১২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু উচ্চ মাধ্যমিক। হাতে সময় একেবারেই নেই। শেষ মুহূর্তে যখন পাঠ্যক্রম ঝালিয়ে নেওয়ার পালা, তখন তিথির যেন মনে হচ্ছে, সব শেষ, পরীক্ষায় আর ভাল ফল করা হবে না।
এমনিতে তিথি পড়াশোনায় ভালই। তবে পরীক্ষা আসার সময় থেকেই প্রবল ভয় চেপে বসে তার মনে। পরীক্ষার সময় ভীতি স্বাভাবিক। পরীক্ষা কেমন হবে বা ফল নিয়ে উদ্বেগও অমূলক নয়। কিন্তু তিথির জীবনে এই ভয় যেন মাত্রাছাড়া। যতই পরীক্ষা এগিয়ে আসে, এক অদ্ভুত ভয় চেপে বসে। খেতে বসলেই গা-বমি। ঘুম ভেঙে যায় বার বার। পড়তে গেলেই শরীর অস্থির লাগে। বুক ধড়ফড় শুরু হয়। তিথির মতো এমন সমস্যা হয় বহু পরীক্ষার্থীরই। উচ্চ মাধ্যমিকের মতো পরীক্ষা ভাল ভাবে দিতে হলে, এই ভয়কে বশে আনতেই হবে। কিন্তু কী করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবেন পরীক্ষার্থীরা, বাবা-মায়ের ভূমিকাই বা কী হবে?
উচ্চ মাধ্যমিকের মতো পরীক্ষায় ভাল ফল করা ভবিষ্যতের জন্য খুব জরুরি, জানেন সব পরীক্ষার্থীরাই। তা ছাড়া, পড়ুয়াদের নিয়ে অভিভাবকদের প্রত্যাশাও থাকে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, ফল যদি আশানুরূপ না হয়, প্রশ্নপত্র কঠিন হলে কী হবে, এমন সব বিষয় নিয়ে আতঙ্কই এই সময় চেপে বসে পড়ুয়াদের মনে।
মনোরোগ চিকিৎসক শর্মিলা সরকার বলছেন, ‘‘পড়ুয়াদের হঠাৎ করেই মনে হয়, কিছু মনে থাকছে না। মনঃসংযোগ করতেও সমস্যা হয়, দৈনন্দিন কাজও তারা ঠিক ভাবে করতে পারে না। একেই বলে পরীক্ষা ভীতি। সেই ভীতি যদি স্বাভাবিক জীবনকে প্রভাবিত করে, তা হলে সতর্কতা জরুরি। কখনও এই ভীতি থেকেই ‘প্যানিক অ্যাটাক’-ও হতে পারে। আচমকা বুক ধড়ফড়, ঘাম হওয়া, শরীরে অস্বস্তি, মনে হতে পারে ঘাড়ের কাছে গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি। তেমনটা হলে প্রথমেই শান্ত হয়ে বসে গভীর ভাবে শ্বাস নিতে হবে এবং ছাড়তে হবে। বার কয়েক করলে প্রাথমিক ধাক্কা সামলানো সম্ভব হবে।’’
আর কোন ধরনের সমস্যা হতে পারে
· গা বমি ভাব, খেতে ইচ্ছা না করা
· বাড়ির খাবার খেয়েও আচমকা পেটখারাপ, বমি
· ঘুমোতে সমস্যা, প্রবল ভয় মনে চেপে বসা
· হাত-পা কাঁপা, গলা শুকিয়ে যাওয়া
· পড়তে বসলেই মনঃসংযোগের অভাব
কখনও কখনও কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে, সতর্ক করছেন মনোরোগ চিকিৎসক। তবে তা খুব একটা স্বাভাবিক নয়, বা সচরাচর হয় না। ভীষণ রকম উদ্বেগ হলে এবং তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকলে এমনটা কারও মনে হতে পারে।
মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?
পরীক্ষা যখন দোরগোড়ায়, নতুন করে পড়ার সুযোগ আর থাকে না। এই পরিস্থিতিতে কাউন্সেলিং করানোরও সময়-সুযোগ থাকে না। তাই পড়ুয়ার ভয় নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসতে হবে অভিভাবকদের। সাধারণ কয়েকটি অভ্যাসই পরীক্ষা ভীতি সামাল দিতে সাহায্য করবে। মনোবিদ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘প্রাণায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়া বার কয়েক করলেই মন একটু শান্ত হবে। এ ক্ষেত্রে মনঃসংযোগ চলে যাবে শ্বাস নেওয়া এবং শ্বাস ছাড়ার দিকে। বক্স ব্রিদিং-সহ শ্বাসপ্রশ্বাসের কিছু ব্যায়াম এই সময় নিয়ম মেনে করলে, মানসিক চাপ কিছুটা হলেও বশে রাখা সম্ভব হবে।’’
বক্স ব্রিদিং: শ্বাস নিতে হবে নির্দিষ্ট ছন্দে, কয়েক সেকেন্ড শ্বাস ধরে রেখে আবার ছন্দোবদ্ধ ভাবে তা ছাড়তে হবে। বার কয়েক এমন করলে, শরীর একটু ভাল লাগবে। স্নায়বিক উত্তেজনা এতে ধীরে ধীরে কমবে।
গ্রাউন্ডিং টেকনিক: বুক ধড়ফড় করা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা প্যানিক অ্যাটাকের উপসর্গ দেখা দিলে গ্রাউন্ডিং টেকনিক পরীক্ষার্থীকে শান্ত হতে সাহায্য করবে। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষার্থীকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘সামনে কোন ৫ টি জিনিস দেখতে পাচ্ছ, বলো’, ‘কোন কোন আওয়াজ শুনতে পাচ্ছ’। এই সব প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলেই তার মন ভয় থেকে সরে অন্য বিষয়ে চলে যাবে। এতেই ধীরে ধীরে সে স্বাভাবিক হবে।
পায়ের পাতা মেঝেয় রাখা: জোর করে চাপ দিয়ে পায়ের পাতা মেঝেয় ধরে রাখতে হবে আবার কয়েক সেকেন্ড পরে ছাড়তে হবে।
হাতের মুঠো: হাত দৃঢ় ভাবে মুঠো করতে হবে, কয়েক সেকেন্ড রেখে খুলতে হবে।
অনিন্দিতা জানাচ্ছেন, এই ধরনের ব্যায়ামগুলিতে মনঃসংযোগ পেশির দিকে চলে যায়, ফলে ভয়ের অনুভূতি কমতে থাকে।
অভিভাবকদের কী করণীয়
এই সময়ে অভিভাবকদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা জীবনের চেয়ে বড় নয়, তা সন্তানকে বোঝাতে হবে। জীবনের প্রতি পদেই পরীক্ষা, তার মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকও একটা। পরীক্ষা ভাল-খারাপ হতেই পারে, কী হবে সেটা না ভেবে শেষ মুহূর্তে শান্ত ভাবে পড়াটা ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।
মনোবিদ বলছেন, পড়ুয়ারা অনেক সময় অমূলক ভয় পায়। তাদের মনে হয়, বুঝি প্রশ্ন অচেনা পড়বে বা লিখতে গিয়ে লিখতে পারবে না। এই ভয়গুলি যে অমূলক, তা পড়ুয়াদের নিজেকে নিজেই বোঝাতে হবে। বরং পরীক্ষা ভাল হবেই, এই মনোভাব বজায় রাখা দরকার।
মনোরোগ চিকিৎসক বলছেন, ‘‘পরিস্থিতি যদি হাতের বাইরে বেরিয়ে যায়, পরীক্ষার্থী ভীষণ রকম ভয় পায় বা তা থেকে শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে ‘অ্যাংজিওলাইটিক’ বা হালকা কোনও উদ্বেগ কমানোর ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে দেওয়া যেতে পারে।’’