E-Paper

সুন্দর শাস্ত্রীয় নৃত্যসন্ধ্যা

সে দিন সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল আরুশি মুদগলের নৃত্য পরিবেশনা। যেমন সুন্দর তাঁর ভাবের ব্যঞ্জনা, তেমনই সুন্দর নৃত্যমূর্ছনা।

বিপাশা মাইতি

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪১
নৃত্যানুষ্ঠানের অংশ।

নৃত্যানুষ্ঠানের অংশ।

সম্প্রতি দর্পণী প্রযোজিত দু’দিন ব্যাপী ‘মর্দালা মঞ্জিরা’ নৃত্যোৎসব অনুষ্ঠিত হল জ্ঞানমঞ্চ প্রেক্ষাগৃহে। এ বছরের নৃত্যোৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন। প্রথম দিন অনুষ্ঠানের সূচনা হয় গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সম্মানীয় অতিথিবৃন্দ এবং অতিথি নৃত্যশিল্পীদের বরণ করে নেন দর্পণীর কর্ণধার অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়। মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় গুরু রঞ্জনা গৌহরের ‘কুরু যদুনন্দন’ নৃত্য দিয়ে। মিশ্র কাফি রাগ ও যতি তালে নিবদ্ধ ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে নেওয়া এই নৃত্যাংশে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার মিলনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। গুরু রঞ্জনা তাঁর সুন্দর শৃঙ্গার ভাবরস দ্বারা রাধাকৃষ্ণের যুগল মিলনের রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তী শিল্পী গুরু রঞ্জনা গৌহরের শিষ্যা বৃন্দা চাড্ডা। তাঁর পরিবেশনা ‘রাধারানী সঙ্গে নাচে মুরলীপানি’। প্রাণোচ্ছল পরিবেশনা।

সে দিন সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল আরুশি মুদগলের নৃত্য পরিবেশনা। যেমন সুন্দর তাঁর ভাবের ব্যঞ্জনা, তেমনই সুন্দর নৃত্যমূর্ছনা। ওড়িশি নৃত্যশৈলীর ভঙ্গিগুলি যখন ব্যবহার করছেন— মনে হচ্ছে, কোনও ভাস্করের শিল্পকার্য! তিনি পরিবেশন করেন ‘কমলা’ ও ‘ঘনামধুনা’। যৌথ ভাবে গুরু মাধবী মুদগলের সঙ্গে পরিবেশন করেন ‘দ্বিধা’— যেখানে নিখুঁত ভাবে ‘যতি’ ও ‘বোল’ ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তী শিল্পীদ্বয় রাজশ্রী প্রহরাজ এবং গুরু কেলুচরণের পৌত্রী প্রীতিশা মহাপাত্র। তাঁদের নিবেদন ‘রামচন্দ্র’। এখানে সঞ্চারী ভাবের মাধ্যমে শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন ‘হরধনুভঙ্গ’ এবং ‘সীতা স্বয়ম্বরা’ অভিনয়। রাম-রাবণের যুদ্ধের দৃশ্যে রামরূপী প্রীতিশা এবং রাবণরূপী রাজশ্রীর অভিনয় অনন্যসাধারণ। ওই সন্ধ্যার শেষ শিল্পীদ্বয় গুরু রতিকান্ত মহাপাত্র এবং বিদুষী সুজাতা মহাপাত্র। তাঁদের নিবেদনে ছিল ‘জটায়ু মোক্ষ’। জটায়ুর ভূমিকায় গুরু রতিকান্ত মহাপাত্রের অনবদ্য অভিনয় দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল। রাবণরূপী এবং রামরূপী সুজাতা মহাপাত্রের দৃপ্ত বলিষ্ঠ ভঙ্গিমা ছিল সুন্দর। ওই সন্ধ্যায় দর্পণী পরিবেশন করে ‘শিবরঞ্জনী পল্লবী’ ও ‘শিবতাণ্ডব’। নৃত্যাংশ দু’টির পরিকল্পনা ও পরিচালনা গুরু অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মঞ্চ জুড়ে দর্পণীর শিল্পীদের সমবেত নৃত্য পরিবেশনা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।

নৃত্য পরিবেশনে শিল্পী

নৃত্য পরিবেশনে শিল্পী

দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছিল দর্পণীর ছাত্রছাত্রীদের নৃত্য পরিবেশনা দিয়ে। ছোট ছাত্রছাত্রীদের নিষ্ঠাপূর্ণ নৃত্য পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকবৃন্দকে অভিভূত করে। কয়েক জন ছাত্রী যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। এঁরা হলেন সৌমিলী সাধুখাঁ, কস্তুরী চক্রবর্তী, ঈশানী মুখোপাধ্যায়, সুহানী সরকার, স্নেহা হাজরা। তাঁদের নৃত্য পরিবেশনা, মুদ্রার প্রয়োগ, ভাব এবং ছন্দের মূর্ছনা সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। সেই সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিল দর্পণী প্রযোজিত ও গুরু অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিকল্পিত ও পরিচালিত ‘অনন্ত’। এই উপাখ্যানের বিষয়বস্তু পৌরাণিক। বেদ ও উপনিষদ থেকে গৃহীত। গোটা বিশ্বে আদি ও অন্ত রূপে আছে পঞ্চভূত অর্থাৎ বায়ু, জল, অপার্থিব, ভূমি ও অগ্নি। পঞ্চভূত হতেই তার সৃষ্টি, আবার পঞ্চভূতেই সে বিলীন হয়ে যায়। পঞ্চভূতের এই ভাবনাকে দর্পণীর শিল্পীরা পরিপূর্ণ ভাবে মঞ্চস্থ করেছেন। স্পষ্ট মুদ্রা প্রয়োগ ও বলিষ্ঠ নৃত্যশৈলীতে ফুটিয়ে তুলেছেন পঞ্চভূতের ভাবনা, সৃষ্টি ও বিনাশ।

নৃত্য পরিকল্পনা, সমবেত পরিবেশনা, পোশাকের ব্যবহার আকর্ষক। দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সোহম দে, অনুস্মিতা ভট্টাচার্য, অনয়া ঘোষ এবং নিকিতা দাস। সুন্দর এই প্রযোজনার কৃতিত্ব দর্পণীর কর্ণধার গুরু অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই নৃত্যাংশে তাঁর পরিবেশনায় পরিলক্ষিত হয় নিখুঁত স্নিগ্ধসুন্দর নৃত্যভঙ্গিমা, স্পষ্ট মুদ্রা প্রয়োগ ও ওড়িশি নৃত্যশৈলীর লালিত্য। এককথায় ‘অনন্ত’ একটি বলিষ্ঠ উপস্থাপনা। সে দিনের সন্ধ্যার তিন অতিথি নৃত্যশিল্পী রীনা জানা, নন্দিনী ঘোষাল ও কাকলি বসুর নৃত্য পরিবেশনা দর্শককে আনন্দ দেয়। বহু দিন পরে সুন্দর একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যানুষ্ঠানের সাক্ষী থাকলেন দর্শকবৃন্দ।

অনুষ্ঠান

রুদ্রপ্রসাদ, দেবশঙ্কর, জয় ও রেজ়ওয়ানা।

রুদ্রপ্রসাদ, দেবশঙ্কর, জয় ও রেজ়ওয়ানা।

  • পূর্ব পশ্চিম নাট্যদলের পক্ষ থেকে দেবশঙ্কর হালদারের শততম নাট্যে মঞ্চ-অভিনয়ের জন্য জীবনকৃতি সম্মাননা প্রদান করা হল। অনুষ্ঠান শুরু হয় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার রবীন্দ্রসঙ্গীতে। শিল্পীর ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’, ‘দূরে কোথায় দূরে দূরে’ মুগ্ধ করে শ্রোতাদের। সৌমিত্র মিত্র স্বাগত ভাষণে দেবশঙ্করের শততম নাট্যমঞ্চে অভিনয়ের সাধুবাদ জানিয়ে তাঁর শ্রম, নিষ্ঠা, একাগ্রতার কথা তুলে ধরেন। পূর্ব পশ্চিম-এর পক্ষে তিনি মানপত্র তুলে দেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, জয় গোস্বামী ও দেবশঙ্করের হাতে। শ্রীজাতর লেখা মানপত্র পাঠ করেন অভীক মজুমদার। নিজের ভাষণে রুদ্রপ্রসাদ নান্দীকারে আসা সেই লাজুক দেবশঙ্করের কথা বলেন, যিনি মমত্ব দিয়ে নানা চরিত্রে অভিনয় করেও পাশের মানুষকে কখনও ভোলেন না। দেবশঙ্কর নিজের ভাষণে নিজের চারপাশের মানুষের কথা বলেন। প্রত্যেক দিন বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় তাঁকে কেমন করে নানা মানুষের সুলুকসন্ধান দেয় সেই গল্প বলেন।
  • সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পরিবারের ঐতিহাসিক পুজোপ্রাঙ্গণে সম্প্রতি আয়োজন করা হয়েছিল এক সঙ্গীত সম্মেলনের। অনুষ্ঠান শুরু করেন শিল্পী সানিয়া পাঠানকর। তাঁকে তবলায় সঙ্গত করেন রোহন বসু। এর পরের নিবেদন ছিল চতুরঙ্গী ও তবলার দ্বৈতবাদন। চতুরঙ্গীতে ছিলেন পণ্ডিত দেবাশিস ভট্টাচার্য এবং তাঁর পুত্র সূর্যদীপ্ত ভট্টাচার্য। তবলায় ছিলেন পণ্ডিত সমর সাহা। দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরু হয় গৌতম রায়চৌধুরীর রাগ যোগ দিয়ে। তার পর সরোদে কেদার রাগ শোনালেন অভিষেক লাহিড়ী। আলাপ- জোড়-ঝালা এবং ঝাঁপতালে বাঁধা অসাধারণ এক উপস্থাপনা। তার পর পরিবেশিত হয় রাগ শুদ্ধ বসন্ত, তবলায় সঙ্গত করলেন পণ্ডিত পরিমল চক্রবর্তী। এ দিন সন্ধ্যার শেষ শিল্পী ছিলেন পদ্মশ্রী পণ্ডিত রুনু মজুমদার। শিল্পীর সুরেলা বাঁশিতে অনুষ্ঠানমঞ্চ এক অপার্থিব রূপ নেয়। শিল্পীকে যোগ্য সাহচর্য করেন তাঁর শিষ্য কল্পেশ এবং তবলায় পণ্ডিত প্রসেনজিৎ পোদ্দার। অনুষ্ঠানের শেষ দিন যুগলবন্দি উপস্থাপনা করেন সরোদে দেবজ্যোতি বসু এবং তবলায় বিক্রম ঘোষ। এই সঙ্গীত সম্মেলনের শেষ নিবেদন ছিল সেতার ও তবলার যুগলবন্দি। সেতারে ছিলেন বেনারস ঘরানার প্রখ্যাত শিল্পী নরেন্দ্র মিশ্র এবং তাঁর পুত্র অমরেন্দ্র মিশ্র। তবলায় ছিলেন কুমার বসু। তিন দিনের এই সম্মেলন শেষে সভাপতি তন্ময় রায়চৌধুরী প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gyan Manch Dance

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy