E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_03-05-26

যুদ্ধবিরোধী আধুনিক রূপকথাদের প্রাণবন্ত করেছিলেন সেলুলয়েডে

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ থেকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হয়ে ‘আগন্তুক’— যুদ্ধের অসারতার সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন তাঁর নেতিবাচক প্রভাবের কথাও। সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ কিংবা ‘গণশত্রু’ দেখিয়েছিল স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার অচেনা এক বয়ান।

অতনু বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ ০৭:৫২
কালজয়ী: গান গেয়ে যুদ্ধ থামানোর অনন্য নজির ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’।

কালজয়ী: গান গেয়ে যুদ্ধ থামানোর অনন্য নজির ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’।

মহাভারত নিয়ে মুগ্ধতা ছিল সত্যজিৎ রায়ের। ১৯৫৭-৫৮ সালের দিকে মহাভারতের নিজস্ব চলচ্চিত্ররূপ নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন সত্যজিৎ। চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন ১৯৫৯-এর ফেব্রুয়ারি নাগাদ, যে সময় তিনি বানাচ্ছেন ‘অপুর সংসার’ কিংবা ‘দেবী’। তবে সম্পূর্ণ মহাভারতকে একটি চলচ্চিত্রের পরিধিতে সেলুলয়েডে বন্দি করা সম্ভব নয় বলেই মনে করেছিলেন তিনি। তাই চেয়েছিলেন তার কোনও একটা অংশের চলচ্চিত্রায়ন করতে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল, তিনি এই চলচ্চিত্রের কাহিনিকে সীমাবদ্ধ রাখবেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ১৮ দিনের ব্যাপ্তির মধ্যেই— যুদ্ধকে সাত ভাগে ভাগ করে। কাহিনি শুরু হত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গীতার বক্তব্যের মাধ্যমে অর্জুনকে প্রবোধ দেওয়ার দৃশ্য দিয়ে। এবং চলচ্চিত্রটির সম্ভাব্য সমাপ্তি ঘটত কুরুক্ষেত্রের মহাশ্মশানে নিদারুণ শোকে জর্জরিতা রানি গান্ধারীকে দেখানোর মধ্যে, যিনি মৃতদেহের স্তূপের মাঝে বিধবা পুত্রবধূদের সঙ্গে নিয়ে খুঁজে ফিরছেন তাঁর পুত্রদের মৃতদেহ। বিশ বছর পর অনেকটা একই ধরনের প্রয়াস চালাবেন আকিরা কুরোসাওয়া, তাঁর মহাকাব্যিক ‘জিদাইগেকি কাগেমুশা’ (১৯৮০) ছবিতে।

যা-ই হোক, মহাভারত নিয়ে পরিকল্পিত সেই ছবিতে ‘ম্যাকবেথ’-এর অভিনেতা এবং কুরোসাওয়ার প্রিয়পাত্র তোশিরো মিফুনে-কে দুর্যোধনের ভূমিকায় অভিনয় করানোর কথা ভেবেছিলেন সত্যজিৎ। অন্য দিকে আইজ়েনস্টাইনের প্রিয়পাত্র নিকোলাই চেরকাসভ-এর অভিনয় করার কথা ছিল ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকায়। মনে হতে পারে, অপুর মহাকাব্যিক অভিযাত্রা রূপায়ণের সময়কালেই যুদ্ধের এই ভয়াবহতার চলচ্চিত্ররূপের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে স্রষ্টার মননের এক অন্তর্নির্হিত দ্বন্দ্বের প্রকাশ। এর বিবিধ কারণ থাকা সম্ভব, যার কিছু হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে সেই সময়কার বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে।

কিন্তু ১৯৬২-র ভারত-চিন যুদ্ধ যেন এই চলচ্চিত্র প্রকল্পের অন্তর্নিহিত বার্তাগুলোকে অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও নগ্ন ভাবে উন্মোচিত করল। সত্যজিতের মহাভারত-সংক্রান্ত ছবি তৈরির পরিকল্পনা স্থগিত করার এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হওয়া সম্ভব। দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের হৃদয়বিদারক সংমিশ্রণ হয়তো সত্যজিৎকে প্রেরণা দেয় তাঁর নিজস্ব প্রতীকী শৈলীতে সমকালীন মানবিক পরিস্থিতি রূপায়ণের। পরবর্তী কালে রাজনৈতিক রূপকধর্মী চলচ্চিত্র— ‘টু’ (১৯৬৪), ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ (১৯৬৯) আর ‘হীরক রাজার দেশে’-তে (১৯৮০) আমরা দেখব সেটাই। তবে মহাভারত তো ঘোর রাজনৈতিক আখ্যান— মহাভারতের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে হয়তো সেটাই হত সমকালীন রাজনীতি নিয়ে সত্যজিতের রায়ের প্রথম প্রতীকী চলচ্চিত্র-ভাষ্য।

পরে সত্যজিৎ সিদ্ধান্ত নেন, মহাভারত-বিষয়ক তাঁর পরিকল্পিত চলচ্চিত্রটিকে তিনি কেবল পাশা খেলার ঘটনাবৃত্তেই সীমাবদ্ধ রাখবেন, হয়তো বা কথাকলির মতো কোনও ট্রাডিশনাল স্টাইলে। নানা কারণেই হয়তো সত্যজিতের মহাভারত করা হয়নি। একটা কারণ, তিনি নিজেই বলেছেন, চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত সময়ের চৌহদ্দিতে বিদেশি দর্শকদের কাছে চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক যথাযথ ভাবে তুলে ধরা কঠিন। আবার হয়তো বা ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ (১৯৭৭) তৈরির পর মহাভারতের পাশা খেলার রূপায়ণের পরিকল্পনাটিও কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

মহাভারতের মতো জটিল মহাকাব্য তো একটা প্রিজ়ম— জীবন সেখানে বিচ্ছুরিত হয় নানা রঙে, নানা ভঙ্গিতে, নানা দিশায়। রাজনীতি এর পরতে পরতে। এবং যুদ্ধ এর কাঠামোর নির্মাণে। রয়েছে যুদ্ধের পটভূমি নির্মাণ, তার প্রস্তুতি, হানাহানি কিংবা যুদ্ধোত্তর শ্মশানের শান্তিপর্ব। যদিও সে ‘শান্তি’ সম্ভবত ‘পিস’ নয়— তা হল ‘ট্রাঙ্কুয়ালিটি’। জীবনীকার অ্যান্ড্রু রবিনসন লিখছেন, সত্যজিৎ বলেছেন যে মহাভারতের সেই বিশাল ‘যুদ্ধ’ নিয়ে কাজ করার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। অনুমান করি, সেটা নির্ঘাত সিনেম্যাটিক কারণে। এমনিতে অবশ্য সত্যজিতের ছবিতে, বিশেষত তাঁর ফ্যান্টাসি-মিউজ়িক্যাল ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ফিল্মগুলোয়, মানবতা আর শান্তিকে গুরুত্ব দিয়ে, এবং সংঘাতের অর্থহীনতার উপর জোর দিয়ে প্রবাহিত হয় যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক জোরালো বার্তা।

যেমন, গুপী-বাঘাকে নিয়ে উপেন্দ্রকিশোর লিখেছিলেন খাঁটি রূপকথা। আর সত্যজিতের হাতে পড়ে ফ্যান্টাসি ছবি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ পরিণত হয় যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক জোরালো ও শৈল্পিক বার্তায়, যা তুলে ধরে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও অর্থহীনতাকে। এই চলচ্চিত্রের ‘রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে দ্বন্দ্বে অমঙ্গল/ তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল’ গানটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি প্রত্যক্ষ বিবৃতি, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

