E-Paper

‘ছায়ানট’-এর কার্যালয়ে আক্রমণ বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের সঙ্কট

ছায়ানট যে-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, সেখানে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় গৌণ। মানুষ আগে মানুষ, তার পর সে কোনও ধর্মের। এই বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই মৌলবাদী রাজনীতির মূল শত্রু। যে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বাংলা সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তারা জানে, এই সংস্কৃতিই বাঙালির সবচেয়ে বড় শক্তি।

এফ এম শাহীন

শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৬
আক্রান্ত: উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব ও ভাঙচুরের পর বিধ্বস্ত ‘ছায়ানট’-এর দফতর।

আক্রান্ত: উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব ও ভাঙচুরের পর বিধ্বস্ত ‘ছায়ানট’-এর দফতর।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ‘ছায়ানট’ শুধু একটি সংগঠন নয়— এটি একটি চেতনা, এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার জন্য বাঙালিকে তার নিজস্ব সংস্কৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার যে প্রয়াস, তারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ‘ছায়ানট’। ১৯৬১ সালে জন্ম নেওয়া এই সংগঠন শুরু থেকেই যে অবস্থান নিয়েছিল, তা ছিল রাষ্ট্রীয় দমন, সামরিক শাসন ও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। ফলে আজ যখন ইসলামি উগ্র মৌলবাদ ছায়ানটকে টার্গেট করে, তখন তাকে বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এ আসলে বাংলা সংস্কৃতি, বহুত্ববাদী সমাজ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আঘাতেরই অংশ। উগ্রপন্থী উত্থান, বাংলা সংস্কৃতির উপর আঘাত এবং বাংলাদেশের আত্মপরিচয়ের সঙ্কটকে স্পষ্ট করে দিল ‘ছায়ানট’-এর উপর নেমে আসা আঘাত।

বাংলা ১৩৬৮, ইংরেজি ১৯৬১— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সারা বিশ্বে উদ্‌যাপনের ঢেউ ওঠে। পাকিস্তানি শাসনের থমথমে পরিবেশে, যেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও বাঙালি সংস্কৃতিকে সন্দেহের চোখে দেখা হত, সেখানেই ঢাকার সংস্কৃতি-সচেতন মানুষজন সাহস করে এগিয়ে আসেন। বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদ, অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী— এই বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যুক্ত হন কবি সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল হক, সন্‌জীদা খাতুন-সহ বহু সংস্কৃতিকর্মী। সরকারি নিষেধ অগ্রাহ্য করে তাঁরা রবীন্দ্র-শতবর্ষ উদ্‌যাপন করেন। এই সফল উদ্যোগ বাঙালির আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে— সংস্কৃতির শক্তি দিয়েও প্রতিরোধ সম্ভব।

শতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের পর এক বনভোজনে গড়ে ওঠে ঐকমত্য, এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। সেখান থেকেই ‘ছায়ানট’-এর জন্ম। রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্রভাবনাকে অবলম্বন করে ‘ছায়ানট’ যাত্রা শুরু করলেও, লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর— বাঙালির শাশ্বত সংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশ।

এই আদর্শই মৌলবাদীদের কাছে ভয়ঙ্কর। কারণ ছায়ানট যে সংস্কৃতি লালন করে, সেখানে ধর্মীয় পরিচয় মানুষের একমাত্র পরিচয় নয়; মানুষ আগে মানুষ, তার পর সে যে কোনও ধর্মের। এই বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই মৌলবাদী রাজনীতির মূল শত্রু।

ইতিহাস বলে, উগ্রপন্থা সব সময় প্রথম আঘাত করে সংস্কৃতিতে। গান, কবিতা, নাটক, উৎসব— এ সব মানুষের কল্পনা ও চিন্তার জগৎ খুলে দেয়। প্রশ্ন করতে শেখায়। ভয় ভাঙায়। তাই মৌলবাদী শক্তি জানে, সংস্কৃতি ধ্বংস করতে পারলে মানুষের প্রতিরোধও দুর্বল হবে।

বাংলা সংস্কৃতি তাদের চোখে কাঁটা। কারণ বাংলা সংস্কৃতি অসাম্প্রদায়িক। এখানে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, নজরুলের বিদ্রোহ, লালনের প্রশ্ন— সবই ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার বিপ্রতীপে। ‘ছায়ানট’-এর নববর্ষের প্রভাতী সঙ্গীতানুষ্ঠান এই অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ। তাই বারংবার এই আয়োজনকে টার্গেট করা হয়েছে; হামলা হয়েছে; ভয় দেখানো হয়েছে।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ‘ছায়ানট’-এর সাংস্কৃতিক ভূমিকা ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী। গান, আবৃত্তি, আলোচনা— এ সবের মাধ্যমে জাতিসত্তার চেতনা জাগ্রত করা হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরিতে ‘ছায়ানট’-এর অবদান অনস্বীকার্য।

স্বাধীনতার পরেও সে নিজেকে শুধু একটি সঙ্গীত বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ রাখেনি। দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ত্রাণ সংগ্রহ, শিক্ষা ও সমাজচর্চা— সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় থেকেছে। ষাটের দশকের গোর্কি ঝড়, ১৯৭০ সালের জলোচ্ছ্বাস, উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা— প্রতি বারই ‘ছায়ানট’ গান গেয়ে, ভিক্ষা-মিছিল করে তহবিল সংগ্রহ করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই মানবিক ধারাবাহিকতা ‘ছায়ানট’কে দিয়েছে এক ধরনের নৈতিক কর্তৃত্ব, যা সহিংস রাজনীতির পক্ষে অস্বস্তিকর।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সহিংসতার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের। ২০২৪-এর ৫ অগস্ট-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ; সাধারণ মানুষ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকদের উপর হামলা; স্বাধীনতার স্মারক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ— এ সব ঘটনা একটি ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়, এর লক্ষ্য একটাই: ত্রাস সঞ্চার, ভিন্নমত দমন এবং রাষ্ট্রকে উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়া।

এই প্রেক্ষাপটে ‘ছায়ানট’কে টার্গেট করা খুব স্বাভাবিক। কারণ ‘ছায়ানট’-এর সংস্কৃতি মানুষকে ভয় না পেতে শেখায়। যেখানে গান মানুষকে একত্র করে। যেখানে বাঙালিত্ব ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ায়। উগ্র মৌলবাদী শক্তি জানে— এই জায়গাগুলো ভেঙে না দিলে তাদের প্রকল্প সফল হবে না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় একটি গুরুতর অভিযোগ ঘুরেফিরে আসছে— এই সহিংসতা ও সংস্কৃতি-বিরোধী তৎপরতা কোনও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর কাজ নয়; এর পিছনে রাজনৈতিক ইশারা, ক্ষমতার ছায়া এবং বিদেশি স্বার্থ কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও ইঙ্গিত নিয়ে জনপরিসরে নানা প্রশ্ন ও তীব্র বিতর্ক রয়েছে। এই প্রশ্ন ও অভিযোগগুলো রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়া জরুরি। তবে এটুকু স্পষ্ট— যদি কোনও রাজনৈতিক শক্তি উগ্রপন্থীদের ব্যবহার করে ক্ষমতা বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তা হলে তা শুধু রাজনীতির সঙ্কট নয়, রাষ্ট্রের অস্তিত্বের পক্ষেই আশঙ্কাজনক।

আর একটি আশঙ্কা হল বিদেশি, বিশেষত পশ্চিমি শক্তির প্রভাব। ‘গণতন্ত্র’ বা ‘স্থিতিশীলতা’র নামে যদি একটি দেশকে উগ্রপন্থী শক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তা হলে সেই দেশ কার্যত পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে রূপান্তরের যে ভয়, তা এখান থেকেই জন্ম নেয়।

এই প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল— কেন একটি বড় অংশ উগ্রপন্থী চিন্তার খপ্পরে পড়ছে, তা বোঝা। বেকারত্ব, শিক্ষার সঙ্কট, ইতিহাস বিকৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচারের অভাব— এই সবই উগ্রপন্থার হাতের তাস। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকল্পিত সংস্কৃতি-বিরোধী প্রচার। ‘ছায়ানট’-এর মতো সংগঠনগুলো এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ— এরা প্রশ্ন করতে শেখায়, ইতিহাসের সঙ্গে সংযোগ ঘটায়, মানবিকতার চর্চা করে।

‘ছায়ানট’-এর জন্মকথা আমাদের শেখায়— সংস্কৃতি মানে কেবল সঙ্গীতচর্চা নয়; এটি আত্মপরিচয়ের লড়াই। আজ যখন বাংলা সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তখন ‘ছায়ানট’-এর উপর আঘাত আসবেই। কারণ তারা জানে, ‘ছায়ানট’ বেঁচে থাকলে বাঙালিত্ব বেঁচে থাকবে।

উগ্রপন্থা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হল সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবিকতা। ভয় নয়, সাহস; ঘৃণা নয়, প্রশ্ন; বিভাজন নয়, বহুত্ব— এই মূল্যবোধই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারে। ‘ছায়ানট’ সেই মূল্যবোধের ধারক। তাই তাকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি সংগঠনকে রক্ষা করা নয়— এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বকে রক্ষা করার সংগ্রাম।

এই বাস্তবতায় একটি সত্য আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই— বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে। যে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী পরিকল্পিত ভাবে বাংলা সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তারা জানে, এই সংস্কৃতিই বাঙালির সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই তারা আঘাত করছে ভাষায়, গানে, উৎসবে, স্মৃতিস্তম্ভে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। আঘাত করছে সংখ্যালঘুদের উপর, নারী ও শিশুর নিরাপত্তায়, মুক্তচিন্তাশীল মানুষ ও সাংবাদিকদের কণ্ঠে ও কলমে। এটি কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার গল্প নয়— এ এক সুসংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতি-বিরোধী প্রকল্প।

এই অবস্থায় নীরব থাকা মানে ইতিহাসে অপরাধে শরিক হওয়া। আজ যদি আমরা চুপ থাকি, তবে আগামী প্রজন্ম একটি বিকৃত ইতিহাস, ভীত সমাজ এবং সন্ত্রাস-সর্বস্ব বাস্তবতা উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে। তাই এখনই সময়— সমগ্র বিশ্বের বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বাংলাদেশে, ভারতে, ইউরোপে, আমেরিকায়— যেখানেই বাঙালি আছে, সেখান থেকেই উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।

এই প্রতিবাদ কেবল আবেগের নয়, একে হতে হবে সচেতন ও ধারাবাহিক প্রতিরোধ। আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য নথিবদ্ধ করা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসভিত্তিক উদ্যোগ জোরদার করা—সব কিছু এক সঙ্গে করতে হবে। সমাজমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফোরাম পর্যন্ত বাঙালির কণ্ঠ পৌঁছতে হবে। কারণ সন্ত্রাসবাদী শক্তি একা নয়; তারা নীরবতা, বিভ্রান্তি ও বৈশ্বিক উদাসীনতা পুঁজি করেই শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশকে রক্ষা করা মানে কেবল একটি ভূখণ্ড রক্ষা করা নয়— এটি একটি সভ্যতা, একটি ভাষা, একটি মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করার লড়াই। যদি আজ বিশ্বব্যাপী বাঙালি সমাজ ঐক্যবদ্ধ না হয়, যদি আমরা ইতিহাস ও সংস্কৃতির পক্ষে দাঁড়িয়ে সুদৃঢ় প্রতিরোধ না গড়ে তুলি, তবে বাংলাদেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। তখন শুধু একটি দেশই হারিয়ে যাবে না— হারিয়ে যাবে বাঙালির আত্মার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এখনই সময়— ভয় নয়, ঐক্য বেছে নেওয়ার। নীরবতা নয়, প্রতিবাদ বেছে নেওয়ার। কারণ ইতিহাস এক দিন প্রশ্ন করবে: এই সঙ্কটের মুহূর্তে তুমি কোন পক্ষে ছিলে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bangladesh Chhayanaut

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy