E-Paper

রঙ্গমঞ্চ ও রবীন্দ্রগান

‘রাজা বসন্ত রায়’ নাটকের গান ‘আজ তোমারে দেখতে এলেম’ গানটি বিশেষ ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বেদানা দাসীর গাওয়া এই গানটির রেকর্ডও পাওয়া যায়, যা বর্তমানে গাওয়ার ধরনের চেয়ে আলাদা। এই গানে রাগের আধারে ইচ্ছেমতো সুরের ইম্প্রোভাইজ়েশন করা হত।

শ্রীনন্দা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:০০
(বাঁ দিক থেকে) অরুণ মুখোপাধ্যায়, সঙ্গীত পরিবেশনে প্রকৃতি এবং মঞ্চে প্রত্যুষ।

(বাঁ দিক থেকে) অরুণ মুখোপাধ্যায়, সঙ্গীত পরিবেশনে প্রকৃতি এবং মঞ্চে প্রত্যুষ। — নিজস্ব চিত্র।

বাংলা সাধারণ রঙ্গমঞ্চ ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুষ্ঠান ‘রঙ্গালয়ের রবি’ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হল জ্ঞান মঞ্চে, নিবেদন করল স্থাপনা শান্তিনিকেতন। অনুষ্ঠানের শুরুতে নাট্যব্যক্তিত্ব অরুণ মুখোপাধ্যায়কে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হল। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনলেন তাঁর কণ্ঠে নাটক ‘জগন্নাথ’ ও ‘মারীচ সংবাদ’-এর দু’টি বিখ্যাত গান। এ দিনের অনুষ্ঠানের স্বাগত সম্ভাষণ হয় ১৯২৭ সালে সাধারণ রঙ্গমঞ্চে শিশিরকুমার ভাদুড়ী নির্দেশিত রবীন্দ্রনাথের ‘শেষরক্ষা’ নাটক অভিনয়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক ‘সরোজিনী’র জন্য রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন সেই ‘জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ’ গানটি। সেটি যে কী উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল, তা বিনোদিনীর লেখায় উল্লিখিত। এ দিনের অনুষ্ঠানেও সেই গান একই ভাবে মুগ্ধ করল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষায়, ‘সিলেক্ট অডিয়েন্স’-এর থেকে কী ভাবে বাংলা রঙ্গমঞ্চ বা সাধারণ রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথের নাটক, গান পরিচিত হল— এই অনুষ্ঠান তারই ছবি আঁকল।

‘রাজা বসন্ত রায়’ নাটকের গান ‘আজ তোমারে দেখতে এলেম’ গানটি বিশেষ ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বেদানা দাসীর গাওয়া এই গানটির রেকর্ডও পাওয়া যায়, যা বর্তমানে গাওয়ার ধরনের চেয়ে আলাদা। এই গানে রাগের আধারে ইচ্ছেমতো সুরের ইম্প্রোভাইজ়েশন করা হত। চমৎকার গাইলেন প্রকৃতি মুখোপাধ্যায়। সে গান তখনও ‘রবিবাবুর গান’, রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তির উপায়’ গল্পটি নাট্যাকারে ‘দশচক্র’ নামে অমৃতলাল বসুর স্টার থিয়েটারে অভিনীত হয়। রবীন্দ্রনাথের গল্প, অপরে তার নাট্যরূপ দিয়েছেন ও গ্রন্থাকারে ছাপানো হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল। এই নাটকে সবই সৌরীন্দ্রমোহনের লেখা গান। প্রামাণ্য সুর না পাওয়ায়, প্রকৃতি নিজেই সুর দিয়ে ‘বাংলাদেশে ঘর আমাদের’ গানটি শোনালেন। যথেষ্ট পরিণত শিল্পী না হলে ও উপযুক্ত গবেষণা না থাকলে সেই সময়োপযোগী সুরারোপ অসম্ভব। প্রকৃতি এ বিষয়ে সার্থক।

মধু বসুর জবানিতে জানা যায়, ‘দালিয়া’ মঞ্চস্থ করার সময়ে কিছু গান হারমোনাইজ় করা হয়েছিল। ইন্দিরা দেবী ও রবীন্দ্রনাথ তার প্রশংসা করেছিলেন। প্রত্যুষ মুখোপাধ্যায় ও প্রকৃতি চমৎকার হারমোনাইজ় করে শোনালেন ‘আমি চঞ্চল হে’ ও ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ’। ‘বিসর্জন’ নাটকে অন্ধ ভিখারির বেশে কৃষ্ণচন্দ্র দে গেয়েছিলেন ‘আঁধার রাতে একলা পাগল’। না জানি সে দিন কী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল! এ দিনও প্রকৃতি এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করলেন। সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর অসামান্য পাঠে পুরো অনুষ্ঠানটিকে বেঁধে রেখেছিলেন। তাঁর বোধ, শিক্ষা ও যত্ন যে কোনও পাঠ-কেই অন্য মাত্রা দেয়। পাঠের মাঝে হঠাৎই গেয়ে ওঠেন ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায়’। সে যেন আর এক প্রাপ্তি!

‘যোগাযোগ’ নাটকের স্ক্রিপ্টে ‘লক্ষ্মী যখন’ গানটি বাউল চরিত্রের গান বলে উল্লেখ আছে। চেনা-অচেনা দুই সুরেই গানটি শোনালেন প্রত্যুষ-প্রকৃতি। খোলা গলায় কোনও রকম ম্যানারিজ়ম ছাড়া বারবার মুগ্ধ করেছেন প্রত্যুষ। অনুষ্ঠান শেষ হল দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া ‘ওগো তোমরা সবাই ভালো’ গানটি দিয়ে। প্রকৃতির নিজের স্ক্রিপ্ট, কোনও গানে নিজের সুর, চমৎকার কণ্ঠ... সত্যিই অবাক করে! পরিপূরক রূপে পেয়েছেন প্রত্যুষকে। সঙ্গে সুজয় তাঁর পাঠে শ্রোতাদের বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করেন। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন সুরজিৎ দাস, সুভাষ পাল ও ঋতম বাগচী। এই শিল্পীরা প্রমাণ করেছেন, কতটা সংযত ও একে অন্যের পরিপূরক হওয়া যায়। পুরো অনুষ্ঠানটির রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ। এই ধরনের পরিবেশনা দর্শককে ঋদ্ধ করার পাশাপাশি ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখার উৎসাহ জোগায়। এই প্রজন্মের শিল্পীদের এমন গবেষণা ও উদ্যোগ আশার আলো দেখায়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rabindranath Tagore Cultural Program Gyan Manch

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy