Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৭ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

ডায়াবেটিক ডায়েট বা সুপার ফুড, আসলটা জেনে নিন

সুজাতা মুখোপাধ্যায়
০৪ জুন ২০১৮ ১৮:১৭
প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

ডায়াবেটিস হলেই হল৷ মিষ্টি তো বটেই, ভাত–আলুও চলে যায় খরচের খাতায়৷ ফ্যাটে লাগে ব্রেক৷ হাজির হয় ‘সুপার ফুড’৷ করোলা–লাউয়ের রস, মেথি ভেজানো জল, কাঁচা হলুদ সমেত রাজ্যের শাকসব্জি৷ ফ্রিজে সরবৎ, কোল্ডড্রিঙ্কের জায়গা নেয় আমলা–অ্যালোভেরা জ্যুস৷ নন–ভেজের হালও তথৈবচ৷ রেড মিটের প্রশ্ন নেই৷ একটা ডিম খেতে হলেও হাজার প্রশ্ন৷ তৈলাক্ত মাছে হাই ক্যালোরি, তাই সে-ও প্রায় ব্রাত্য৷

তো মানুষ খাবে কী? ডায়াবেটিক ডায়েট? কিন্তু বিজ্ঞানীরা যে বলছেন ডায়াবেটিক ডায়েট বলে কিছু হয় না!

না, হয় না৷ ডায়াবেটিস হলেও বিজ্ঞানীরা নরমাল ব্যালেন্সড ডায়েট খেতে বলেন, যা এমনিই আমাদের খাওয়ার কথা, যাতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট আছে মাপমতো, যে খাবার খাওয়ার নামে গায়ে জ্বর আসে না, কারণ তাতে নিষিদ্ধ কিছুই নেই৷ তবে স্বাভাবিক অবস্থায় যেমন ঘন ঘন অনিয়ম করার লাইসেন্স থাকে, এ ক্ষেত্রে ততটা ছুট থাকে না, বলাই বাহুল্য৷

Advertisement

অবাক হচ্ছেন? তা হলে আরও শুনুন, আপনি যদি রোজ আলু খেতে চান, বিজ্ঞানীদের আপত্তি নেই৷ আপত্তি নেই মাঝেমধ্যে এক–আধটা মিষ্টিতে৷ চিনি ছাড়া চা অসহ্য হলে আধ চামচ চিনি মেশানোর পরামর্শ দেন তাঁরা নিজেরাই৷ মাসে এক–আধ বার পার্টি, সপ্তাহে এক–আধ দিন মদ্যপানে ছাড় দেন৷ আবার তথাকথিত ‘সুপার ফুড’–এর মহিমায় অন্ধবিশ্বাস নেই তাঁদের৷ তাঁদের মতে, এটা ছোঁবে না আর ওটা খাবে সকাল–বিকেল, এ সব হল নিছকই মিথ৷



সত্যি ও মিথ

ধরুন আলু৷ চাল–গমের মতো আলুও তো কার্বোহাইড্রেট বা স্টার্চ৷ তা হলে ভাত–রুটি নিষিদ্ধ না হলে আলু হবে কেন? বিশেষ করে যেখানে ১০০ গ্রাম চাল–গমে আছে ৩৪০ ক্যালোরি আর আলুতে ১০০ ক্যালোরি। তা ছাড়া আলুতে আছে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড নামে এমন এক উপাদান, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমিয়ে ডায়াবেটিসের বিস্তর উপকার করে৷ সে জন্যই নরওয়ে সরকার ডায়াবেটিকদের মাঝেমধ্যে আলু খেতে বলেন৷ তবে...৷

‘‘হ্যাঁ, তবে একটা আছে।’’ বললেন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়: ‘‘আলুর গ্লাইসিমিক ইনডেক্স বা জিআই বেশি৷ অর্থাৎ, রক্তে চট করে সুগার বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিকদের জন্য ভাল নয়৷ কিন্তু খোসাসমেত খেলে ও সঙ্গে অন্য শাক–সব্জি মিশিয়ে নিলে ফাইবারের দৌলতে পুরো খাবারের জিআই কমে যায়৷ একই ভাবে খোসাসমেত রাঙা আলু, মিষ্টি কুমড়ো, কচু খেতে পারেন৷ তবে ভেজে নয়, সেদ্ধ করে বা তরকারিতে দিয়ে৷’

আর আলু–ভাতে? সে তো খোসাসমেত খাওয়া যাবে না। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘আলু–ভাতে না খেয়ে আলু–উচ্ছে, আলু–পটল বা আলু–বেগুন ভাতে খান৷ বিলিতি ধাঁচে ম্যাস্ড পট্যাটো বা হ্যাস ব্রাউন পট্যাটো খেলেন, সঙ্গে সতে ভেজিটেবল ও কয়েকটা অ্যামন্ড খেয়ে নিন৷ আর শুধু আলু সেদ্ধ বা আলুর তরকারি খাওয়ার প্ল্যান থাকলে সে দিন ভাত–রুটি একটু কম খান৷ স্টার্চের মোট পরিমাণ এক থাকলে আর সমস্যা নেই৷’’



‘‘মিষ্টি বা মদের ক্ষেত্রেও এক নিয়ম,’’ বললেন চিকিৎসক মুখোপাধ্যায়, ‘‘এই দুটি জিনিস এমনিতেই ক্ষতিকর, সে ডায়াবেটিস না থাকলেও৷ তা-ও ইচ্ছে হলে ন’মাসে ছ’মাসে এক–আধ বার খেতে পারেন৷ তবে ভরাপেটে, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে৷ না হলে রক্তে সুগার চট করে বেড়ে ঝামেলা করবে৷’’

আসলে খাবারে কার্বন, প্রোটিন, ফ্যাটের ভারসাম্য থাকলেই আর সমস্যা নেই৷ অনেকে ভাবেন, ডায়াবেটিস হলে কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাটকে প্রায় বাদ দিতে হয়, ব্যাপারটা তা নয়৷ মোট ক্যালোরির ৫০ শতাংশের বেশি কার্ব থেকে না এলেই হল৷ এবং তা যেন ফাইবারসমৃদ্ধ হয়৷ তাই ময়দার বদলে হোলগ্রেইন আটা, সাদা চালের বদলে ব্রাউন বা ওয়াইল্ড রাইস, সাদা পাউরুটির বদলে ব্রাউন ব্রেড, ফলের রসের বদলে গোটা ফল খেতে বলা হয়৷ সব্জি, ডাল খেতে হয় খোসাসমেত৷ সব্জি ও ফল দিনে ১০০ গ্রামের মতো খাওয়া দরকার৷ আম–কলাও বাদ নয়৷ মাঝেমধ্যে দু’–চার টুকরো খাওয়া যায়৷

ফ্যাট কম খাওয়াই ভাল৷ তবে ভাল ফ্যাটে (মুফা ও পুফায়) যেন কার্পণ্য না হয়৷ অ্যামন্ড, আখরোট, তিসি, সূর্যমুখী–চালকুমড়ো বীজ, অ্যাভোক্যাডো, অলিভ অয়েল অল্প করে খান৷ ফুল ফ্যাট দুধ খান৷ সামুদ্রিক মাছ খান সপ্তাহে দু’–তিন দিন৷ তেলের মধ্যে সর্ষে, সূর্যমুখী, বাদাম, অলিভ, রাইসব্রান, সবই ভাল৷ এক এক রান্নায় এক একটা ব্যবহার করুন৷ তবে সারা দিনে তিন চা–চামচের বেশি যেন না হয়৷ ট্র্রান্স ফ্যাট, অর্থাৎ বনস্পতি, মার্জারিন, ভাজা ও প্রসেস্ড খাবার বাদ৷ স্যাচুরেটেড ফ্যাটে ভরপুর ঘি–মাখনও না খাওয়াই ভাল৷



ডায়াবেটিস হলে প্রচুর প্রোটিন খেতে হয়, সে-ও এক ভুল ধারণা৷ কিডনি ঠিক থাকলে প্রতি কেজি ওজনের জন্য এক গ্রামের হিসেবে খান৷ ডিমের কুসুম বাদ দিতে হবে না, গোটা ডিম খান৷ রোজ৷ মাছ খান দিনে ১০০ গ্রামের মতো৷ চিকেন ব্রেস্ট খেতে পারেন৷ রেডমিট বিসর্জন দিতে হবে না৷ কম চর্বির (লিন) মাংস মাসে দু’ মাসে এক–আধ বার খেতে পারেন৷

আরও পড়ুন: রেস্তরাঁয় ছুরি-চামচ এ ভাবে প্লেটে রাখেন? জানেন এর মানে কী?

সুপার ফুড ও বিজ্ঞান

যে সব খাবারকে বিজ্ঞান সুপার ফুড বলছে, যেমন আমলকি, রসুন, পালং, মেথি, টমেটো, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার, অ্যামন্ড, করোলা, হলুদ ইত্যাদি, তা সুষম খাবারের তালিকাতেই পড়ে৷ কিন্তু কোনটি কী মাত্রায় খেলে কতটা কাজ হয়, সেই গবেষণা এখনও চলছে৷ অনেক ক্ষেত্রে অ্যানিম্যাল ট্রায়াল হলেও মানুষের শরীরে কতটা কাজ হবে তা জানা যায়নি৷ তবু খাওয়া যেতে পারে৷ ক্ষতি নেই৷ তবে ওষুধ ও নিয়মের বদলে খেলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী৷

দ্বিতীয় সমস্যা, খাওয়ার পদ্ধতি৷ মেথি ভেজানো জল বা কাঁচা লাউ–করোলার জ্যুস খেলে, প্যাকেটের আমলকি বা প্রচুর হলুদ–রসুন খাওয়া ধরলে কাজের বদলে কিছু ক্ষেত্রে অন্তত অকাজ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল৷

করোলার কথা বলি প্রথমে৷ খাবার খাওয়ার আগে খেলে পিত্তক্ষরণ বেড়ে হজমে সুবিধে হয়৷ সে জন্যই বাঙালি ভুরিভোজের শুরুতে তেতো খাওয়ার চল৷ এতে সলিউবল ফাইবার আছে৷ আছে চারানটিন, যা সুগার কমাতে ও গ্লুকোজ মেটাবলিজমে কাজে লাগে৷ কিন্তু ছিবড়ে ফেলে রস খেলে উপকারের সিংহভাগই বাদ চলে যায়৷ কাঁচা খেলে কীটনাশকের বিপদ থাকে৷ আশঙ্কা বাড়ে পেটব্যথা, ডায়েরিয়ার৷ কাজেই খান সেদ্ধ করে বা সব্জিতে মিশিয়ে৷

পালং ও লাউয়ে আছে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল ও সলিউবল ফাইবার৷ ক্যালোরিও যৎসামান্য, ১০০ গ্রামে মোটে ৩০৷ ফলে সুগার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা বিরাট৷ পালং–এ আবার আছে ম্যাগনেসিয়াম, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে যা খুবই দরকার৷ তবে রস করে খেয়ে লাভ নেই, খান কম আঁচে রান্না করে৷

মেথির উপকার সলিউব্ল ফাইবারের জন্য৷ রান্নায় দিলে বা মেথি গুড়ো খেলে ফ্যাট ও কোলেস্টেরল শোষণ কমে হূদরোগ ও ওজন কন্ট্রোলে থাকে, কার্বোহাইড্রেট শোষণ কমে গিয়ে সুগার কন্ট্রোল ভাল হয়, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের জন্য ভাল৷ মেথি ভেজানো জলে সে উপকার নেই বলাই বাহুল্য৷

ইনসলিউবল ফাইবার খেলেও খাবারের সুগার খুব ধীরে ধীরে শোষিত হয় রক্তে৷ ফলে হঠাৎ সুগার কমে বা বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা কম হয়৷ কাজেই ওট্স, শুকনো বিন, মটরশুঁটি, মুসুর ডাল, আপেল, গাজর ইত্যাদি খাওয়া ভাল৷ তবে খুব বেশি খেলে পেট ভার হতে পারে৷

হলুদে আছে কারকিউমিন, সুগার লেভেল ও ডায়াবেটিস ঠেকাতে ও তার জটিলতা কমাতে, তার ভূমিকা আছে৷ কাঁচা খেতে পারেন৷ রান্নাতে দিলেও ভাল, যদি তা ঘরে বাটা হয়৷ বাজারের হলুদগুঁড়ো নিরাপদ নয়৷ রসুনও কাঁচা বা রান্নায় দিয়ে খান৷ বাজারের পেস্ট ব্যবহার না করাই ভাল৷

আমলকি খেলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে৷ শরীর ভাল ভাবে কার্বোহাইড্রেটকে সামলাতে পারে৷ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির চান্স কমে৷ তবে খেতে হবে কাঁচা৷ প্রসেস্ড আমলকির রস বা প্যাকেটের আমলকি খেলে হবে না৷

অ্যামন্ডে আছে মুফা, ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম৷ খাবারে মেশালে খাবারের গ্লাইসিমিক ইনডেক্স কমে যায়, সে-ও এক বড় ব্যাপার৷ তবে এর ক্যালোরি প্রচুর৷ কাজেই দিনে ৫–৭টার বেশি খাবেন না৷

শেষ কথা

অবাধে মিষ্টি খেতে পারছেন না বলে মন খারাপ করবেন না৷ কারণ এমনিও মিষ্টি বেশি খাওয়ার কথা নয়৷ কারণ ওজন ও ভুঁড়ি বাড়ার মূলে, বিশেষ করে ভুঁড়ির মূলে ফ্যাট যতটা না দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী হল মিষ্টি৷ আর ভুঁড়ির সঙ্গেই যোগ রাজ্যের অসুখের৷ সে ফ্যাটি লিভার হোক কি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ হোক কি হাই প্রেশার–কোলেস্টেরল–এমনকী ক্যান্সারও৷ কাজেই ডিমের কুসুম, তৈলাক্ত মাছ, বাদাম, ফুল ফ্যাট মিল্ককে বাতিলের খাতায় না ফেলে, মিষ্টিকে বিদায় করুন জীবন থেকে, সে আপনার ডায়াবেটিস থাক বা না থাক৷ সে তালিকায় প্রসেস্ড ফুড, লো–ফ্যাট খাবারও কিন্তু আছে৷ কারণ খেতে মিষ্টি না লাগলেও সে সবে মিষ্টি ঠাসা থাকে৷ এবং এমন সব নামে যে ওয়াকিবহাল না হলে ধরতেই পারবেন না তা মিষ্টি না অন্য কিছু৷ যেমন, অ্যাগাভে নেক্টর, কেন ক্রিস্টাল্স, কর্ন সুইটনার, ক্রিস্টালাইন ফ্রুকটোজ, ডেক্সট্রোজ, ইভাপোরেটেড কেন জ্যুস, ফ্রুকটোজ, হাই–ফ্রুকটোজ কর্ন সিরাপ, ইনভার্ট সুগার, ল্যাকটোজ, ম্যালটোজ, মল্ট সিরাপ ইত্যাদি৷

নিষিদ্ধ নয় কিছুই

পর্যাপ্ত পরিমাণে খান–

স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, যেমন কাঁচা বা ড্রাই রেস্টেড বাদাম, অলিভ অয়েল, মাছের তেল, তিসি, অ্যাভোক্যাডো, হোল মিল্ক৷

শাক–সব্জি–ফল, টাটকা ও রং–বেরঙের৷ ফ্রুটজ্যুসের বদলে গোটা ফল৷

হোল গ্রেইন আটা, ব্রাউন রাইস, খোসাসমেত ডাল৷

মাছ, শেলফিস, দেশি মুরগি বা টার্কি৷

ডিম, বিন্স, দুধ, চিজ, টক দই৷

চলবে ন’ মাসে ছ’ মাসে–

ডিপ ফ্রায়েড খাবার ও বনস্পতি

প্রি–প্যাক্ড খাবার, প্রসেস্ড মাংস, মিষ্টি, কুকিজ, চিপ্স, আইসক্রিম৷

হোয়াইড ব্রেড ও রাইস, মিষ্টি সিরিয়াল, রিফাইন্ড পাস্তা।

ফ্যাট কমিয়ে যে খাবারে মেশানো হয় চিনি, যেমন লো–ফ্যাট ইয়োগার্ট৷



Tags:
Diabetic Diet Diabetes Food Healthডায়াবেটিস

আরও পড়ুন

Advertisement