রান্নার গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সমস্যা শুধু সেখানেই নয়। এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতেই মাথায় হাত পড়েছে সাধারণ মানুষের। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রান্নার গ্যাস নিয়ে টানাপড়েনের এমন আবহে এলপিজির বিকল্পের খোঁজ চলছে চারদিকে। আর সে জন্যই একটি গবেষণা নিয়ে নতুন খবর হয়েছে। পুণের বিজ্ঞানীরা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডাইমিথাইল ইথার (ডিএমই) নিয়ে গবেষণা করছিলেন ২০১৬ সাল থেকে। তাঁরাই জানিয়েছেন, এই জ্বালানিই এলপিজির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। রান্নার গ্যাস হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে ডাইমিথাইল ইথারকে।
এলপিজির বিকল্প ডাইমিথাইল ইথার
জ্বালানি সঙ্কট শুধু ভারতে নয়, বিশ্ব জুড়েই। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছিলেন, যে হারে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার চলছে, তাতে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সঞ্চিত খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। সে কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে জৈব গ্যাস নিয়ে গবেষণা চলছে বিশ্বের নানা দেশেই। প্রাকৃতিক সম্পদ যাতে ফুরিয়ে না যায়, আবার জ্বালানির জোগানও অব্যাহত থাকে, গবেষণার লক্ষ্য এটাই। ২০১৬ সাল থেকে পুণের সিএসআইআর-এনসিএল (ন্যাশনাল কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি)-এর বিজ্ঞানীরাও এমন জ্বালানির খোঁজেই গবেষণা শুরু করেন। তাঁদের গবেষণার বিষয়বস্ত ছিল ডাইমিথাইল ইথার (ডিএমই)। বর্তমান পরিস্থিতিতে যা এলপিজির বিকল্প হতে পারে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
কী এই ডাইমিথাইল ইথার?
গবেষক রাজা থিরুমালাইস্বামী ও তাঁর টিম ডাইমিথাইল ইথার নিয়ে গবেষণা করছেন। মিথানল থেকে তৈরি হয় এই গ্যাস, যা খুবই হালকা এবং পরিবেশবান্ধব। এই গ্যাস জ্বললে নাইট্রিক অক্সাইড বা সালফার ডাই অক্সাইডের মতো রাসায়নিক নির্গত হয় না। তাই গ্যাসটি দূষণ প্রতিরোধীও বটে।
রান্নার গ্যাসের বিকল্প কি হতে পারে ডাইমিথাইল ইথার? ছবি: সংগৃহীত।
ডাইমিথাইল ইথার এক ধরনের জৈব যৌগ। এর থেকে তৈরি গ্যাস বর্ণহীন, খুব সহজেই তরলে রূপান্তরিত করা যায়। এটি এলপিজির মতোই পাইপলাইন দিয়ে পাঠানো যাবে এবং সিলিন্ডারেও পরিবহণযোগ্য। দহনের সময় এটি অত্যন্ত স্বচ্ছ শিখা তৈরি করে। জ্বলার সময়ে সালফার বা ক্ষতিকর রাসায়নিক কণা তৈরি হয় না বলেই, একে ‘ক্লিন বার্নিং ফুয়েল’ বলা হয়। এটি মিথানলের মতো বিষাক্ত নয় এবং এই গ্যাস জ্বললে ওজোন স্তরেরও কোনও ক্ষতি হয় না।
গবেষকেরা বলছেন, কেবল রান্নার গ্যাস হিসেবে নয়, অন্যান্য জ্বালানি গ্যাসের বিকল্প হিসেবেও একে ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যান্য গ্যাসের ক্ষেত্রে ক্লোরোফ্লুরোকার্বন তৈরি হয়, যা পরিবেশ দূষণের অন্যতম বড় কারণ। কিন্তু ডাইমিথাইল ইথারের ক্ষেত্রে তা হয় না। ডিজেলের বিকল্প হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে বলে দাবি। শিল্প কারখানায় ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে এই গ্যাসটি বিকল্প হিসেবে কাজে লাগতে পারে বলে দাবি গবেষকদের।
কী থেকে তৈরি হতে পারে? লাভ কতটা?
ডাইমিথাইল ইথারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি কয়লা বা জৈব যৌগ থেকে তৈরি হতে পারে। কৃষি বর্জ্য, পচা লতাপাতা বা গোবর থেকেও তৈরি করা যাবে এই গ্যাস। এমনকি গবেষকেরা জানাচ্ছেন, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকেও ডাইমিথাইল ইথার তৈরি করা সম্ভব। প্লাস্টিক দূষণ কমাতেও এটি নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
এমনও দেখা গিয়েছে, কলকারখানায় জ্বালানির সময়ে যে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য দূষিত গ্যাস তৈরি হয়, তা ধরে রেখে সেখান থেকেও বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় (হাইড্রোজেনেশন) ডাইমিথাইল ইথার তৈরি করা যেতে পারে। কাজেই পরিবেশের দূষণ প্রতিরোধেও এটি অন্যতম বড় উপায় হয়ে উঠতে পারে।
এলপিজির সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ডাইমিথাইল ইথার মিশিয়ে তা রান্নার কাজে ব্যবহার করার কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। আপাতত দিনে ২৫০০ কেজির মতো ডাইমিথাইল ইথার তৈরি করা শুরু হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। ফিনল্যান্ড ও ঘানার মতো দেশও এই প্রযুক্তি চেয়ে পাঠিয়েছে তাঁদের কাছে। উৎপাদন বাড়লে এবং কার্যকরী হলে, আমদানিকৃত এলপিজির উপর নির্ভরতা পুরোপুরি কমানো সম্ভব হবে বলেই আশা তাঁদের।