কলকাতায় নতুন রেস্তরাঁ খুলেছেন রন্ধনশিল্পী অরণি মুখোপাধ্যায়। ‘সিয়েনা’-র পাচক অন্যত্র গিয়েছেন, এ খবর আগেই জানা গিয়েছিল। পার্ক স্ট্রিটে তাঁর নতুন হেঁশেলের নাম ‘ইয়োকোচো’। আর পাঁচটা সাধারণ রেস্তরাঁ বা বারের চেয়ে ইয়োকোচোর ধরনধারণ অনেকটাই আলাদা। এক ঝলক দেখলে মনে হয়, জাপানের কোনও গলিপথ যেন উঠে এসেছে পার্ক স্ট্রিটে। নিয়ন আলো, চারকোল গ্রিলের ধোঁয়া আর জাপানি সাকির গন্ধে তৈরি হয়েছে এক মায়াবী পরিবেশ। পূর্ব এশিয়ার স্বাদের সঙ্গে বাঙালি রান্নার সম্মিলন ঘটিয়ে এক বিশ্বমানের ছোঁয়া দিয়েছেন অরণি।
কোনও শেফকে নিয়ে কথা হলে তাঁর হাতের জাদুর প্রসঙ্গ ওঠে। তবে এ ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু অন্য রকম। মগজাস্ত্রের সঙ্গের সৃজনশীল ভাবনা সমন্বয় ঘটেছে। হাতের গুণ ও চিন্তনে গত কয়েক বছরে শহরবাসীকে নতুন রকম স্বাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন অরণি। বাঙালি এখন ফিউশন চিনেছে। এশিয়ার নানা প্রান্তের রান্নার স্বাদও চেখেছে। অরণির অভিনবত্ব এখানেই যে, তিনি বাঙালি রান্নাকে পূর্ব-এশিয়ার স্বাদের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন সহজ ভাবেই। যদি সাবেককেই নতুন মোড়কে সাজিয়ে গুছিয়ে সামনে ধরা হয়, তা হলে সেটির লোভনীয় হয়ে সম্ভাবনা যথেষ্ট। পুরনো কোনও রান্নাকে নতুন আঙ্গিকে প্রস্তুত করার যে ভাবনা, সেটিই অরণির বিশেষত্ব। আর সেখানেই তাঁর রেস্তরাঁ বাকিদের থেকে আলাদা।
ইয়োকোচোতে বাঙালি খাবারের সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার স্বাদের মেলবন্ধন ঘটেছে। ছবি: অরণি মুখোপাধ্যায়ের ইনস্টাগ্রাম থেকে।
‘ইয়োকোচো’ জাপানি শব্দ। আক্ষরিক অর্থ 'সরু গলিপথ'। যে গলির দু’ধারে সারি সারি খাবারের দোকান। গ্রিল করা মাংসের গন্ধ, সুরা আর আড্ডায় যে গলিপথগুলি মুখর হয়ে ওঠে সূর্য ঢললে। মুম্বইয়ের ‘খাউ গলি’ বা খাবারের গলি, হংকংয়ের ‘দাই পাই ডং’, সিঙ্গাপুরের ‘হকার সেন্টার’-এর সঙ্গে এর বেশ মিল। এই ভাবনাই ফুটে উঠেছে অরণির রেস্তরাঁর আনাচ কানাচে। রেস্তরাঁর অন্দরের নকশার সঙ্গে তার খাবারেও রয়েছে বৈচিত্র। সিয়েনায় থাকার সময়ে নিয়মিত নিজের ক্যাফের জন্য বাজার করতেন অরণি। টাটকা দেশজ ফসল, নানা জেলা থেকে নিয়ে আসা খাবার ব্যবহার করতেন কন্টিনেন্টাল ধারার মাছ বা মাংসের রান্নার সঙ্গে খাওয়ানোর জন্য। শহরে তিনিই প্রথম ‘বাজার টু টেবিল’-এর ধারণা নিয়ে আসেন। সে দর্শন এখানে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাঙালির খাবারের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে এশিয়ার ‘স্ট্রিট ফুড’ সংস্কৃতি।
বাঙালি খাবারের সঙ্গে জাপনি ও কোরীয় খাবারের ফিউশন। ছবি: অরণি মুখোপাধ্যায়ের ইনস্টাগ্রাম থেকে।
সোডার বদলে মাটির কুঁজোয় রাখা জলের সঙ্গে হুইস্কি মেশালে তার স্বাদ যে অনেক গুণে বেড়ে যায়, সেটিও গবেষণা করে দেখার বিষয়। ভাবনাও সেই মোতাবেকই হতে হবে। ইয়োকোচো-তে ‘স্প্রিং ওয়াটার হাইবল’ না চাখলে তা বিশ্বাস হবে না। জিনের সঙ্গে অলিভ অয়েল ও বাংলার গন্ধলেবুও যে মেশানো যায়, সেটিও অরণির ব্যতিক্রমী ভাবনা থেকে জাত। খাবারের স্বাদে নতুনত্ব যতই থাক, তাকে নতুন মোড়কে পরিবেশন করাতেও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। ইয়োকোচো-তে খাবার পরিবেশনে কোরীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া পাওয়া যাবে। কোরীয়রা খাবার পরিবেশনের আগে ছোট ছোট বাটিতে আচার, স্যালাড সাজিয়ে দেন। এটাই তাঁদের রেওয়াজ। একে বলে ‘বানচান’। ইয়োকোচো-তেও তেমনই আছে। তবে উপকরণ আলাদা। আচার তৈরি হয়েছে পুঁইমেটুলি, বেগুন, শিমের বীজ দিয়ে। সঙ্গে চিংড়ি শুঁটকি, কাঁচকি ও মৌরলা মাছের শুঁটকি।
সর্ষে বা সজনে শাকের উপর টোফু দিয়ে সাজিয়ে পূর্ব ও সুদূর প্রাচ্যের রান্নার ধাঁচ আনা হয়েছে। পর্ক বেলির উপর বাংলার আমআদা ও চিংড়ি শুঁটকির টপিংয়ের ভাবনা নতুনই বটে। অরণি প্রমাণ করেছেন, খাবারের কোনও ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। শহরের বাজার থেকে কিনে আনা পুঁইমেটুলি বা আমআদা অনায়াসেই জাপানি সাকি বা হংকংয়ের ধোঁয়া ওঠা গ্রিলের পাশে নিজের জায়গা করে নিতে পারে। এখানে মাটির ভাঁড়ে যখন তিরামিসু জমে ওঠে কিংবা নলেন গুড়ের সুবাস পানদান পাতার সঙ্গে মিশে যায়, তখন বোঝা যায়, স্বাদের মেলবন্ধন আসলে এক বিশ্বজনীন ভাষা। রাঁধুনির হাতের জাদুতে গোটা বিশ্বকে এক থালায় সাজিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসেই।