‘একজনে ছবি আঁকে একমনে, ও মন/ আরেক জনে বসে বসে রং মাখে,/ আর সেই ছবি খান নষ্ট করে কোনজনা,/ তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা...’ ব্যাপারটা কতকটা এই রকমই। এমন ভাবে সাজানো ঘর, যেখানে একা হওয়ার কোনও জায়গা নেই। চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেরই নানা সত্তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। তাতে হয়তো একটু অগোছালো লাগে। কিন্তু গুছিয়ে না-রাখা জিনিসের ভিড়েই এ যুগে মনের শান্তি পাচ্ছেন অনেকে। হাজার হাজার মানুষ ঘর গোছাচ্ছেন এক রকম না-গোছানোর মতো করেই। অন্দরসজ্জার সেই অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম ‘ক্লাটারকোর’।
ঘর অর্থাৎ যা দিন শেষের আশ্রয়, তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে মনের মতো করে রাখার নানা উপায় আছে, ভাবনা আছে। বেশ কিছু বছর ধরে সেই ভাবনায় রাজত্ব করছে ‘মিনিমালিজম’ বা সংক্ষিপ্তির ট্রেন্ড। ফটফটে সাদা দেওয়াল কিংবা খুব হালকা বেজ রঙের। মেঝে যতটা সম্ভব ফাঁকা রাখা। ভারী আসবাব বাদ, বাদ আসবাবে বাহারি নকশা। একের বেশি গোত্রের রংও চলবে না। বড়জোর একটি রঙিন কিংবা আকর্ষণীয় জিনিস রাখা যেতে পারে। কারণ, বাহুল্য নয়, আধিক্যের প্রতি নিস্পৃহতাই সংক্ষিপ্তির আপ্তবাক্য। তাতেই আভিজাত্যের প্রকাশ। ক্লাটারকোর সেই ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো পিঠ।
এখানে অন্দরসজ্জা ‘অল্পই যথেষ্ট’ তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। বরং বুক ঠুকে বলে— কিছু কিছু জিনিস একটু বেশিই ভাল। তাতে ফাঁকাফাঁকা কম লাগে!
কিছু প্রিয় জিনিস, কিছু সুখস্মৃতির সামগ্রী, আরও কিছু মন ভাল করার প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রকে মিলিয়ে মিশিয়ে সাজানো ঘরকে আত্মীয়ের মতো মনে হয়। সে ঘরে সব জিনিস যে গুছিয়ে সঠিক জায়গায় রাখতে হবে, তা নয়। বরং কিছু জিনিস থাকতে পারে বড় বেশি হাতের নাগালে। তাতে একটু আলগা অগোছালো ভাব তৈরি হলেও ক্ষতি নেই। কারণ, ক্লাটারকোর সেই ‘বিশৃঙ্খলার’ই উদযাপন।
কী ভাবে সাজাবেন?
ফ্যাশনের দুনিয়ায় ‘কেয়ারফুলি কেয়ারলেস’ বলে একটি কথা আছে। অর্থাৎ সযত্নে অযত্ন। এ ভাবনায় সাজা মানুষজনের চেহারায় একেবারে পাশের বাড়ির ছেলে বা মেয়ের আলগা মিষ্টি দৃষ্টিসুখ মেলে। ফুটে ওঠে আপন ভাব। ক্লাটারকোর অন্দরসজ্জার নান্দনিকতা লুকিয়ে ঠিক তেমনই সাজানো অগোছালো ভাবের মধ্যে।
ধরুন, কোনও দেওয়ালে নিজের নানা বয়সের ছবি পর পর সাজিয়ে দিলেন। কোথাও গুছিয়ে রাখলেন বার বার পড়েও পুরনো না হওয়া খানকতক প্রিয় বই। কোথাও সাজিয়ে রাখলেন একসময় শুনতে ভাল লাগা সিডি বা ক্যাসেটের কভার। সোফার ওপর অবিন্যস্ত ভাবে ছড়িয়ে দিলেন কুশন, ঘরের কোনায় কোনও পুরনো চেয়ার রাখলেন বা পুরনো টুলে সাজিয়ে দিলেন ছোটবেলার প্রিয় পুতুল। সঙ্গে ছোটবেলার সেই পুতুল হাতে ছবি। সুদর্শন না-ও হতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিই তাকে 'বিশেষ' করে তুলবে।
এ ভাবে ঘর সাজানোর আরও একটি দিক হল উপস্থিতির ফ্যান্টাসি তৈরি করা। ঘরের কোনও একটি কোনা দেখে যাতে মনে হয়, সেইমাত্র কেউ উঠে গিয়েছেন সেখান থেকে। কী ভাবে সেটা করা সম্ভব?
ধরুন জানলার ধারে একটি চেয়ার তাতে একটু বেশি ব্যবহৃত কুশন আর একটি থ্রো ব্ল্যাঙ্কেট আলগা ভাবে ফেলে রেখে দিলেন। কিংবা সামনের টেবিলে রেখে দিলেন বাহারি বুকমার্ক দেওয়া একটি বা দু’টি বই। পাশে রেখে দিলেন একটি অ্যাশট্রে বা একটি সুন্দর কফি মগ, কফির দাগ লাগা কোনও কোস্টার। যেন সেখানে বসে কফি হাতে বই পড়তে পড়তে কেউ বইটি মুড়ে উঠে গিয়েছেন। এই ‘লিভড-ইন’ আমেজই ‘ক্লাটারকোর’কে বাকি অন্দরসজ্জার থেকে অনেকটা আলাদা করে দেয়।
কেন এটি জনপ্রিয় হচ্ছে?
১। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, ক্লাটারকোর অনেকের কাছে এক ধরনের ‘ভিস্যুয়াল থেরাপি’র কাজ করছে। চারপাশে প্রিয় জিনিস ঘিরে থাকলে একা থাকা মানুষ নিজের চারপাশে এক ধরনের আরামদায়ক সুরক্ষাবলয় টের পাচ্ছেন। ফাঁকা ঘর শূন্যতাবোধ বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু নানা প্রিয় জিনিসের ভিড়ে ডুবে থাকলে নিজেকে আর একা মনে হয় না। মনে হয়, প্রতিটি জিনিস স্মৃতি হয়ে গল্প বলছে।
২। এই ধরনের অন্দরসজ্জার জনপ্রিয়তার আরও একটি কারণ হল, এর কোনও ধরাবাঁধা ব্যাকরণ নেই, নিজের মনের মতো করে যেমন খুশি বদলে নেওয়া যেতে পারে শান্তির আশ্রয়।
অগোছালো কিন্তু অপরিচ্ছন্ন নয়
তবে যেটা মনে রাখার, তা হল— ক্লাটারকোর মানে কিন্তু নোংরা বা অপরিচ্ছন্ন ঘর নয়। পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেই কিছু জিনিসের এক সুরে বাঁধা ভিড়ই এই অন্দরসজ্জার মূল কথা। তবে যাঁদের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য অতিরিক্ত জিনিস মানসিক অস্থিরতারও কারণ হতে পারে। বিশেষ করে অগোছালো ভাব যদি অপরিচ্ছন্নতায় পরিণত হয়, তবে তা উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করবে বেশি।