নির্বাচনের পর তিন মাস কাটতে না কাটতেই শাসক-বিরোধী দ্বন্দ্বে ফের তেতে উঠল অন্ধ্রপ্রদেশ। সেখানে বিরোধী শিবিরের নেতাদের বিরুদ্ধে দমননীতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠল মুখ্যমন্ত্রী ওয়াইএস জগনমোহন রেড্ডির বিরুদ্ধে। তাঁর নির্দেশে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি)-র প্রধান চন্দ্রবাবু নায়ডুকে গৃহবন্দি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। চন্দ্রবাবুর ছেলে তথা রাজ্য বিধান পরিষদীয় সদস্য নারা লোকেশ এবং দলের অন্য নেতাদেরও একই ভাবে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে বলে টিডিপির তরফে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। দমননীতির বিরোধিতা করাতেই রাজ্য সরকারের তরফে এমন পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের নেতারা।

টিডিপি সূত্রে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর থেকেই বিরোধী দলের নেতা-সমর্থকদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছিল জগনের ওয়াইএসআর কংগ্রেস। টিডিপিকে সমর্থন করায় গুন্টুরের পালনাড়ু এবং আত্মাকুর গ্রামে চড়াও হয় ওয়াইএসআর কংগ্রেস আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। সেখানে সাধারণ মানুষকে মারধর করে তারা। ঘরছাড়া করে অনেককে। তাদের হাতে দলের ৫০০ কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন আট জন। শাসক দলের এই অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ করেন চন্দ্রবাবু। বুধবার ছেলে, দলের অন্যান্য নেতা এবং ১২৭টি আক্রান্ত পরিবারকে নিয়ে আত্মাকুরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কথা ছিল সেখানে পৌঁছে জনসভা করার। কিন্তু তার আগেই উন্ডাবল্লির বাড়িতে চন্দ্রবাবু ও তাঁর ছেলেকে বন্দি করা হয়। দড়ি বেঁধে দেওয়া হয় বাড়ির মূল ফটকে। দেওয়ালে সেঁটে দেওয়া হয় একটি পোস্টারও। তাতে সাফ নির্দেশ দেওয়া হয়, কোনও অবস্থাতেই পিতা-পুত্র বাড়ির বাইরে পা রাখতে পারবেন না। চন্দ্রবাবুর বাড়ির বাইরে বসানো হয়েছে ব্যারিকেডও।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন চন্দ্রবাবু নাইডু। বাড়ি থেকে সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জগন সরকারকে তুলোধনা করে চন্দ্রবাবু বলেন, ‘‘পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আমাদের দলের একাধিক নেতা, সাংসদ এবং বিধায়ককে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় আটকে রাখা হয়েছে তাঁদের। গৃহবন্দিও করা হয়েছে অনেককে। অন্ধ্রপ্রদেশের ইতিহাসে আজকের দিনটি কালো দিন হিসাবে চিহ্নিত থাকবে।’’

আরও পড়ুন: নিয়ন্ত্রণরেখায় ফের সক্রিয় পাক মদতে পুষ্ট জঙ্গি শিবির, লঞ্চপ্যাড, দাবি গোয়েন্দাদের

নারা লোকেশের কথায়, ‘‘শাসকদল আমাদের কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মেনে কাজ করছিলাম আমরা। তা সত্ত্বেও দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। চোখের সামনে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। এখানে স্বৈরতন্ত্র চলছে। টিডিপি নেতা ও কর্মীদের খামোকা হেনস্থা করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে আমাদের হুমকি দিচ্ছেন ওয়াইএসআর বিধায়কেরা। বলছেন, পুলিশ-প্রশাসন সব কিছু এখন ওদের কব্জায়।’’

তবে তাঁদের অভিযোগ খারিজ করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের ডিজি ডি গৌতম। তাঁর দাবি, ‘‘খামোকা উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন ওঁরা। আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন। তা রুখতেই আপাতত হেফাজতে নেওয়া হয়েছে ওঁদের।’’ এই মুহূর্তে রাজ্যে বড় ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। কিন্তু চন্দ্রবাবু নায়ডু তাঁর যুক্তি উড়িয়ে বলেন, ‘‘শান্তিপূর্ণ মিছিল করে আক্রান্তদের গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। এতে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রশ্ন উঠছে কোত্থেকে?’’

অন্য দিকে, চন্দ্রবাবু ও টিডিপি-র যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে ওয়াইএসআর কংগ্রেসও। দলের প্রভাবশালী নেতা তথা রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকার কোডেলা শিবপ্রসাদের দাবি, ‘‘কোথাও কারও উপর অত্যাচার চালানো হয়নি। ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুয়ো তথ্য রটাচ্ছেন চন্দ্রবাবু।’’

এ বছর অন্ধ্রপ্রদেশে একই সঙ্গে লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন হয়। তাতে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে জগনের ওয়াইএসআর কংগ্রেস। বিধানসভার ১৭৫টি আসনের মধ্যে ১৫১-টিই তাদের দখলে যায়। আবার ২৫টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যেও ২২টিতে জয়লাভ করে। সেই থেকেই বিরোধী দল টিডিপি-র সঙ্গে তাদের বিরোধ চরমে উঠেছে। তবে এর পিছনে দীর্ঘ ৩৫ বছরের পারিবারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কাজ করছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। ১৯৭৮ সালে কংগ্রেসের হাত ধরে একই সঙ্গে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন চন্দ্রবাবু নায়ডু এবং জগনমোহন রেড্ডির বাবা ওয়াইএস রাজশেখর রেড্ডি। শুরুতে ভালই সম্পর্ক ছিল দু’জনের মধ্যে। কিন্তু ১৯৮৪ সালে কংগ্রেস থেকে ইস্তফা দেন চন্দ্রবাবু। শ্বশুর এনটি রাম রাওয়ের টিডিপি-তে যোগ দেন। সেই থেকেই দূরত্ব বাড়তে শুরু করে দু’জনের মধ্যে।

আরও পড়ুন: ‘ওম’ বা ‘গরু’ শুনলে অনেকে মুখ ফেরান, এটা দুর্ভাগ্যজনক, মথুরায় বললেন মোদী​

১৯৯৯ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চন্দ্রবাবুর দ্বিতীয় দফায় অন্ধ্রপ্রদেশ বিধানসভায় বিরোধী নেতা নির্বাচিত হন রাজশেখর। কিন্তু ২০০৪ সালে ক্ষমতা হারান চন্দ্রবাবু। সেখান থেকেই উত্থান শুরু হয় রাজশেখর রেড্ডির। ২০০৯ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হলে, অন্ধ্রপ্রদেশের ভাঙন শুরু হয়। শেষমেশ ২০১৪-য় অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানা, দু’টি পৃথক রাজ্য তৈরি হয়। বাবার মৃত্যুর পরই কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আলাদা ওয়াইএসআর কংগ্রেস গঠন করেন। গোপনে নায়ডুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কংগ্রেস তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। তার পর থেকেই চন্দ্রবাবু নায়ডুর সঙ্গে তাঁর শত্রুতা অন্য মাত্রা পায়।