এই ছবিটিকে অবশ্যই বিশ্লেষণ করা যেতে পারে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল বিশ্ব জুড়ে আলোচনার প্রধান বিষয়, যার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে চিরচেনা সাম্রাজ্যবাদের এক নতুন প্রকাশরূপ। কিন্তু সেই সঙ্গে খাদ্য আন্দোলন নিয়ে আলোচনাও আসবে বইকি। স্বাধীনতার এক দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর, ভারতের সাধারণ মানুষ তীব্র খাদ্যসঙ্কটের মুখোমুখি হয়। এ রাজ্যের প্রেক্ষাপটেও খাদ্য আন্দোলন একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যা সম্ভবত সত্যজিৎকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে থাকবে। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিটির প্রাথমিক ধারণা এসেছিল খাদ্য আন্দোলনের প্রথম ঢেউ চলাকালীন। আসলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং পশ্চিমবঙ্গের খাদ্য আন্দোলন দুটোই শুরু হয় মোটামুটি একই সময়ে, ১৯৫৯ নাগাদ। বাঙালি মননে এই দুই ঘটনার প্রভাব তাই মিশ্র ও সম্মিলিত হতে বাধ্য। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিটি তাই সম্ভবত দু’টি ঘটনা দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে থাকবে। দুর্ভিক্ষ-বিষয়ক চলচ্চিত্র ‘অশনি সংকেত’ (১৯৭৩) নির্মাণের পরিকল্পনার পিছনেও খাদ্য আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করা স্বাভাবিক।

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ বিষয়টা অস্পষ্ট হলেও সত্যজিতের মনোজগতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রভাব কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-তে (১৯৭০)। সত্যজিৎ যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত করছেন, সেটা ছিল স্বপ্ন দেখার সময়। ইন্টারভিউ বোর্ডে সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞাসা করা হয়, গত দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কোনটি। সিদ্ধার্থের ভূমিকায় ধৃতিমানের উত্তর ছিল, “দি ওয়ার ইন ভিয়েতনাম, স্যর।” তাকে প্রশ্ন করা হয়: “আপনার কি মনে হয় না যে, মানুষের চাঁদে অবতরণ করাটা এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা?” কাঁধ ঝাঁকিয়ে সিদ্ধার্থ বলে, “আমার তো তা মনে হয় না।”

এ ভাবেই যুদ্ধের প্রশ্নে এক সুদৃঢ় অবস্থান নেন সত্যজিৎ। সোজাসুজি যুদ্ধ-বিরোধিতা নয়, বরং এক স্পর্ধিত অবজ্ঞার জয়গান গান তিনি। এবং এটাই হয়তো ছিল ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর মূল চেতনার নির্দেশক। মনে রাখতে হবে, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ মুক্তি পাওয়ার ঠিক সতেরো মাস পরেই মুক্তি পায় ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’।

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সিক্যুয়েল ‘হীরক রাজার দেশে’ যেমন, এক অত্যাচারী রাজার স্বৈরাচারের চিত্ররূপ। ছবিটি সর্বগ্রাসী শাসন, হিংস্র আগ্রাসন এবং ‘যুদ্ধবাজ’ মতাদর্শের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ, যা দমনমূলক ক্ষমতার ঊর্ধ্বে সমুন্নত রাখে শান্তি, সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে। জরুরি অবস্থার পরে এ যেন ভারতীয় অভিজ্ঞতার আলোকে ফ্যাসিবাদের বর্ণনা। পরে ‘গণশত্রু’-তে আমরা দেখব ফ্যাসিবাদের এক ভিন্ন প্রকাশভঙ্গি।

১৯৬৪ সালে নির্মিত হয় বারো মিনিটের ছবি ‘টু’। আমেরিকার টেলিভিশন সংস্থা ‘এসসো ওয়ার্ল্ড থিয়েটার’ একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবির ট্রিলজির অংশ হিসেবে সত্যজিৎকে একটি ইংরেজি চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুরোধ জানায়, যার পটভূমি হবে বাংলা। সত্যজিৎ বেছে নেন সংলাপহীনতাকে। ছবিটি সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং মানবসম্পর্কের এক গভীর বিশ্লেষণ। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত এবং বিশ্বব্যাপী ঠান্ডা যুদ্ধের বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রটি দেখায় এক বিত্তশালী শিশু এবং বস্তির শিশুর বৈপরীত্য। একে সুবিধাভোগ ও বঞ্চনা, আধিপত্য ও প্রতিরোধের এক প্রতীকী সংগ্রাম হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন পরিচালক। দেখিয়েছেন কী ভাবে খেলনা, বাদ্যযন্ত্র, এমনকি নীরবতাও কাজ করতে পারে শ্রেণি, ভোগবাদ এবং সাংস্কৃতিক দাবির সঙ্কেত হিসেবে।

‘টু’ ছবিতে ধনী পরিবারের ছেলেটি তার জানালার নীচে দেখে বস্তির ছেলেটিকে। প্রথম ছেলেটির কাছে রয়েছে সুন্দর সুন্দর খেলনা, দ্বিতীয় ছেলেটির নেই প্রায় কিছুই। তবুও প্রথম ছেলেটি বদ্ধপরিকর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে। যেমন, বস্তির ছেলেটি তার বাঁশি বাজাতে শুরু করলে ধনী ছেলেটি একটি কর্কশ শব্দের খেলনা-ট্রাম্পেট উঁচিয়ে ধরে সম্পূর্ণ ভাবে ডুবিয়ে দেয় বাঁশির সুরকে। যখন বস্তির ছেলেটি— ঠিক ‘অপু’র মতোই— একটি যোদ্ধার মুখোশ ও বর্শা হাতে তুলে নেয়, ধনী ছেলেটি একটি রিভলভার হাতে ‘কাউবয়’-এর বেশ ধরে দাঁড়ায়। বস্তির ছেলেটি একটি সাধারণ ঘুড়ি ওড়াতে থাকলে ধনী ছেলেটি এয়ার-রাইফেল দিয়ে গুলি করে ভূপাতিত করে ঘুড়িটিকে। অবশেষে, বস্তির ছেলেটি বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর প্রচেষ্টা ত্যাগ করে এবং ধনী ছেলেটি তৃপ্তমনে তার যান্ত্রিক খেলনা নিয়ে একাই খেলতে বসে। কিন্তু বস্তির ছেলেটির বাঁশির সুর ফের তার জানালার ভিতর দিয়ে ভেসে এসে তাকে অস্থির করে তোলে। শেষে তার খেলনা-রোবটগুলো ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়ে মেঝেতে।

ছবিটি তৈরির সময় মারি সিটন-কে সত্যজিৎ লিখছেন, “মাত্র দশ মিনিটের এই ছবিটি বেশ জোরালো এক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।” বিন্দুমাত্র কৃত্রিম প্রয়াস ছাড়াই, ছবিটি যুদ্ধ ও শান্তি সম্পর্কে এমন অনেক কথাই বলে, যা হয়তো দীর্ঘ রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেও বলা সম্ভব নয়। ওই যে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-তে সিদ্ধার্থ যেমন যুদ্ধের সময় ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষের দেখানো সাহসে বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

‘টু’ ছবিটি রূপকথার মতো। ছবিটির পুরো টাইটল— ‘টু: আ ফিল্ম ফেবল’। এই উপকথা কিংবা রূপকথার মোড়কে পুরে এক জোরালো যুদ্ধবিরোধী বার্তা দেওয়াটা সত্যজিতের কাজের বৈশিষ্ট্য, নিশ্চয়ই। আসলে যুদ্ধ তো কেবল বাইরে হয় না, যুদ্ধ আসে জীবনেও। এর পটভূমি বা নির্মাণের সঙ্গে নিশ্চয়ই জুড়ে থাকে অনেক ঘটনা, অনেক ওঠাপড়া, স্রষ্টার নিজের বেড়ে ওঠার, তার জীবনকালের দেশের এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়কালে তাঁর জন্ম। কলকাতার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছিল সত্যজিৎকে। এই যুদ্ধের সূত্রেই আমেরিকান সৈন্যদের মাধ্যমে তিনি পশ্চিমি চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হন প্রথম।

সত্যজিতের কর্মকাল হল বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। এই সময়কালে দুনিয়াতে কিংবা এই দেশেও ওলটপালট বড় কম ঘটেনি। দুনিয়া জুড়েই বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক ধারণার পুনর্ব্যাখ্যা হয় এ সময়ে। বদলে যায় নীতি আর আদর্শের, কিংবা তাদের প্রয়োগ আর প্রকাশভঙ্গির দীর্ঘায়ত রূপশৈলী। আর এই নতুন সংজ্ঞায়নের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক শিল্পীদের মধ্যেও আসে বড়সড় পরিবর্তন। সত্যজিতের ছবিতে তার রূপ ধরা পড়েছে স্পষ্ট।

শুধুমাত্র ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা খাদ্য আন্দোলনই নয়, রয়েছে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সম্মিলিত অভিঘাত। ১৯৬৭-৭৫ সালে মার্ক্সবাদ নতুন রূপ নিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র ‘টুনু’ কিংবা ‘ঘরে-বাইরে’-র ‘অমূল্য’র উপস্থাপনায় স্পষ্ট ভাবে তা প্রতিফলিত। আবার ফরাসি ‘নিউ ওয়েভ’ আন্দোলন ও ইটালিতে জন্ম নেওয়া ‘নিয়ো-রিয়ালিজ়ম’-এর প্রভাবে ভারতীয় সিনেমায় প্রচলিত আখ্যানশৈলীও বদলায়। গোদার কিংবা ভিত্তোরিয়ো দি সিকা-র প্রভাব সত্যজিতের উপর পড়বে না, সেটা তো হতেই পারে না।

যুদ্ধ আসে সামাজিক আন্দোলন আর বিপ্লবের মধ্যেও। কিংবা সেটাও তো যুদ্ধের এক রূপ। ১৯৬৮-এর মে মাসে ফ্রান্সে ঘটে গেল ব্যাপক বিক্ষোভ, ধর্মঘট এবং নাগরিক অস্থিরতা— যা আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামাজিক অভ্যুত্থানগুলির মধ্যে একটি। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত সেই অনন্য প্রতিবাদ আন্দোলন পরিচিত ‘মে ৬৮’ নামে। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক যোগ দেয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এর ফলে, ফ্রান্স এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে প্রায় সমস্ত প্রচলিত ধ্যানধারণা বিলুপ্ত হয়। এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব অতিক্রম করে দেশকালের গণ্ডি। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ‘মে ৬৮’-র পরবর্তী সময়ে সত্যজিতের ছবির তরুণ-তরুণীরা যেন আগের চলচ্চিত্রগুলোর চরিত্রদের তুলনায় মৌলিক ভাবে ভিন্ন। যেমন, ‘হীরক রাজার দেশে’-র উদয়ন পণ্ডিতের ছাত্ররা যেন অংশ নিচ্ছে ‘মে ৬৮’ আন্দোলনে। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র টুনু, ‘ঘরে-বাইরে’-র অমূল্য, কিংবা ‘গণশত্রু’-র রণেনও যেন উঠে এসেছে ‘মে ৬৮’-র যজ্ঞাগ্নি থেকে। সেই আগুনের পরশমণির ছোঁয়াটুকু হয়তো পায়নি ‘দেবী’-র উমাপদ। পেলে সে গল্পের পরিণতি অন্য রকম হতে পারত।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ও তার প্রেক্ষাপট সত্যজিতের প্রজন্মকে তাড়িয়ে ফিরবেই। এর প্রভাব দেখা যাবে সত্যজিতের গল্পেও। একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। ‘শঙ্কুর পরলোকচর্চা’ গল্পে দু’জন জার্মান বিজ্ঞানীর সঙ্গে একযোগে প্রোফেসর শঙ্কু তৈরি করেন ‘কম্পুডিয়াম’ নামক যন্ত্র, যার সাহায্যে আনা হয় হিটলারের আত্মাকেও। শঙ্কুর জার্মান বন্ধু ক্রোল হিটলারের আত্মাকে প্রশ্ন করেন, ইহুদিদের উপর এত নির্মম অত্যাচার করার জন্য তার কোনও অনুশোচনা আছে কি না। যন্ত্রটি থেকে উত্তর আসে— “নাইন, নাইন, নাইন” অর্থাৎ— “না, না, না”। সত্যজিৎ দেখাতে চেয়েছিলেন, ‘মৃত্যুর পরেও নিজের সম্পর্কে হিটলারের ধারণার কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ ‘স্বর্ণপর্ণী’-তেও নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের উপর অত্যাচারের কাহিনি। ‘শঙ্কু ও ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ গল্পে জার্মানিতে নব্য-হিটলারপন্থীদের আটকাতে তাদের নেতা হান্‌স রেডেল-এর মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেন ইহুদি অ্যারনসন-এর মগজ। রেডেল পরিণত হয় অন্য মানুষে, ভেঙে যায় তার দল। হিটলার, গোয়রিং, নাৎসি জার্মানি যে সত্যজিতের মননে গভীর ছাপ রেখেছিল, সে কথা বলাই বাহুল্য। ‘হীরক রাজার দেশে’-তে রাজার সর্বগ্রাসী শাসন ও স্বৈরতন্ত্র, যন্তর মন্তর ঘর, এ-সবের মধ্যে কোথাও বিশ শতকের দমনমূলক সব শাসনব্যবস্থার, বিশেষত নাৎসি জার্মানির খানিক ছায়া থাকাও তাই অসম্ভব নয়।

১৯৯১-তে জীবনের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’ যেন সত্যজিৎ-নির্মিত ‘সভ্যতার সঙ্কট’-এর নবতর সংস্করণ। ‘আগন্তুক’ মনোমোহন মিত্রকে ধৃতিমান-অভিনীত চরিত্রটির সামনে ঘোষণা করতে হয়, “সভ্য কে জানেন? সভ্য হচ্ছে সেই মানুষ যে আঙুলের একটু চাপে একটি বোতাম টিপে একটি ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে সমস্ত অধিবাসী সমেত একটি গোটা শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। আর সভ্য কারা জানেন? যারা অস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।” শেষ ছবিতেও সত্যজিৎ তাই ঘোর যুদ্ধবিরোধী। মনোমোহন যেন সত্যজিতের ‘অল্টার ইগো’। প্রকাশভঙ্গি অবশ্য বদলায়। রূপকথার আড়াল ছেড়ে তা এসে পড়ে বাস্তবের জমিতে। দু’দশক আগে যেমনটি এনেছিল সিদ্ধার্থ। তবে এ আর শুধুমাত্র অবজ্ঞা নয়।

সত্যজিৎ-উত্তর যুগেও দুনিয়া দেখেছে অনেক যুদ্ধ, অনেক ধ্বংস। অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ তো হয়েই চলে, সঙ্গে থাকে প্রতিবাদী জীবনের যুদ্ধও। মনোমোহন মিত্র আজও অবান্তর হয়ে উঠতে পারেননি। ‘টু’-এর দুই শিশুর আচরণ আজও প্রাসঙ্গিক। গুপীর গান ‘তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল’ আজও তোলে সমান অনুরণন। আর আমরা ভাবতে থাকি ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে গত এক দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে কোনটার উল্লেখ করবে আজকের সিদ্ধার্থ! কোভিড-অতিমারি, চ্যাটজিপিটি, না কি এ সবই ছাপিয়ে অন্য কিছু?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Goopy Gyne Bagha Byne Fascism Autocracy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy