×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৭ মে ২০২১ ই-পেপার

ভাবের খেলা দিয়ে

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
০২ জানুয়ারি ২০২১ ০১:২০

জলসা কিংবদন্তির গায়ক কে মল্লিকের গ্রামে অনেক নামী শিল্পীকে নিয়ে গাইতে যাচ্ছেন সে সময়ের সম্রাট-শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। বাস থেকে নেমে মোরামের পথ। গ্রামের লোকজন দল বেঁধে নিয়ে চলেছেন শিল্পীদের। এই সময়েই এক বৃদ্ধকে দেখা গেল। তাঁর চোখ কাউকে খুঁজছে। সকলেই অনুমান করলেন, কাকে। তাঁরা ধনঞ্জয়বাবুকে দেখিয়ে জানালেন, এই তো উনি। না, খুশি হলেন না সাদা দাড়ি। উল্টে প্রশ্ন, ‘‘সে আসেনি?’’ কিন্তু কার কথা বলছেন তিনি? জানা গেল, প্রবীণ খুঁজছেন এক নবীনকে। সেই নবীনও ছিলেন সে দলে। প্রবীণ জড়িয়ে ধরলেন নবীন পান্নালালকে। এবং ফুঁপিয়ে কান্না আর অস্ফুট উক্তি— ‘‘কী করে গাস তুই এ ভাবে! কী করে এমন ভাবে পারিস মাকে ডাকতে!’’ কে এই প্রবীণ? পান্নালালের যখন তিন বছর বয়স, তখন গোটা বাংলাদেশ ভাসছে একটি আগমনি যোগিয়ায়। মোরাম-পথের ওই যে প্রবীণ, সে গান ১৯৩৩ সালে তাঁরই গাওয়া নজরুল ইসলামের ভক্তিগান ‘জাগো যোগমায়া জাগো মৃন্ময়ী, চিন্ময়ী রূপে জাগো’। সেই প্রবীণ শিল্পীটি কে মল্লিক, যিনি নবীন পান্নালালকে জড়িয়ে ধরে অঝোর কাঁদছিলেন। কারণ, তিনি শুনে ফেলেছেন পান্নালালের রেকর্ড। পরম্পরার ঋণ বা ঋণের পরম্পরা। পান্নালালের ‘মেজদা’ ধনঞ্জয় পরে বলেছিলেন, ‘‘সে দিন আমার হিংসে হয়েছিল পানুকে!’’

কে মল্লিক এ-লেখায় আবারও ফিরে আসবেন। তার আগে আর একটি ছবি। সে ছবি পান্নালালের ৩৬ বছরের জীবৎকালের শেষের দিকের। কলকাতার বেহালা অঞ্চল। তাঁর এক অতি-সাধারণ বন্ধুর বাড়ি। বন্ধু তাঁর বাড়িতেই খুলেছেন পাটের দড়ির কারখানা। সেখানে কাজ করেন জনা পাঁচেক মানুষ। সপ্তাহে একবার সেই বাড়ি তথা কারখানায় আবির্ভাব ঘটত পান্নালালের। শুধু ওই বাড়িতেই নয়, আশপাশের প্রতিবেশী বাড়িতেও হাজির হতেন তিনি। লক্ষ্য, প্রধানত আড্ডা দেওয়া। পাশাপাশি গান শেখানোও। বেশ কিছু নবীন ছেলেমেয়েকে নিয়ে। তার বহু আগেই পান্নালাল বাঙালির হেঁশেলে ঢুকে গিয়েছেন। পাকা জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন বাঙালিমনে এবং প্রায় রোজই ছিল তাবড় জলসায় যোগ দেওয়া। কিন্তু তাতে সমস্যা হয়নি বিনেপয়সার গানের সে ভোজে।

গানের প্রতি তাঁর এই সমীহের কথা-কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর গান শোনার জন্য তৈরি করা হত নানা অছিলাও। ফুটবল, মাছ ধরা, ঘুড়ি ওড়ানোর প্রবল নেশা ছিল পান্নালালের। এই সব টোপেই ঘায়েল হতেন তিনি। এই ধরনের আমন্ত্রণ তিনি চোখকান বুজে গ্রহণও করতেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে বহু ক্ষেত্রেই দেখা যেত, মাছ ধরার বিঘোষিত পুকুরটি আদতে মাছহীন ছোট ডোবা বা ফুটবল ম্যাচটি পাড়ার মাঠের ফি-দিনের খেলাধুলোর মতোই। মাঝখান থেকে সে সব আয়োজনের আগে-পরে আমন্ত্রকদের প্রাপ্তি হত তাঁর সুকণ্ঠ শোনার। বালি, কলকাতা বা মফস্‌সল বাংলার বহু পাড়া সে দিন পান্নালালময়।

Advertisement

আলোর নাচন

‘অপার সংসার নাহি পারাপার’। ১৯৬৬ সালের রেকর্ড। এই বছরই জীবনে পূর্ণযতি পান্নালালের। গান রামপ্রসাদি। সুর ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের। কণ্ঠ তাঁর ছোট ভাই পান্নালাল ভট্টাচার্যের। অনুচ্চকিত হলেও সুরে গিরীশচান্দ্রেয় নাটকীয়তা। আবার সুরের কাঠামো গীতিকার-সুরকার দু’জনকেই চেনাচ্ছে। কথার ছবি তৈরি হচ্ছে সঘন তুফানে নৌকা নিয়ে পাড়ি দেওয়ার। আর গাইছেন যিনি, তিনি যেন কিছু না করেই অসীম কিছু করছেন। উচ্চারণে সেখানে মেজদাদা ধনঞ্জয়কে খানিক জড়িয়ে থাকলেও নতুন করে জীবন্ত করে তুলছেন আঠারো শতকের রামপ্রসাদ সেনকে।

এ জাদু কী ভাবে তৈরি হত? কোন পথে আসে এত মায়া, এত কান্না, এই আকুলতা? বোঝা মুশকিলই। তবে এই সঙ্গীতসঙ্গমের পিছনে ছিল গবেষণা, প্রশিক্ষণ, সততা এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা। ওঁরা যেন জানতেন, কী ভাবে গানকে মানুষের হৃদয়ে নিভৃত প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। সাবেক ভাঁড়ার থেকে গান নির্বাচন করা এবং সমসাময়িক সঙ্গীতকারদের সেরা কাজের ভাগীদার হওয়া— এই দু’দিক থেকেই উজ্জ্বল পান্নালাল-অধ্যায়। প্রথম ভাগে ধরা যেতে পারে রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, দাশরথি রায় বা রজনীকান্ত সেনের মতো চিরস্মরণীয়দের আখরকে। দ্বিতীয় ভাগে দিলীপকুমার রায়ের মতো কৃতী সঙ্গীতকারেরা।

স্বয়ম্ভু কেউই নয়। নানা ধারা, সংস্কৃতি, লোকাচার, ইতিহাসের সম্মিলনে সঙ্গীতও তৈরি হয়। বাংলার ভক্তিগানে তাই মার্গ সঙ্গীতের শাস্ত্রীয় প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনই আছে লোকসুরের বহুবর্ণ আস্তর। রামপ্রসাদের সুরকাঠামোয় বহু গুণী গান বেঁধেছেন। আবার বহু গান কার তৈরি, জানাও যায় না। এই মহাসমুদ্র থেকে নিজের কণ্ঠোপযোগী এবং নিজের সময়ের শ্রোতার রুচি-উপযোগী গান নির্বাচন করা চাট্টিখানি কথা নয়। এ কাজ ধারাবাহিক ভাবে করে গিয়েছেন পান্নালাল এবং তাঁর সতীর্থরা। ধনঞ্জয় বুঝেছিলেন, তাঁর ভাইয়ের কণ্ঠে এমন চুম্বক রয়েছে, যার আকর্ষণ-ধর্ম অমোঘ রাখার জন্য সহজ কথার সহজিয়া ভাব প্রয়োজন। শাক্তসঙ্গীতের তো অভাব ছিল না। গিরিশচন্দ্র ঘোষের মতো অনেক মহাপ্রতিভাও বহু ভক্তিসঙ্গীত রচনা করে গিয়েছেন। তার মধ্যে ‘কালবদ্ধ বর্তমানে ব্যোমকেশ ব্যোমপানে/নিত্যসত্য পূর্ণজ্ঞানে পূর্ণ মহেশ্বর’-এর মতো বাণী রয়েছে যেমন, তেমনই ‘জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই’ও আছে। এটি উদাহরণ মাত্র। কিন্তু পান্নালালের নির্বাচন দ্বিতীয় বয়ানের অনুসারী। তাই তিনি বেছে নেন রামপ্রসাদের ‘আসার আশা, ভবে আসা’, কমলাকান্তের ‘শ্যামা মা কি আমার কালো’, দাশরথি রায়ের ‘দোষ কারও নয় গো মা’, নজরুল ইসলামের ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায়’ কিংবা রজনীকান্ত সেনের ‘আমি সকল কাজের পাই হে সময়’-এর মতো গান। আর তাঁর সমসময়ে লেখা একাধিক ভক্তিগীতির মধ্যে বাঙালির খুব কাছের দু’টি গানের রচয়িতা দিলীপকুমার রায়। কান্তকবির দৌহিত্র এই গান দু’টি গ্রামোফোন কোম্পানির অনুরোধে বেঁধেছিলেন। একটি ‘আমি মন্ত্রতন্ত্র কিছুই জানিনে মা’। অন্যটি ‘আমি সব ছেড়ে মা ধরব তোমার রাঙা চরণ দু’টি।’ এই গান দু’টির শব্দচয়নে বিশ শতকের বাংলা কাব্যগীতির সুস্পষ্ট ছাপ। সব মিলিয়ে সেই সময় থেকে আজ অবধি পান্নালালকে নিজের করে নিতে প্রজন্মের অসুবিধে হয়নি। বাঙালি তাঁকে আধুনিক মনেই নিয়েছে এবং তার জন্য ইতিহাসের কঠিন তপস্যাও করতে হয়নি। ইতিহাসকেই যেন সমসময়ের সাজিতে কোমল স্বরে-সুরে ঢেলে দিয়েছেন পান্নালাল।

গীতিকার এবং সুরকার হিসেবে পান্নালাল পেয়েছেন এমন অনেককে, যাঁদের নাম আমবাঙালির মনে নেই। মনে আছে সে সব গানের গায়ককেই। সে সব সুরকারের অনেকে রামপ্রসাদের, কমলাকান্তের বা প্রচলিত অনেক পদে সুরারোপে-সঙ্গীতায়োজনে মাতিয়ে দিয়েছেন। চিত্ত রায়, ভোলানাথ বিশ্বাস, সতীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন চট্টোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ মিত্র, বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় আজ প্রায় বিস্মৃত। কিন্তু বেঁচে রয়েছে তাঁদের কাজ। পান্নালালের জন্যই তৈরি হয়েছে এঁদের অনেকের গান, অভিযোজনের কথা মাথায় রেখেই। সে অভিযোজন শিল্পীর কণ্ঠদক্ষতার প্রশ্নে নয়। কারণ, পান্নালালের কণ্ঠসম্পদ নিয়ে, তাঁর সারল্য-জারিত দক্ষতা নিয়ে ভাবনার অবকাশ কোনও দিনই ছিল না কারও। নিখুঁত স্বর-সুরস্থান, মাপে-মাপে ভাব সংযোজন, আধুনিক গায়কি আর চমক-চিকন শর্করা দানার অধিকারী সে কণ্ঠ। কোথাও কোনও বাড়তি নেই। ‘পাখি লয়ে বিবিধ ছলে শিকারী বিড়ালের খেলা’ পান্নালালের নয়। অভিযোজনের বিষয়টি আসলে নিহিত গায়কিতে। যেখানে অভিসিঞ্চিত ভক্তিরস, যেখানে জড়িয়ে মায়া, যেখানে নিক্তি-মাপা নিবেদন, যেখানে ভক্তিরস প্রেমে অনূদিত। তাই আবহমান থেকে আধুনিক— সব স্রষ্টাই পান্নালালে এসে পান্নালালের হয়ে ওঠেন।

তীরে তীরে গুঞ্জন

সুর আর কথা পান্নালালে এসে পান্নালালের হয়ে ওঠার রসায়ন শুধু যে তাঁর ভক্তিগানেই ধরা পড়ে, এমন নয়। তার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে বিস্ময়কর ভাবে অনালোচিত তাঁর বাংলা আধুনিক গানেও। ১৯৪৯ সালে অনিল ভট্টাচার্যের কথায় ও নির্মল ভট্টাচার্যের সুরে বাঁধা ‘যে বীণা বাজিয়ে গেলে’ বা ১৯৫৫ সালে দেবেশ বাগচীর সুরে আর শান্তি ভট্টাচার্যের কথায় ‘রূপালি চাঁদ জাদু জানে’ কিংবা ১৯৫৬ সালে মমতা চট্টোপাধ্যায়ের কথা আর প্রবীর মজুমদারের সুরে ‘তীরে তীরে গুঞ্জন’ তার প্রমাণ। আবার ১৯৬০ সালে শ্যামল ঘোষের কথা আর অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে ‘ও আমার কাজলপাখি’ও চমকে দেয়। সুরের গঠন এখানে তুলনায় একেবারে অন্য রকম এবং আরও আধুনিক। সেখানেও ‘সিগনেচার’ পান্নালালের। তবে ভক্তিরসের আবেগ কী ভাবে প্রেমের কাঠামো তৈরি করে তাঁর গানের কুমোরটুলিতে, তার অনুপম উদাহরণ প্রফুল্ল ভট্টাচার্যের সুরে এবং রামকৃষ্ণ চন্দের কথায় ‘সুন্দর তুমি ভালবাস ফুল তাই সেজেছি গো ফুলসাজে’। এ গানে ‘তব লাগি মোর প্রেমের ভুবনে চিরবসন্ত রাজে’র মুহূর্তে পলাশ ফুটে ওঠে, বসন্ত জাগ্রত হয়, প্রেম অবতীর্ণ হয়। এবং সে সবই ঘটে অতিভাব-বর্জিত ভক্তিকীর্তনের চলনে। একই ভাবে ‘তীরে তীরে গুঞ্জন’ গানটির ‘যে তরণি ডুবেছে আশাহীন পাথারে’ অংশে ‘পাথারে’ উচ্চারণে মনে পড়ে যায় ‘ভেবে দেখ মন কেউ কারও নয়’ ভক্তিগীতির ‘যার জন্য মরো ভেবে, সে কি তোমার সঙ্গে যাবে’র নিয়ন্ত্রিত-সান্দ্র গায়কি।

এতকাল ধরে চলে আসা অতিভাবের গায়কি থেকে ভক্তিরসের গানেও কেন সরে এলেন পান্নালাল? অনেকটাই সময়ের দাবি আর খানিকটা তাঁর চিরগুরু মেজদার শিষ্য হওয়ার কারণে। তা না করে যে সমসাময়িক শিল্পীদের গত্যন্তর ছিল না, এমন নয়। ভাবের আতিশয্যের চল তখনও বিলক্ষণ ছিল। কিন্তু ভট্টাচার্যেরা ব্যতিক্রমী ছিলেন। যেমন ব্যতিক্রমী ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, বনশ্রী সেনগুপ্ত, হৈমন্তী শুক্ল প্রমুখ। কিন্তু পান্নালালের চ্যালেঞ্জটা ঢের বড় ছিল। কারণ, তাঁকে ভাবালুতা কমাতে হচ্ছে ভক্তিগানেও। বিস্ময়ের বিষয়, সেই নিক্তি-মাপা ভাবের গানই বাঙালির ঘরের গান হয়ে উঠল, কালীসাধনার সমার্থক হয়ে উঠল এবং শাক্তরসের সঙ্গে বৈষ্ণবরসের গান্ধর্ববিবাহ ঘটাল নতুন করে। তাতে না রইল গায়কের অতি ভাবের গুরুভার, না রইল শ্রোতার গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠায় প্রতিবন্ধকতা। ‘মা গো মুছিয়ে দে মোর এ দু’টি নয়ন, মুছিয়ে দে স্নেহভরে’। এই ‘মা’ ডাকে শুধু ভক্তি নয়, গার্হস্থ-বাৎসল্য-ভালবাসার রেণু।

যাঁর গানের অভিব্যক্তিতে মুগ্ধ শচীনকর্তা, সেই ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের বিখ্যাত মন্তব্যটি চিরস্মরণীয়— ‘‘পান্নার মতো ওরকম নাড়িছেঁড়া মা ডাক ডাকতে পারলাম কই!’’

হাতছানি দিয়ে ডাকে

বর্ণময় স্বল্প-পরিসর জীবন তাঁর। ১৯৩০ সালে জন্ম। বেড়ে ওঠা হাওড়ার বালিতে। পাড়ার মাঠে খেলার সময়ে বল চোখে লাগা এবং চোখ নষ্ট হওয়ার উপক্রম। দাদা ধনঞ্জয় ভর্তি করান কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। দীর্ঘ চিকিৎসায় দৃষ্টিশক্তি রক্ষা পেলেও এক চোখের মণির চিরকালের জন্য স্থানচ্যুতি। গানবাড়ির সুবাদে ছোট থেকেই গানপাগল। ধনঞ্জয় তাঁর নামেই দাদা। এগারো ভাইবোনের সর্বকনিষ্ঠ, মাতৃজঠরে থাকাকালীন পিতৃহারা পান্নালালের কাছে শিল্পী বড়দা প্রফুল্ল আর মেজদা ধনঞ্জয় কার্যত বাবা-ই। ধনঞ্জয়ই প্রশিক্ষণের জন্য ভাইকে পাঠান জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ আর যামিনীরঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। পান্নালাল আর তাঁর বাল্যবন্ধু সনৎ সিংহকে বড়দা প্রফুল্ল নিয়ে যান এক জলসায়। কিন্তু ‘গলা তৈরি হয়নি’ বলে দু’জনের কেউই মঞ্চে উঠতে পারেননি। একই অভিজ্ঞতা গ্রামোফোন কোম্পানিতেও। দাদাদের চেষ্টাতেই পরে মেগাফোন কোম্পানিতে সুযোগ পাওয়া। আধুনিক বাংলা গান দিয়ে শুরু। ধনঞ্জয়ের সিদ্ধান্তে শ্যামাসঙ্গীতে আসা। বিষয়টি ঐতিহাসিকই। যে ভাবে নজরুল ইসলাম এবং সে কালের রেকর্ড কোম্পানির কর্তারা বুঝেছিলেন, বাংলা ইসলামি সঙ্গীতের চাহিদা থাকলেও রেকর্ড নেই। এর পরেই সোনার মুহূর্ত ইসলামি গানে, গঙ্গাপাড়ে নজরুলের হাত ধরে। তেমনই, শিল্পীর শিল্পী ধনঞ্জয়ও বুঝেছিলেন, ভক্তিসঙ্গীতে নতুন কণ্ঠ দরকার। যদিও তিনি নিজেই সে সময়ে ভক্তিগীতিরও অন্যতম প্রধান কণ্ঠ। তবু তাঁর মনে হয়েছিল, পান্নালালের জন্য ইতিহাস অপেক্ষা করে আছে। ভাইকে দিয়ে ভক্তিগীতি রেকর্ড করানোর সুপারিশ করেন তিনি। একাধিক গান রেকর্ড করেন পান্নালাল, যেগুলির প্রায় সবই পরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠে। কিন্তু মাইলফলক ‘আমার সাধ না মিটিল’। যে গান প্রসঙ্গে সঙ্গীতবেত্তা সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন— ‘গড় বাঙালির সবচেয়ে আন্তরিক মর্মগাথা’। অতুলকৃষ্ণ মিত্রের লেখা সেই গানের পর বাকি ইতিহাসের নাম পান্নালাল।

রেকর্ড কোম্পানিগুলির বাণিজ্য উপচে গিয়েছে পান্নালালকে মাত্র ১৯ বছর পেয়েই। গানচুরির নয়া জমানার আগে অবধি ছবি একই ছিল। গৃহস্থ শুনেছেন তাঁকে। শিশু বেড়ে উঠেছে তাঁকে শুনে। গঙ্গা, পদ্মা, তিস্তা, তোর্সা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, মাতলার মাঝি-মাল্লার ধুন হয়ে উঠেছে ‘মা গো আনন্দময়ী’, ‘সকলি তোমারই ইচ্ছা’রা। কোনও বিশেষ সম্প্রদায় তাঁকে শুনেছে, এমনটা নয় মোটেই। আমবাঙালি শুনেছেন, ভালবেসেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে বহু কালীমন্দিরের আশপাশের ফুলের দোকানের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে বেজেছে ‘আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন’।

‘বিষণ্ণতা’ শব্দটিকে সর্বার্থে বিষণ্ণ ভাবার মধ্যেই ভাবনার বিষণ্ণতা আছে। তার বড় প্রমাণ পান্নালাল। তাঁর কণ্ঠ অন্তর থেকে বিষণ্ণ আর সেটিই তাঁর জাদু। তাই করুণরসের রাজত্ব তাঁর গায়কিতে। ব্যক্তিগত জীবনে যদিও প্রথম দিকে বিষণ্ণ ছিলেন না তিনি। হইহই করে বেড়ানোর জন্য নাম ছিল তাঁর। সংসারে, রেকর্ডিংয়ে, জলসায়, ময়দানে, আড্ডায় প্রাণচঞ্চল মানুষ একজন। চপ-কাটলেটে নিষ্ঠা, রান্নায় পারদর্শিতা, সরস্বতীপুজোয় ঘুড়ির লড়াই থেকে ‘সাড়ে ৭৪’ ছবিতে বন্ধু মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্রদের সঙ্গে অভিনয় করার অনুমতি চাইতে গিয়ে মেজদার কাছে থাপ্পড়— সব মিলিয়ে চেনা বাঙালি।

বন্ধু-অন্ত প্রাণ গোটা জীবন। রামপ্রসাদের ‘চাই না মাগো রাজা হতে’র রেকর্ডিং। পান্নালাল রেকর্ডিং শেষে স্টুডিয়োর বাইরে বেরিয়ে দেখলেন, মানবেন্দ্র অপেক্ষায় তাঁর নিজের রেকর্ডিংয়ের জন্য। তা জেনে পকেট থেকে দক্ষিণেশ্বরের প্রসাদী ফুল বার করে বন্ধুকে দিলেন। রেকর্ডিংয়ের সময়ে পকেটে রাখার ভালবাসার পরামর্শ। মানবেন্দ্রের সে দিনের গানটি প্রেমের গানই ছিল— ‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি’।

এই আত্মীয়তা, এই জমিয়ে রাখার জীবন থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছিলেন পান্নালাল। আভিধানিক অর্থের বিষণ্ণতাই নাকি গ্রাস করেছিল তাঁকে, ৩৬ বছরের জীবনের শেষের দিকে। আত্মহনন সেই ইঙ্গিতই দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাঙালির পুকুরপাড়ের বৃত্তান্তে দায় চাপানো হয়েছিল সাংসারিক অশান্তিকে। যদিও বিন্দুমাত্র ভিত্তি নেই এই তথাকথিত আবিষ্কারের। বরং যা জানা যায়, সেটুকু হল এই— সাধকসত্তা তাঁকে ক্রমশ না-বলা বাণীর ঘনযামিনীর স্পর্শ দিচ্ছিল। সেখানে অন্য এক পান্নালাল। শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গঙ্গার ধারে একা অশ্রুময়। কালীদর্শনের ভাবোন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। তাঁর বন্ধু-পরিজনের লেখায় সেই ইঙ্গিতই রয়েছে।

তবে বিষণ্ণতা তো বটেই। সে বিষণ্ণতা পরিবার-পরিজন ছাড়িয়ে আমবাঙালির, বাংলা গানের ইতিহাসের। পান্নালাল কেন বাঙালির শ্রুতিকে আরও বহু-বহু প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করলেন, এ অভিমান তো মুছে ফেলার নয়! ‘ওপার আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে’, ‘তোমার মতো আমিও তো কত সয়েছি’র মতো গান শিল্পসুন্দরই। কিন্তু তাকে জীবনের বিনিময়ে বোঝার প্রয়োজন ছিল খুব? বাঙালির এই অভিমান অনপনেয়।

লক্ষ শূন্য, লক্ষ বাসনা

পান্নালালের কাছে কী পেয়েছে বাঙালি? কী শিখেছে? কণ্ঠ, গায়কি, ভক্তি, প্রেম তো বটেই। উপরি পাওনা গূঢ় তত্ত্বনদীর সরল সাঁকো। পান্নালাল ছাড়া আর কোন গানবিজ্ঞানী শক্তিসূচনার উদ্দেশ্যে প্রশ্নমান কমলাকান্তের কাছে এ ভাবে আধুনিক বাঙালিকে পৌঁছে দেন— ‘ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি’? কিংবা ওই একই শাক্তকবির সেই আউল-সুফি উচ্চারণের মুখোমুখি দাঁড় করানো— ‘শ্যামা কখনও পুরুষ, কখনও প্রকৃতি, কখনও শুনাকার হে/মায়ের সে ভাব ভাবিয়া কমলাকান্ত সহজে পাগল হল রে’। ‘সহজে পাগল’? বাঙালি কবিরই আবাদ করা প্রসাদি-সুরের কমলা সোনা। কিন্তু ক’জন বাঙালি এই কাব্যভাষে থমকেছেন পান্নালালের কণ্ঠে কমলাকান্ত এ গান শোনানোর আগে?

তবু পান্নালালকে মনে রাখবে তো এ মাটির আগামী সব প্রজন্ম? চিন্তা অস্বাভাবিক? আর এক পান্নালালকে তো বাঙালি মুছেই দিয়েছে জাতির জীবন থেকে! কীর্তনখোলার বাঙালি বাঁশির জাদুকর পান্নালাল ঘোষকে! কালীপুজোয় ভট্টাচার্য এখনও অবধি বাজলেও, ঘরে-বাইরে ঘোষ বাজেন না। ভট্টাচার্যও এখন প্রধানত কালীপুজোয় বাজেন। আশঙ্কা হয়, অতীত ভুললে আগামী বাঁচবে তো? অতীত ভুললে আমরা পারব এই কঠিন বর্তমানে ‘নিম খাওয়ালে চিনি বলে’র গোঙানি বুঝে উঠতে? হয়তো অসম্ভব হয়ে উঠবে এটাই বুঝে ওঠা যে, ভক্তিসঙ্গীত কোনও সম্প্রদায়ের নিজস্ব সম্পত্তি নয়, তা একা গড়েও ওঠে না। যেমন, কালীভক্ত পান্নালাল শুধু কালীভক্তের নন। কোনও বিশেষ ধর্মের নন। শুধু আস্তিকেরও নন। অন্ধকার সময়েই এই সব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল আলোর সন্ধানে। আবার অন্ধকার সময়েই সে সব যেন নিভুনিভু হয়ে ওঠে। এখন যেমন অমাবস্যার অন্তহীনতা।

যে প্রবীণ সে দিন পান্নালালকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী করে এমন গাইতে পারেন তিনি, সেই কে মল্লিকের আদত নাম মহম্মদ কাশেম। সে কালের চূড়ান্ত সফল শিল্পী। যিনি শ্যামাসঙ্গীত রেকর্ড করতেন ‘কে মল্লিক’ নামে। উল্টোটাও ঘটত। বাংলা ইসলামি গান চিত্ত রায় গাইতেন ‘দেলওয়ার হোসেন’ নামে আর ধীরেন্দ্রনাথ দাস নাম নিতেন ‘গনি মিয়াঁ’। সচেতন ভাবেই করতেন। ধর্ম-বাণিজ্যের সূচক ভেবে নয়। ওঁরা আরও একটি সত্য জানতেন— ‘একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুই জনে/গাহিবে একজন খুলিয়া গলা, আরেক জন গাবে মনে’। এঁরা গাইতেন এবং আমবাঙালিকে মনে-মনে গাওয়াতেনও। কে মল্লিক, ভবানী দাস, দিলওয়ার হোসেন, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যদেরই উত্তরসূরি পান্নালাল। তবে তাঁর প্রস্ফুটন তুলনায় বেশি আধুনিক। সে খানিক কলসপত্রী গাছের মতো, যা পতঙ্গের হৃদয় খায়। সম্প্রদায়-নির্বিশেষে বাঙালির হৃদয়ও কুরে খেয়েছেন পান্নালাল।

ঐতিহাসিক ভাবেই বাঙালি পেরেছে বিভেদ-ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠতে। পেরেছে শক্তিসাধনার বৈষ্ণব-আখ্যান তৈরি করতে। চর্যাপদের আঁচে বাঙালি নরম হতে শিখেছিল বলেই বোধ হয় লোকগাথার কন্যা শ্যামা বেড়া বাঁধায় হাত লাগায় রামপ্রসাদের আখরে। সেখানে মার খায় না সংসাররহিত তত্ত্ব, নস্যাৎ হয় না অন্নদামঙ্গলের সংসার-আর্তিও। উত্তরাধিকারের ধর্মনিরপেক্ষ এই স্রোতে শ্লাঘাই প্রাপ্য বাঙালির।

কিন্তু কোন বাঙালির? এ প্রশ্ন আজ সত্যিই উঠছে না? শঙ্কা হয়, একদিন এমন হবে না তো, যখন বাঙালি বুঝেই উঠতে পারবে না যে, বাংলা গানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া আর এক বাঙালি সঙ্গীতকার কবীর সুমন কেন গেয়েছিলেন— ‘ছিল পান্নালালের শান্ত মিঠে গলায় বুকের বাস্তুভিটে শান্তি পেত’?

ঋণ: দীপঙ্কর ভট্টাচার্য,

যূথিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

Advertisement