সবুরে মেওয়া ফলে! প্রাচীন এই প্রবাদকে ভুল প্রমাণ করে দেখাচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক এবং বিশেষত সাংসদেরা।
শাসক তৃণমূলের আমলে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে কাজের প্রয়োজনে আদানপ্রদান বন্ধ, সৌজন্যমূলক যোগাযোগেও আড়ি ছিল। গোপনে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে বার্তা পাঠাতেন শাসক শিবিরের কেউ কেউ। জমানা বদলাতেই প্রাক্তন শাসক শিবিরের জনপ্রতিনিধিরা রীতিমতো দৌড় লাগিয়েছেন বর্তমান শাসকের দিকে! বিদ্রোহকে ‘ঠিক পথে’ নিয়ে যেতে ঘনঘন দিল্লি যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।
ঘটনাপ্রবাহ দেখে শাসক ও বিরোধী, দুই শিবিরের অন্দরেই প্রশ্ন উঠছে— তৃণমূলের সাংসদদের এত তাড়া কেন? বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজয় মানতে চাননি। বরং, দাবি করেছেন, তাঁর দলকে অন্যায় ভাবে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের নির্বাচিত বিধায়কদের বড় অংশের আশঙ্কা, বালিতে মুখ গুঁজে বাস্তবকে অস্বীকার করলে এলাকায় তাঁদের রোষের মুখে পড়তে হবে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল বিধায়কদের একাংশের সই জাল করার অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে সদ্যনির্বাচিত বিধায়কদের দুই-তৃতীয়াংশই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সাংসদেরা? লোকসভা নির্বাচন এখনও তিন বছর দূরে। রাজ্যসভার সাংসদদের মেয়াদ এক এক রকম। তা হলে তাঁরা কেন এত দ্রুত বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখাচ্ছেন?
এই ভাঙনের পিছনে শাসক বিজেপির চাপ ও ভয় দেখানোর কৌশলের অভিযোগ চর্চায় ইতিমধ্যেই এসেছে। দুই শিবিরের অন্দরে ঢুকলে উঠে আসছে দেওয়া-নেওয়ার গল্পও। তৃণমূল সাংসদদের বড় অংশই ডুবন্ত জাহাজ ছেড়ে আসার সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছেন। সংসদে বিল পাশ করানোর প্রয়োজনে বিজেপিরও বাড়তি সংখ্যার দিকে নজর ছিল। অতএব, পারস্পরিক স্বার্থ মিলে গিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বার্তা নিয়ে তাঁর বিশ্বস্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদব এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জালে মাছ তুলছেন! কিছু মাছকে ‘খেলাতে’ হচ্ছে, তবে বেশির ভাগই ‘ধরা’ দিচ্ছে!
সূত্রের খবর, বিদ্রোহী সাংসদ ও বিধায়কদের একাংশ সুযোগ পেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নানা আর্জি জানাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীও এই অল্প দিনে কত রকমের আর্জিতে যে ‘তথাস্তু’ বলেছেন, তার কোনও লেখাজোখা পরিষ্কার করে কারও কাছে নেই। তৃণমূলেরই এক রাজ্য নেতার কথায়, “এক হাতে আশ্বাস দিয়ে এবং অন্য হাতে সমর্থন নিয়ে দাদা (শুভেন্দু) এখন দিদির খেলা শেষ করছেন! যে দল ছেড়ে বেরিয়ে আগের পাঁচ বছর ধরে তাঁকে ‘গদ্দার’ আওয়াজ শুনতে হয়েছে, সেই দলেরই ঘর তছনছ করে তিনি এখন পাল্টা জ্বালা ধরাচ্ছেন।”
বিদ্রোহী সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় বা খলিলুর রহমানেরা প্রায় এক সুরেই অভিযোগ করছেন, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তাঁদের মতামত জানানোর সুযোগ ও মূল্য ছিল না। মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতার বর্ম সরে যাওয়ার পরে বাকিদের মুখ খোলার রাস্তা সহজ হয়েছে। সেই সঙ্গেই এক সাংসদের বক্তব্য, “সংসদে প্রশ্ন করা বা এলাকার প্রয়োজনে কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে চিঠি দেওয়ার স্বাধীনতাও আমাদের ছিল না। এখন রাজ্যে সরকার বদলের পরে দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মামলা এবং আরও যে নানা সমস্যায় পড়েছেন, সেখানে তাঁদের জন্য নেতৃত্বের তরফে সহায়তা মিলছে না। তিন বছর পরে কী হবে, পরের কথা। এই অচলাবস্থা থেকে এখন বেরোনো দরকার।”
তবে নেতৃত্বের দিকে অভিযোগের আঙুল তুললেও তৃণমূলের সাংসদদের একাংশ বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই এলাকায় অদৃশ্য। কেউ দিল্লিতে চুপচাপ অপেক্ষা করেছেন, কেউ অন্যত্র বসে সমাজমাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন। এখন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এই সাংসদ ও বিধায়কদের কেউ কেউ আর্জি জানাচ্ছেন অনুগামী কারও বিরুদ্ধে মামলা শিথিল করার, কেউ আশ্বাস নিচ্ছেন বিশেষ কোনও কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার। আর খোদ মুখ্যমন্ত্রী কেন তাঁদের মাঝে যাচ্ছেন? বিজেপির এক নেতার মতে, “কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পরিকল্পনামাফিক কাজ করছেন মুখ্যমন্ত্রী। এটাও বুঝিয়ে দেওয়া
হচ্ছে, ভোটের এক মাসের মধ্যে তৃণমূলে এত বড় একটা অভিযান তাঁর পক্ষেই সম্ভব!”
তৃণমূল বিধায়ক ও মুখপাত্র কুণাল ঘোষের প্রশ্ন, “এতগুলো লোকের একসঙ্গে এক দিনে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসে সমস্যা তৈরি হল কী করে? অনেকের আবার কত পুরনো অভিযোগ মনে পড়ছে! দল পরাজিত, কর্মীরা আক্রান্ত, এই সময়ে প্রতিপক্ষের হাতে তামাক খেয়ে দল ভাঙার খেলা যারা খেলছে, তাদের আদৌ বিবেক আছে?”
দীর্ঘদিন তৃণমূলে কাটিয়ে আসা এবং অধুনা বিজেপি সরকারের বর্ষীয়ান মন্ত্রী তাপস রায়ের মত, “সাংসদদের এত তাড়া ছিল না ঠিকই। যাঁদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ আছে, তাঁদের কথা জানি না। তবে অন্যেরা অপেক্ষায় ছিলেন দিন বদলের। সেই অম্বিকেশ মহাপাত্র, অশোক গঙ্গোপাধ্যায়, শিলাদিত্য চৌধুরী থেকে রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস বা সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়— হেনস্থা করতে তৃণমূলের সরকার কাউকে ছাড়েনি! মমতা কারও কথা শোনেননি, আর ওই ডেঁপো ছেলেকে (অভিষেক) দলের কেউ মানতে চাননি।” তাঁর সংযোজন, “মানুষের মন দ্রুত পড়তে পারেন বলে যে তৃণমূল নেত্রীকে ‘লেডি চাণক্য’ ধরা হত, তিনি এই অবস্থা বুঝতে পারলেন না! তার মানে, হয় কোনও দিনই বুঝতেন না, নয়তো মোহে অন্ধ থেকেছেন!”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)