‘বিয়ে মানে‌ সাত জন্মের  সম্পর্ক’। কেতাবি কথা শ্রুতিমধুর। কিন্তু বাস্তব এত পেলব নয়। যে কোনও মুহূর্তেই ভাঙতে পারে স্বপ্নের ঘরবাড়ি। বিশ্বাসঘাতকতা, একঘেয়েমির মতো কারণগুলি তো রয়েছেই। এ ছাড়া সম্পর্ক কখন, কী ভাবে, কোন আঘাতের টুং শব্দেও ভেঙে খানখান হবে কেউ আগাম বলতে পারে না। যাত্রাপথ লম্বা, তাই সময় লাগলেও ঘা শুকিয়ে আমরা ফের চলা শুরু করি, বুক ফাটে, তবু লড়তে হয়। কিন্তু বিপদে পরে ছোটরা। বাবা মায়ের সম্পর্ক ভাঙার বড় মাশুল গুণতে হয়  তাদের জীবন দিয়ে।

অল্প বয়েসের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছাপ ফেলে তাদের ব্যবহারিক জীবনেও। সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে অনেকে অনেক কিছু মেনে নেন, মানিয়ে নেন। কিন্তু মানিয়ে নিতেই হবে এমন মাথার দিব্যি তো নেই। তা ছাড়া যে সম্পর্কে আত্মা নেই, তাকে বহন করার মতো গ্লানিও আর দ্বিতীয়টি নেই।

কিন্তু নিজেদের মধ্যে চলতে থাকা ঝড়ঝাপ্টার মধ্যেও কি সুন্দর ভবিষ্যত দেওয়া সম্ভব সন্তানকে? কী করলে সন্তানের নরম মন এই আগুনের আঁচে পুড়বে না?

আরও পড়ুন: ট্যান থেকে পা বাঁচবে, নামমাত্র খরচে বাড়িতেই বানান এই ম্যাজিক স্ক্রাবার

শিশু মনোবিদ কাকলি বন্দ্যোপাধ্যয় বলছেন, ‘‘ছোটরা সবচেয়ে সংবেদনশীল। তারা বড়দের থেকে কিছু কম বোঝে না। তবে তাদের বহিঃপ্রকাশের ধরন আলাদা। এ সব ক্ষেত্রে বলতে না পারাটা তার মধ্যে এক রকমের অবদমন তৈরি করে। যার বহিঃপ্রকাশ খুব একটা কাঙ্ক্ষিত হয় না বেশির ভাগ সময়। কেউ হয়তো অল্পতেই রেগে যায়। স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না।’’

অর্থাৎ শিশুকে অন্ধকারে রেখে কিছুই করা যাবে না। তা হলে উপায়? মনোবিদের পরামর্শ অনুযায়ী রইল কিছু টিপ্‌স, যাতে দাম্পত্যে ভাঙন প্রিয় সন্তানটিকে অথৈ সমুদ্রে এনে না ফেলে।

সন্তানকে আগলে রাখুন তিক্ত সম্পর্কের গনগনে আঁচ থেকে।

  • দীর্ঘ সম্পর্ক চলে যাওয়ার পর এক ধরণের হতাশার বোধ শরীর ও মনকে ঘিরে রাখে। কেউ তা প্রকাশ করেন, কেউ ভুলে থাকার চেষ্টা করেন। সাময়িক ভাবে না বুঝলেও নিজের এবং নিজের সন্তানের স্বার্থে প্রতিটি আবেগকে আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করা জরুরি। যে আবেগগুলি অসূয়া, রাগ ক্ষোভ থেকে আসে তা সন্তানের সামনে প্রকাশ করা যাবে না। মনে রাখবেন সন্তান আপনাদের ‘একটা ইউনিট’ জেনে অভ্যস্ত।
  • সন্তানের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এই বিষয়গুলিতে আপনি একাই নন, আপনার সঙ্গীও কথা বলার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী। এই বিষয়গুলিতে কথা বলা, আলোচনার পরিসর যেন বন্ধ না হয়। আপনার প্রতি যে অন্যায়ই তিনি করে থাকুন না কেন, যে অভিযোগের জেরে এই সম্পর্ক শেষ হোক না কেন, সন্তানের বিষয়ে কিছু মত জানাতে চাইলে আপনি তাঁকে বাধা দিতে পারেন না।

আরও পড়ুন: গরমে হৃদরোগ থেকে বাঁচতে খেয়াল রাখুন এই সব উপসর্গে

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

  • যদি সন্তানকে দু’জনে মিলে সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন। যদি একান্তই তা অসম্ভব হয়, তা হলে অন্তত এক এক জন আলাদা আলাদা করে পর্যাপ্ত সময় দিন। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করে সময় কাটান। মনে রাখবেন এই সব ক্ষেত্রে অতীতের কাদা ঘাঁটার অর্থ সন্তানকে আহত করা। সন্তান বায়না করলে একসঙ্গে যাতে সময় কাটাতে পারেন, সেটুকু সহনশীলতা দু’জনেই রাখুন।
  • নিজেদের মধ্যে কথা বলার পরিসরটুকু রাখুন। বিশেষত কথা শোনার। এতে সন্তান আত্মবিশ্বাস পায়।
  •  ক্ষমতা থাকলে সন্তানের খরচের কিছুটা ভার নিজে অবশ্যই নিন। যে টাকাটা প্রয়োজন, তা আগেভাগেই সরিয়ে রাখুন। এই টাকা দিতে দেরি করবেন না। এই নিয়ে কোনও বিরূপ কথা সন্তানকে বিপন্ন করবে।
  • ডিভোর্স হওয়ার পর আপনার বা আপনার প্রাক্তনের জীবন থেমে থাকবে না। আপনারা দায়িত্ব নিয়েই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কাজেই এমন ঘটনা ঘটলে  সন্তানের সামনে এই নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে রাগ-ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটানোটা কাম্য আচরণ নয়। বরং নিজের ব্যাপারে সন্তানকে খোলা মনে জানান, যতটুকু আপনার পক্ষে জানানো সম্ভব। আপনার পার্টনারকেও তার দায়িত্বটা নিতে দিন। এতে  শিশুর পক্ষে বিষয়টির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে।
  • যদি ডিভোর্সের পরে ফের অন্য সঙ্গী বেছে নেন, তা হলে কখনও প্রত্যাশা করবেন না আপনার নতুন পার্টনার আপনার সন্তানের  কাছে আপনার পূর্বতন সম্পর্কের বিকল্প। মনে রাখবেন বাবা-মা হিসেবে আপনার সন্তান আপনাদেরই চিনে এসেছে। এই সমীকরণ এক দিনে বদলে যাওয়ার নয়। আপনার নতুন পার্টনারকে আপনার শিশু আরেকটি নতুন সম্পর্ক বলেই জানুক, চিনুক। তাঁকে সে আগের মতোই আপন করে নিতে পারছে কি না সে ভার আপনাদের ও সন্তানেরও। জোর করে ওকে বাধ্য করবেন না আপনার নতুন সঙ্গীকে আগের মতো মেনে নিতে।