও তাই হয়। প্রিন্টমেকিং পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হল এই লিনোকাট। শিল্পী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় বললেন, “রবীন্দ্রভারতীতে পড়ার সময়ে আমরা সকলেই লিনোকাট শিখেছি। লিনোলিয়াম ব্লকের উপরে আগে ছবিটা ড্রইং করে নিতে হয়। এর পরে বেশ কিছু ধরনের কাটার থাকে। সূক্ষ্ম ধারালো সেই টুলস দিয়ে খোদাই করে ফেলতে হয় ছবির নির্বাচিত অংশ। এই খোদাই করার সময়ে খেয়াল রাখতে হবে, যে অংশটা ছবিতে সাদা থাকবে অর্থাৎ রংহীন সেই জায়গাটাই খোদাই করে তুলে ফেলতে হবে। আর বাকি উঁচু অংশ কালো হবে।
লিনোকাট পদ্ধতির আগে উডকাটেও এমন কাজ হত। শিল্পী হরেন দাসের অসাধারণ সব কাজ রয়েছে উডকাটে। এ ছাড়া শিল্পী সোমনাথ হোর ও অন্যান্য অনেক শিল্পী নানা ধরনের ছাপাই ছবি করে বিখ্যাত হয়েছেন। তবে কাঠের উপরে খোদাই কাজের চেয়ে লিনোলিয়ামের উপরে এই কাজ করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কারণ কাঠের তুলনায় লিনোলিয়াম নরম হয়।
কী ভাবে করা হয় লিনোকাট?
- লিনোকাটের জন্য লাগে লিনোলিয়াম শিট বা ব্লক। লিনোলিয়াম শিটের উপরের অংশ অনেকটা রাবারের মতো মসৃণ হয়। ফলে এর উপরে খোদাই করা সহজ হয়। তার উপরে ছবিটি আঁকার জন্য পেনসিল ড্রইং করে নিতে হয়
- খোদাই করার জন্য লাগে কিছু টুলস। ‘ইউ’ বা ‘ভি’ আকৃতির কাটার বা স্টিল ব্লেডসের মতো টুলস পাওয়া যায় কিনতে। ‘ভি’ আকৃতির ব্লেড দিয়ে সূক্ষ্ম নকশা তৈরি করা হয় আর ‘ইউ’ আকৃতির টুলস দিয়ে সেটা তুলে পরিষ্কার করা হয় লিনোকাটের ব্লকটা।
- এর পরে লাগবে কালি। ওয়াটার-বেসড বা অয়েল-বেসড কালি নেওয়া যায়।
- লিনোলিয়াম ব্লকের উপরে ছবি তৈরি হয়ে গেলে এর উপরে রোলার দিয়ে ভাল করে কালি লাগিয়ে নিতে হবে।
- সব শেষে কাগজের উপরে সেই ব্লক বসিয়ে ছাপ তুলে নিতে হবে। এই ভাবেই তৈরি হয় লিনোকাট ছাপচিত্র।
- অনেক সময়ে একটা ব্লকে ছাপচিত্র তৈরি না করে, অনেক শিল্পীই একাধিক ব্লক ব্যবহার করেন। এতে একটা ছবির মধ্যে অনেক রঙের ব্যবহার করা যায়।
তবে বাচ্চারা এই কাজ প্রথম করার সময়ে, অবশ্যই অভিভাবকরা খেয়াল রাখবেন যেন হাত না কেটে যায়। লিনোকাট করার মজা হল, একবার একটা ছবি খোদাই করা গেলে তার থেকে অনেক ছাপচিত্র তৈরি করা যায়। ফলে বাচ্চারা এই কাজে বেশ আগ্রহ পায়। অনেকেই নিজের পছন্দের অবয়বের স্ট্যাম্প তৈরি করে নিতে পারে এই লিনোলিয়াম ব্লকে। এই ধরনের কিট এখন সহজলভ্যও বটে। অনলাইনে বা আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট স্টোরগুলোতে লিনোলিয়াম ব্লক, ব্লেড, টুলস, ইঙ্ক-সহ পুরো সেট কিনতে পাওয়া যায়। বাচ্চাদের জন্মদিনেও এমন কিছু উপহার দিতে পারেন। অভিনবও হবে, ছোটরা নতুন একটা শিল্প শিখতেও পারবে।
এতে যেমন বাচ্চাদের সৃজনশীলতা বাড়বে, কাজের প্রতি মনোযোগ, ধৈর্যও বাড়বে। নতুন কিছু সৃষ্টি করার আনন্দ তো উপরি পাওনা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)