সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত গ্রামের আখতারা বেগম বা নার্গিস খাতুন কোনও দিন ছোট গাড়িতে চড়ে হাসপাতালে যাবেন তা ভাবেননি। আবার কাশ্মীরা খাতুন, ফিরোজা খাতুনেরা সরকারি হাসপাতালে প্রসূতিদের জন্য করা ব্যবস্থা বাড়ির লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখবেন তাও কোনও দিন চিন্তা করেননি। তেমনিই ভাবেননি দেখবেন প্রজেক্টরে মা ও শিশুদের নিয়ে তৈরি নানা ডকুমেন্টরি। সোমবার শিলিগুড়ি মহকুমায় ফাঁসিদেওয়া ব্লকের মাটিগাড়া গ্রামের ওই বধূরা কয়েক ঘণ্টা তাই করলেন। পরে একে একে লাইন দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করালেন। এক সঙ্গে ২৯ জন। সকলের একটাই মিল, সবাই সন্তানসম্ভবা। কারও এই মাসেই আবার কারও ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসে প্রসবের দিনক্ষণ ঠিক রয়েছে। প্রথম সরকারি হাসপাতালে প্রসবের যাবতীয় ব্যবস্থা, হাসপাতালে আসাটা জরুরি কেন তা জেনে অনেকটাই আপ্লুত হয়েছেন মুখচোরা ওই গ্রামের বধূরা।
প্রশাসনের কাছে খুশির খবর, প্রথম দিন আসা সকল প্রসূতিরা তো বটেই, তাঁদের বাড়ির লোকজনই রাজি হয়েছেন হাসপাতালেই এবার থেকে প্রসূতিতে ভর্তি করিয়ে প্রসব করাতে। এক্ষেত্রে ওই মহিলাদের উপর নজর রেখে দেখভাল করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আশা কর্মীদের। সৌজন্যে-দার্জিলিং জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য দফতর। সরকারি এই প্রকল্পের নাম- ‘অপারেশন জিরো’।
দার্জিলিঙের জেলাসাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব বলেন, ‘‘প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় এখন স্বাস্থ্য পরিষেবা রয়েছে। ফাঁসিদেওয়া সদর এবং বিধাননগরে হাসপাতাল রয়েছে। তা ছাড়া পাশেউ উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ আছে। তাও নানা চিন্তাভাবনা থেকে মহিলারা বাড়িতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রসব করাবেন এটা ভাবাই যান না। এতে মা ও শিশুদের নানা বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়। এই বিষয়টি বন্ধ করতেই আমরা উদ্যোগী হয়েছি।’’ জেলাশাসক জানান, ফাঁসিদেওয়া থেকে প্রকল্পটি শুরু হল, জেলার পাহাড়, সমতল অন্যত্র ধীরে ধীরে এমন কাউন্সিলিঙের ব্যবস্থা করা হবে।
সরকারি সূত্রের খবর, শিলিগুড়ি মহকুমা ফাঁসিদেওয়া ব্লকের প্রসূতি মহিলাদের হাসপাতালে বা নার্সিংহোমে প্রসবের হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। গোটা জেলাতেও শতাংশটা প্রায় একই। গত আর্থিক বছরে স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুসারে, জেলায় ১২০০ মহিলার বাড়িতে প্রসব করেছেন। এই তথ্য সামনে আসতেই প্রশাসন, স্বাস্থ্য দফতরের অফিসারেরা সমীক্ষার কাজ শুরু করেন। তাতে দেখা যায়, সমতলের ফাঁসিদেওয়া, মাটিগাড়া-সহ বিভিন্ন ব্লকের মত পাহাড়ের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটছে। সংস্কার, আর্থিক অস্বচ্ছলতা, পারিবারিক বিধি নিষেধ-সহ নানা কারণে বধূরা হাসপাতালে আসেন না। আবার অনেকের বাড়ি থেকে হাসপাতাল দূরে বা মাতৃযান মেলে না বলেও খবর আসে। চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়াই দাইমা বা পরিবারের বয়স্ক মহিলাদের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ে প্রসব হয়ে থাকে পরিবারগুলিতে।
তেমনিই ফাঁসিদেওয়া ব্লকের চটহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের মাটিগাড়া একটি গ্রাম। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ওই গ্রামের বধূরা বেশিরভাগেরই এখনও বাড়িতেই প্রসব করেন। গ্রামের ৪২টি এমন পরিবারের মহিলাদের তথ্য সামনে আসতেই তাঁদের পরিবার সমেত ‘কাউন্সিলিং’ করানোর পরিকল্পনা তৈরি হয়। এদিন তার মধ্যে প্রথম দফায় ২৯ জনকে ফাঁসিদেওয়া ব্লক হাসপাতালে একটি অনুষ্ঠান করে বধূ-সহ ওই পরিবারগুলিকে আনা হয়েছিল। গ্রামের ওই বধূরা জানান, পরিবারিক বিষয় তো একটা রয়েছেই। মাতৃযানের নাম আমরা ঠিকমত শুনিনি। অনেকের বাড়ি থেকে হাসপাতাল দূরে। টাকা পয়সার সমস্যাও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মা, কাকিমাদের আমল ধরে বাড়িতেই সন্তান প্রসব হওয়ার রীতি রয়েছে। তাই আমরা হাসপাতালে আর আসি না। এবার পরিবারের লোকেদের নিয়ে আসব। অনুষ্ঠানের মধ্যেই মাতৃযান-সহ অ্যাম্বুল্যান্সের টেলিফোন নম্বরও ওই মহিলাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এদিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাঁদের নানা ধরণের পরামর্শও দিয়েছেন।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, কাজটা এত সহজ ছিল না। বিডিও বীরুপাক্ষ মিত্র এবং ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক শমিক গঙ্গোপাধ্যায় একাধিকবার আলোচনার পর ওই বাড়িগুলিতে লোকজন পাঠানো শুরু করেন। গত কয়েক মাস ধরে আশা কর্মী, স্বাস্থ্য কর্মী থেকে শুরু করে ব্লকের কর্মীরা বাড়িগুলিতে গিয়ে বোঝানোর কাজ করেছেন। বিডিও জানান, গ্রামের অনেক বাসিন্দা আমাদের সাহায্য করেছেন। ধীরে ধীরে পরিবারগুলি রাজি হয়। সেই মত এদিন সরকারি গাড়িতে করে পরিবারগুলিকে হাসপাতালে এনে সমস্ত কিছু বোঝানো হয়েছে। এবার মা, গর্ভের শিশুদের নিয়মিত নজরদারি রাখা হবে। এই মহিলারাই আমাদের আশা, পরবর্তীতে মুখে মুখে প্রচারের কাজ করে দেবেন।