তর্ক গরম কফি বনাম ঠান্ডা কফির নয়, বা দু’রকম কফির ভক্তদের মধ্যে ঝগড়া বাধানোও লক্ষ্য নয় এ আলোচনার। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বসার কারণ সামান্যই। আর তা হল, এই গরমে যখন ক্যাফেতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাবেন কিংবা বাড়িতেও আয়েস করে বসার আগে ভাববেন ‘এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে বসি’, তখন নিজের জন্য কোন কফি বেছে নেবেন? বরফকুচি দেওয়া কোল্ড কফি, না কি এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি। কোনটি খেলে গরমে শরীরের অস্বস্তি বাড়বে না অথচ প্রিয় পানীয়ের তৃপ্তিও মিলবে? প্রশ্নটি যতখানি সরল, উত্তর তেমনটি নয়।
যে শহরের তাপাঙ্ক পায়ে পায়ে ৪০ ডিগ্রির পথে, সকাল ১০টা বাজার আগেই টের পাওয়া যাচ্ছে বাইরের গনগনে আঁচ, চিকিৎসকেরা ক্রমাগত বলে চলেছেন নানা রকম খাবারে, পানীয়ে শরীর, বিশেষত পেট ঠান্ডা রাখার কথা, সেখানে তপ্ত দিনে গরম কফিতে চুমুক দিলে কতটা শীতল থাকবে শরীর?
ডাবের জল, দইয়ের ঘোল কিংবা মৌরি-মিছরির জল খেয়ে স্বস্তি দেওয়া শরীরকে কি ব্যস্ত করা উচিত গরম কফি খেয়ে? পুষ্টিবিদদের এ প্রশ্ন করতে তাঁরা জানালেন, গোটাটাই নির্ভর করছে যিনি খাচ্ছেন, তাঁর পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং শারীরিক অবস্থার উপর।
কোল্ড কফি কতটা উপকারী?
পুষ্টিবিদ শ্রেয়া চক্রবর্তী যেমন মনে করেন, গরমে কোল্ড কফি তরতাজা বোধ করার জন্য খাওয়া যেতেই পারে। কারণ, তাঁর মতে, “কোল্ড কফি শরীর এবং মনকে এক চুমুকেই নিমেষে আরাম দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, যা গরম কফিতে হবে না, কিন্তু যদি কফিতে দুধ, ক্রিম এবং প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে, তবে কফি গরম হোক বা ঠান্ডা, তা শরীরের জন্য খুব স্বাস্থ্যকর হবে না মোটেই।”
পুষ্টিবিদ রুপালি দত্ত আবার বলছেন, “দুধ ক্রিম চিনি দিয়ে তৈরি কফি যদি খাওয়া হয়, তবে সেটি ঠান্ডা হোক বা গরম, তার থেকে অ্যাসিডিটি এবং পেট ফাঁপার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, ডায়াবেটিসের রোগী বা হার্টের রোগীদের জন্যও তা স্বাস্থ্যকর নয়।”
তা হলে কী করবেন? গরমে কি কোল্ড কফি খাবেন নাকি খাবেন না?
কেন খাবেন?
১) শ্রেয়া বলছেন, “কফিপ্রেমীরা কফি খান মস্তিষ্কে ক্যাফিনের প্রভাবের জন্য। ক্যাফিন মস্তিষ্ককে ক্ষণিকের উত্তেজনার জোগান দেয়। সেই দিক থেকে দেখলে গরম এবং ঠান্ডা দু'রকম কফিতেই পর্যাপ্ত ক্যাফিন থাকে। গরমকালে সেই একই প্রভাব যদি ঠান্ডা পানীয়ে মেলে তবে না খাওয়ার কোনও কারণ নেই।
২) গরমকালে কোল্ড কফির ঠান্ডা অনুভূতি শরীরে যে শীতল অনুভূতি আনে, মুহূর্তে মেজাজ ভাল করে দেয়। তাই শ্রেয়ার পরামর্শ, “মেজাজ ভাল করার উপায় হিসাবে গরম কালে মাসে দু’-তিন বার নিজেকে কোল্ড কফির ট্রিট দেওয়া যেতেই পারে। কারণ, মনমেজাজ ভাল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।”
এক কাপ কোল্ড কফিতেই শীতল হবে শরীর।
৩) রুপালি মনে করেন, রেস্তরাঁয় গিয়ে ঠান্ডা কফি খাওয়ার বদলে কেউ যদি বাড়িতে কোল্ড কফি বানিয়ে খান, তা হলে বেশি ভাল। কারণ, সেক্ষেত্রে চাইলে তাঁরা কফিতে চিনি কমাতে পারবেন, দুধ ছাড়া ব্ল্যাক কফিও ঠান্ডা করে খেতে পারবেন, অথবা বাদ দিতে পারবেন বাড়তি ক্রিম। তাতে, ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
আরও পড়ুন:
কখন সতর্ক হবেন?
১) হার্টের রোগ এবং ডায়াবিটিসের সমস্যা থাকলে দুধ, চিনি, ক্রিম দেওয়া উচ্চ মাত্রার ক্যালোরি যুক্ত কফি এড়িয়ে চলাই ভাল, মনে করেন রুপালি। তাঁর মতে খুব খেতে ইচ্ছে করলে ক্রিম বাদ দিয়ে এবং চিনি কমিয়ে পরিমাণ মেপে খাওয়া উচিত। তবে সেক্ষেত্রে বিচার্য কফির তাপমান নয়, কফির উপাদান।
২) অনেকেরই বেশি ঠান্ডা খেলে গলার অস্বস্তি শুরু হয়, যা সংক্রমণের পর্যায়েও যেতে পারে। শ্রেয়া বলছেন, সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঠান্ডা কফি এড়িয়ে চলা উচিত।
৩) দুই কফিতেই পুষ্টিগুণ তেমন নেই বললেই চলে। তবে যেহেতু কোল্ড কফিতেও ক্যাফিন সম পরিমাণেই থাকে, তাই রাতের দিকে খেলে নিদ্রাহীনতার মতো সমস্যা বাড়তে পারে, বেশি খেলে উদ্বেগের সমস্যাও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন শ্রেয়া।
সোজা কথায় কফি গরম নাকি ঠাণ্ডা তার থেকে বেশি জরুরি হল কফিতে উপকরণ কি মিশছে। যদি অতিরিক্ত ক্রিম, চিনি ইত্যাদি থাকে তবে কফি গরম হোক বা ঠাণ্ডা, প্রভাব অল্প বিস্তর একই। সে দিক থেকে দেখলে ঠাণ্ডা কফি গরম কালে কিছু বাড়তি আরাম আর ভাল লাগার জোগান দেবে। তবে যদি ঠাণ্ডা লাগার সমস্যা থাকে তবে কোল্ড কফি বুঝে খাওয়াই ভাল।