E-Paper

চিড়

আগে এ-সব করত বাবা। কিন্তু বাবারা চিরকাল থাকে না। এক সময় এ-সব দায়দায়িত্ব ছেলের ঘাড়েই এসে পড়ে। শমিতা ছুটি নিতে পারবে না, সাফ জানিয়ে দিয়েছিল। ওর অফিসে নাকি এখন ভীষণ চাপ।

মোনালিসা চন্দ্র

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:১৯

ছবি: সুমন পাল।

বাড়িতে মিস্তিরি লাগার মতো ঝকমারি খুব কম আছে। তার উপর সে মিস্তিরি যদি হয় রাজমিস্তিরি। কিন্তু উপায় কী? মোবাইল বদলের মতো পাঁচ বছর অন্তর তো আর বাড়ি বদলানো যায় না, অথচ সমানে ব্যবহার হওয়া জিনিসের সার্ভিসিং লাগে। ফলে পাঁচ-ছ’ বছর অন্তর, বদলে না ফেললেও, বাড়ির গায়ে আদরযত্নের হাত একটু বোলাতেই হয়।

আগে এ-সব করত বাবা। কিন্তু বাবারা চিরকাল থাকে না। এক সময় এ-সব দায়দায়িত্ব ছেলের ঘাড়েই এসে পড়ে। শমিতা ছুটি নিতে পারবে না, সাফ জানিয়ে দিয়েছিল। ওর অফিসে নাকি এখন ভীষণ চাপ। এমনিতেও অফিসের ব্যাপারে ও সব সময়ই সুপার-সিরিয়াস। ছুটি নেয় না কিছুতেই। ওদিকে আমার কাজটা বাড়ি থেকেও খানিকটা ম্যানেজ করা যায়। অতএব মিস্তিরি সামলানোরদায় আমার।

সুবিধে এই, মিস্তিরা সব বাবার আমলের লোক, বিশ্বাসীও। শ্যেনচক্ষু মেলে সারা ক্ষণ খবরদারি করে বেড়াতে হয় না। শব্দ আর ধুলোর ব্যাপারটাকে ইগনোর করতে পারলে দিনগুলোকে ছুটির মেজাজেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। কয়েকটা সিনেমা আর ওয়েব সিরিজ়ও দেখা হয়ে গেল এই ফাঁকে।

খাটে শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে একটা ফোন সেরে নিচ্ছিলাম, তখনই চোখে পড়ল, উল্টো দিকের দেওয়ালে আঁকাবাঁকা লাইনটা। কাছে এসে নজর করে দেখি, অতি সূক্ষ্ম এক ফাটল। বেডরুমে অন্তত কোনও ঝামেলা নেই ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলাম। এটা আবার কোত্থেকে এল!

ডাকলাম হেডমিস্ত্রি শওকতকে। খানিক ক্ষণ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখে সে ভুরু কুঁচকে বলল, “ভাল ঠেকছে না দাদা।”

তার পর একখানা টুলে চড়ে হাতের কারনির বাঁটটা দিয়ে দেওয়াল ঠুকে ঠুকে বলে, “আওয়াজটা শুনছেন? ঢপঢপ করছে।”

শমিতার শৌখিন পুতুল সাজিয়ে রাখা শো-কেসটার পিছনে গিয়ে ঢুকেছে রেখাটা। শওকত বলে, “এটাকে সরাতে হবে। নইলে কতটা গেছে বুঝতে পারব না।”

শো-কেসটা শৌখিন পুতুল আর কিউরিয়ো আইটেমে ঠাসা। বহু খুঁজেপেতে নাকি কেনা সে-সব। কেউ যাতে হুটহাট হাত দিতে না পারে, তাই তালার ব্যবস্থাও করেছে শমিতা। ও-সবসুদ্ধ শো-কেসটা নড়াতে গেলে পুতুলগুলো এ-ওর ঘাড়ে পড়ে চুরমার হবে। কাজেই ওকে ঠেলাঠেলি চলবে না। শমিতার মতো কিউরিয়োর শখ আমার নেই ঠিকই, তাই বলে ক্যাজ়ুয়াল থেকে জিনিসগুলোর বারোটা বাজাব, এমন নির্বিকারও আমি নই। শমিতাকে ফোন লাগাই, শো-কেসের চাবি কোথায় জানার জন্য। ফোন বলে, ভয়েস মেসেজ ছেড়ে রাখো।

বুঝি, শমিতা মিটিঙে ফেঁসে আছে। অতএব ড্রয়ারগুলো হাতড়াতে থাকি, যদি পেয়ে যাই চাবিটা। পাইও। সুন্দর একটা রিঙে বাঁধা রয়েছে সেটা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রিংটাকেই দেখি কিছু ক্ষণ। নাহ্‌, শমিতার রুচি আছে। ‘আছে’ না বলে বলা ভাল, বদলাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে। আগে এত সূক্ষ্ম রুচি ওর ছিল কোথায়?

শো-কেস থেকে জিনিসগুলো সাবধানে বার করে একে একে শুইয়ে রাখি বিছানায়। ওরা শো-কেসটা টেনে আনে দেওয়াল থেকে। শওকত বলে, “ফাটল তো ‘এস্কার্টিং’ অবধি চলে গেছে, দাদা। ভাল করে প্লাস্টার ছাড়িয়ে রিপেয়ারকরতে হবে।”

বেডরুমটাও এ বার তছনছ হবে ভেবে মেজাজ খারাপ হয়। শমিতারও পিত্তি জ্বলে যাবে জানি। ক’টা পিচবোর্ডের কার্টন জোগাড় করে শো-পিসগুলো ভরতে থাকি তাতে। কাজটা যখন করতেই হবে, একটু না-হয় এগিয়ে রাখি! শমিতা খুশি হবে।

খুব যত্ন নিয়ে ভরছিলাম জিনিসগুলো। দেখছিলাম, বেশির ভাগ শো-পিসের তলাতেই সোনালি বর্ডার দেওয়া গোলাপি-রঙা স্টিকার মারা। তাতে ম্যাজেন্টা রঙের কালিতে কিছু কিছু লেখাও। লেখাগুলো আলাদা আলাদা, তবে প্রতিটির শুরুতে ইংরিজিতে লেখা ‘মা’, মানে ‘এম এ’। বাকিটা দুর্বোধ্য। ইহজন্মে শমিতার ভাগ্যে মা ডাক শোনার সুযোগ নেই, সেটা আমরা দু’জনেই জানি, এবং মেনে নিয়েছি। তা হলে এই মা-এর মানেটা কী? মগজে কে যেন হঠাৎ গুনগুন করে বলে ওঠে, ‘ওরে হতভাগা, এই মা-এর সঙ্গে মাতৃত্বের কোনওসম্পর্ক নেই।’

তা হলে কিসের সম্পর্ক আছে?

অস্বস্তির একটা কাঁটা সুট করে ঢুকে পড়ে মনে। খচখচ করে সে কাঁটা আঁচড়াতে থাকে মনের দেওয়ালে। ‘মা পিউস’, ‘মা শেরি’, ‘মা চ্যাটন’, ‘মা ল্যাপিন’, ‘মা পেটিট চাউ’ কথাগুলো কস্মিনকালে শুনিনি! কী ভাষা, কী উচ্চারণ, কিচ্ছু আন্দাজ নেই, তবু একটা আঁশটে গন্ধ যেন পেতে থাকি লেখাগুলো থেকে। অস্বস্তি বাড়ে। সঙ্গে বাড়ে জেদ। জানতে হবে। কে যেন আবার গুনগুনিয়ে বলে, ‘জানতে যাসনি বাছা। সব কিছু অত জানতে নেই। আদম আর ইভের গপ্পোটা ভুলে গেলি? বেশ তো ছিল তারা। জ্ঞানবৃক্ষের ফলটি খেয়ে কী লাভটা হল তাদের? তুইও জানার ইচ্ছে ত্যাগ কর।’

কিন্তু নিষেধাজ্ঞাদের কবে আর পাত্তা দিয়েছে মানুষ? কৌতূহল এমনিতেও অতি বিচ্ছিরি এক চুলকুনি, মানুষকে স্বস্তিতে টিকতে দেয় না। কৌতূহল মেটানোর জন্য আজকাল ‘কোথায় যাব কোথায় যাব’ করে ছুটেও মরতে হয় না। ছুটোছুটির কারণেই অনেক কৌতূহল এতকাল ধামাচাপা পড়ে থেকে যেত। কিন্তু এখন তো বিশ্বের জ্ঞানভান্ডার পকেটে নিয়ে ঘুরছি। তা হলে আর কৌতূহল চেপে বসে থাকা কেন? ফোনটা তুলে পটাপট ক’টা ছবি নিই গোলাপি স্টিকারগুলোর, তার পর সোজা এআই-কে শুধোই, এগুলোর মানে বলো।

অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এআই-এর জিনি স্ক্রিনে ফুটিয়ে তোলে উদ্দিষ্ট শব্দার্থগুলো। আর অমনি আদম আর ইভের যাবতীয় ভাঙচুর নেমে আসে আমার ভিতরে।

তবু তার পরেও, ফোনে ধরি তপনকে। পেশায় অ্যাকাউন্ট্যান্ট আমি, ডাবল চেকিং আমার রক্তে। তপন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ়-এর ডিপ্লোমাধারী, ফ্রান্সে ছিলও ক’বছর। তাকে শুধোই, “এই শব্দগুলোর মানে কী রে?”

তপন হেসে বলে, “এই উচ্চারণগুলো একটু অন্য রকম, তুই যেমন করলি তেমন মোটেই নয়। আর এদের আসল মানে হল পোকা, বেড়ালছানা, খরগোশ, ছোট্ট বাঁধাকপি ইত্যাদি। কিন্তু ফ্রেঞ্চরা আদর করে তাদের প্রেমিকাদের এই সব বলে ডাকে। ‘মা’ মানে এখানে জননী নয়, প্রিয় নারীকে ওরা মা বলে অ্যাড্রেস করে। কিন্তু বুড়ো বয়সে তুই কোন ফ্রেঞ্চ লেডিকে পটাতে যাচ্ছিস বাপ? দেখিস বাবা, শেষকালে প্রক্সি দিতে আমাকে নিয়ে টানাটানি করিস না যেন।”

মিস্তিরিরা চলে গেছে অনেক ক্ষণ। যাওয়ার আগে শওকত জানতে চাইছিল, কালই বেডরুমটা ধরবে কি না। কী যে বললাম ওকে, মনে পড়ছে না।

আমি শুধু ভাবছি, অমন মাখনমসৃণ দেওয়ালের তলায় সবটাই কি ঝুরঝুরে!

সূর্য ডুবছে। সাদা মেঘগুলোর গায়ে গোলাপি আভা, কিনারায় ডুবন্ত সূর্যরশ্মির সোনালি বর্ডার। সেই শোভার মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি আকাশ-জোড়া এক চিড় ধরা দেওয়াল। চিচিং ফাঁক-এর মতো কোনও শব্দ শোনার অপেক্ষায় যে দেওয়াল এখনও নিশ্চল। কেউ এক জন সে শব্দটা উচ্চারণ করলেই কি চিড়ের দু’পাশ থেকে ঘড়ঘড় শব্দে দেওয়াল সরে যেতে থাকবে পরস্পর থেকে দূরে, আরও দূরে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Bengali Story Bengali Literature Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy