Advertisement
E-Paper

শিরদাঁড়ায় আঘাতের চিকিৎসা পঙ্গু, খেদ রাজ্যে

বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঝড়ের গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর শখ ছিল। সেই গতির নেশায় মেতে মাস সাতেক আগে রাজারহাটে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন রবীন্দ্রপ্রসাদ গুপ্ত। অভিযোগ, শিরদাঁড়া ও স্পাইনাল কর্ডে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত যুবকটিকে শহরের তিন-তিনটে মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি নিতে চায়নি। কারণ, এর চিকিৎসার পরিকাঠামো তাদের নেই।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ অগস্ট ২০১৪ ০৩:০০

বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঝড়ের গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর শখ ছিল। সেই গতির নেশায় মেতে মাস সাতেক আগে রাজারহাটে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন রবীন্দ্রপ্রসাদ গুপ্ত। অভিযোগ, শিরদাঁড়া ও স্পাইনাল কর্ডে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত যুবকটিকে শহরের তিন-তিনটে মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি নিতে চায়নি। কারণ, এর চিকিৎসার পরিকাঠামো তাদের নেই।

চিকিৎসায় বিলম্বের মাসুলও দিতে হয়েছে। বরাবরের মতো পঙ্গু হয়ে গিয়েছেন ২৬ বছরের তরতাজা ছেলে।

দিবাকর পাত্রেরও এক পরিণতি। ক্যানিংয়ের যুবকটি খেজুর গাছ থেকে পড়ে স্পাইনাল কর্ডে মারাত্মক আঘাত পেয়েছিলেন। কাছাকাছি কোনও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা না-থাকায় তাঁকে নিয়ে আসা হয় কলকাতার ‘বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজি’তে। সেখানে শয্যা জোটেনি। নামী বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার মতো পকেটের জোর ছিল না। মফস্সলের মামুলি নার্সিংহোমে কোনও ক্রমে প্রাণ বাঁচলেও সারা জীবনের মতো শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছেন।

Advertisement

বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্তরে স্পাইনাল কর্ডে আঘাতের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র যথেষ্ট সংখ্যায় থাকলে রবীন্দ্রপ্রসাদ বা দিবাকরের ভবিষ্যৎ অন্য রকম হতে পারত। দ্রুত ও যথাযথ পরিষেবার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারতেন তাঁরা। স্পাইনাল কর্ড বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ‘স্পাইনাল কর্ড সোসাইটি অব ওয়েস্টবেঙ্গল’ আয়োজিত এক আলোচনাসভায় রবিবার এই আক্ষেপই শোনা গেল বারবার। রাজ্যের প্রতি সংগঠনের আবেদন, জেলায়-জেলায় অবিলম্বে সরকারি ট্রমাকেয়ার সেন্টার ও স্পাইনাল কর্ড চিকিৎসাকেন্দ্র গড়া হোক। “এত মাল্টি স্পেশ্যালিটি আর সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল হচ্ছে! নতুন নতুন মেডিক্যাল কলেজ হচ্ছে! স্পাইনাল কর্ডের জন্য কয়েকটা চিকিৎসাকেন্দ্রের কথা কেন ভাবা হচ্ছে না?” প্রশ্ন তুলেছে তারা।

প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় সরকার কিছু দিন আগে দেশে মোট ছ’টি ‘কমপ্রিহেনসিভ রিহ্যাব সেন্টার’ তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রতিটিতে ১২টি শয্যা থাকবে। প্রস্তাবিত ছ’টি কেন্দ্রের অন্তত একটা যাতে এ রাজ্যে হয়, তার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে এখন থেকেই উদ্যোগী হতে আবেদন জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। সোসাইটি’র সচিব, চিকিৎসক মৌলিমাধব ঘটকের কথায়, “স্পাইনাল কর্ডের চিকিৎসা মানে শুধু হাসপাতালে ভর্তি করে অপারেশন করা নয়। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল অস্ত্রোপচারের পরবর্তী পুনর্বাসন।”

সেটা কী রকম?

মৌলিমাধববাবু জানাচ্ছেন, রোগীর কোমর ধীরে ধীরে সচল করে স্পাইনাল কর্ডের উপরে চাপ কমাতে হবে। দেখতে হবে, হাত পা যেন অসাড় না হয়, কিংবা পায়ের ধমনীতে রক্ত জমাট বেঁধে ‘ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস’ হয়ে না যায়। অনেক দিন শুয়ে থাকার পরে উঠে বসালে হৃদ্যন্ত্র যাতে ঠিকঠাক রক্ত পাম্প করে মস্তিষ্কে পাঠাতে পারে, সে দিকে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে, যাতে রোগীর বেডসোর না হয়, পায়ের মাংসপেশী শুকিয়ে না-যায়, তিনি নিজের কাজ নিজে করে নিতে পারেন। রোগী যাতে স্বাভাবিক যৌনজীবন যাপন করতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করাও পুনর্বাসনের অঙ্গ। “কিন্তু এ সব প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় এখনও পুরোপুরি চালু করা যায়নি।” আক্ষেপ মৌলিমাধববাবুর।

কিন্তু রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর তো কলকাতা ও জেলায়, বিশেষত জাতীয় সড়কের ধারে ধারে একাধিক ট্রমাকেয়ার হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনা অনেক দিন আগেই করেছিল। সেগুলো থেমে রয়েছে কেন?

রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যখ্যা: মূল কারণ লোকাভাব। “গত বিশ বছর স্বাস্থ্য দফতরে ডাক্তার, নার্স, গ্রুপ ডি কোনও পদে লোক নেওয়া হয়নি। তার কিছু খেসারত তো দিতে হবে!” মন্তব্য তাঁর। তবে অধিকর্তার আশ্বাস, ধীরে ধীরে পরিকল্পনা রূপায়ণ হবে। সবার আগে চেষ্টা হচ্ছে আরজিকরের ট্রমাকেয়ার চালু করার।

চিকিৎসকদের অবশ্য আশঙ্কা, ট্রমাকেয়ারের গতি এত শ্লথ হলে সমস্যা ক্রমশ জটিল হবে। ওঁদের দাবি, দিল্লি-মুম্বই-বেঙ্গালুরু-কোচির মতো শহরের তুলনায় কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনার হার এখনও কম। তাতেও সব আহতকে সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা দেওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানেও দুর্ঘটনার হার বাড়লে কী অবস্থা দাঁড়াবে, তা ভেবে ওঁরা যারপরনাই উদ্বিগ্ন।

দিল্লির ‘ইন্ডিয়ান স্পাইনাল ইনজ্যুরিস সেন্টার’-এর ডিরেক্টর জেনারেল আশিসকুমার মুখোপাধ্যায় জানান, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ুর মতো রাজ্য ট্রমাকেয়ারের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে এগিয়ে গিয়েছে। দিল্লিতে এইম্স পরিচালিত স্পাইন্যাল কর্ড ইনজুরি চিকিৎসার হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবাও উচ্চমানের। তিনি বলেন, “ভারতে ফি বছরে দেড়-দু’লক্ষ মানুষ দুর্ঘটনা বা পতনজনিত কারণে স্পাইনাল কর্ডে গুরুতর চোট পান। বেশির ভাগই গরিব। এত লোকের জন্য যথেষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র না-থাকলে কী করে হবে?”

একই আফশোস শোনা গেল বাঙুর ইনস্টিটিউটের স্নায়ু-বিশেষজ্ঞ সমরেন্দ্রনাথ ঘোষের মুখে। তাঁর খেদ, “এ রাজ্যে এখনও অধিকাংশ অ্যাম্বুল্যান্সে একটা সার্ভাইক্যাল কলার পর্যন্ত থাকে না! রোগীর ঘাড় সোজা করে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া দুষ্কর হয়। বেশির ভাগ অ্যাম্বুল্যান্সে আধুনিক ও নিরাপদ ট্রলি পর্যন্ত নেই!”

এমতাবস্থায় চিকিৎসকেরা চিকিৎসা পরিকাঠামো মজবুত করার পাশাপাশি সর্বস্তরে সচেতনতাবৃদ্ধির উপরেও জোর দিচ্ছেন। বলছেন, “শুধু আরজিকর বা এসএসকেএমের মতো হাতে গোনা কয়েকটা মেডিক্যাল কলেজে নয়। স্পাইনাল কর্ডে আঘাতপ্রাপ্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়তে হবে জেলায় জেলায়। কারণ, সঠিক চিকিৎসা যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যাবে, সেরে ওঠার সম্ভাবনা তত বেশি।

আর দেরি মানেই রোগীকে পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া।

spinal chord problem neuro problem
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy