E-Paper

আমার ভুবন

আমি শব্দ, গন্ধ আর স্পর্শের দুনিয়ার মানুষ। শীতের রোদ, মন্দিরের ধূপের গন্ধ, পথের উঁচু-নিচু আমাকে রাস্তা চিনিয়ে দেয়, বুঝিয়ে দেয় গন্তব্য। আমি এক জন ইতিহাস-শিক্ষিকা। শিক্ষা এবং শিক্ষাদান, দু’টি ক্ষেত্রেই আমার পড়াশোনার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মাধ্যম ব্রেল, যার মাধ্যমে আমি স্বাধীন ভাবে পড়াশোনা করতে পেরেছি। ব্রেল দৃষ্টিহীনদের নিজস্ব জগৎ। আজ বিশ্ব ব্রেল দিবস।

কুমকুম চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৯

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

শীতকালে রোদের আলাদা গন্ধ থাকে। ফুলের মিষ্টি গন্ধের মতো। সাইকেল রিকশায় রোদের ওই গন্ধ গায়ে মেখে স্কুলে চলেছি আমি।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঠিক মিনিট দশ পরে ধূপের গন্ধ পাই। বুঝতে পারি, স্কুল যাওয়ার পথে প্রথম মন্দিরটা পেরোলাম। ওই মন্দিরের চাতাল থেকেই আসছে ধুপের গন্ধ। রিকশাচালককে বলি, “একটু আস্তে চালাও ভাই। আমার তাড়া নেই। মন্দিরে কি আজ বেশি ভিড়?”

রিকশাচালক ভাবেন, এক জন দৃষ্টিহীন মানুষ কী ভাবে বুঝতে পারল মন্দিরের পাশ দিয়ে যাচ্ছে? আজ মন্দিরে ভিড়? জিজ্ঞেসই করে ফেলেন, “কী করে বুঝলেন আজ মন্দিরে বেশি ভিড়?”

হাসলাম। দৃষ্টিহীন আমি শব্দ গন্ধ আর স্পর্শ দিয়েই তো পৃথিবীকে দেখি। এই পৃথিবীর এক অন্য রকম আলো আমায় পথ দেখায় প্রতিনিয়ত। রিকশাচালককে বলি, “আজ ধূপের গন্ধ অনেক বেশি চড়া। অনেক মানুষ মনে হল ধূপ জ্বালিয়েছেন মন্দিরে। তার মানে মন্দিরে ভিড় বেশি।”

স্কুলে যাওয়ার পথে প্রথম ধূপের গন্ধ পাওয়া মানে স্কুল এখান থেকে আর মিনিট পাঁচেকের পথ। ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে আবার ধূপের গন্ধ। অর্থাৎ স্কুলের গেটের একদম সামনে চলে এসেছি। গেটের কাছে আর একটা ছোট কালীমন্দির। ওই মন্দিরের চাতালেও ধূপ জ্বলে। ওই ধূপের গন্ধের পরে একটা ঢালু রাস্তায় রিকশা নেমে যাওয়ার অনুভূতি। অর্থাৎ স্কুলের গেট পেরোলাম। কারণ স্কুলের গেটটা একটা ঢালু রাস্তায়। ওই ঢালু রাস্তা পেরিয়েই স্কুলের মাঠে চলে আসে রিকশা। আর শুনতে পাই স্কুলের ছাত্রীদের কলরব।

মেয়েরা বলছে, “দিদি চলে এসেছে।”

ওরা আমাকে হাত ধরে রিকশা থেকে নামায়। এক-এক দিন এক-এক ছাত্রীর হাত। ওদের হাতের স্পর্শ আমার এতটাই চেনা যে, ওরা যদি কথা না-ও বলে, শুধু হাতের তালুর স্পর্শে বুঝে যাব কে আমার হাত ধরেছে। জিনিয়া, অনিন্দিতা না অর্পিতা।

তবে ওরা হাত ধরে নিয়ে না গেলেও আমি ঠিক ঠিক পৌঁছে যেতে পারব টিচার্স রুমে। প্রায় দশ বছর হয়ে গেল শখের বাজারের বৈদ্যপাড়া গার্লস স্কুলে পড়াচ্ছি। স্কুলটা নিজের বাড়ির মতোই চেনা। ঠিক কী ভাবে কত পা হাঁটলে পৌঁছে যাব টিচার্স রুমে, সেটা আমার মুখস্থ। তবু আমার ছাত্রীরা আমাকে একা যেতে দেবে না। আমার হাত ধরে পৌঁছে দেবে টিচার্স রুম পর্যন্ত।

স্কুলে প্রার্থনার পরে টিচার্স রুমে এসে বসলাম। আজ আমার প্রথম পিরিয়ডে ক্লাস নেই। দ্বিতীয় পিরিয়ডে ইতিহাসের ক্লাস। ব্যাগ থেকে নবম শ্রেণির ব্রেলে লেখা ইতিহাসের বইটা বার করে নিলাম। আজ ক্লাসে কী পড়াব একটু দেখে নিতে হবে। তা হলে ভাল পড়াতে পারব।

বইটা খুলতেই বেজে উঠল মোবাইল ফোনটা। ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে ধরতেই অন্যপ্রান্ত থেকে কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, “দিদিমণি চিনতে পারছেন? আমি সুন্দরবনের বাসন্তীর রানীগড় জ্যোতিষপুর হাই স্কুলের আপনার ছাত্রী মালতী বলছি।”

মনটা খুশিতে ভরে গেল। বললাম, “কত বছর পরে তুই ফোন করলি। ভুলেই গেছিস আমাকে। এখন কী করছিস তুই?...”

জয়ী: নিজের বাড়িতে কুমকুম চক্রবর্তী।

জয়ী: নিজের বাড়িতে কুমকুম চক্রবর্তী।

মিনিট দশেক পর ফোন রেখে দিতেই মনে এল ২০০৬ সালের কথা। এসএসসি-তে বসেছিলাম মায়ের উৎসাহে। পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্কুলে চাকরি পেয়েছিলাম রানীগড় জ্যোতিষপুর হাই স্কুলেই। কলকাতা থেকে কত দূরে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সুন্দরবনের কাছে বাসন্তী থানা এলাকার একটা প্রত্যন্ত গ্রাম রানীগড়। সেখানে রানীগড় জ্যোতিষপুর হাই স্কুল।

ছোট থেকে কলকাতার মেয়ে। বেহালার ম্যান্টন এলাকায় বাড়ি। এসএসসি-তে স্কুল পেলাম বাসন্তীতে। বাড়িতে কেউ কেউ বলেছিল, দৃষ্টিহীন মেয়ে অত দূরে কী ভাবে স্কুলে শিক্ষকতা করতে যাবে? কাজটা ছেড়ে দিতে বলেছিল। অনেকে প্রশ্ন করল, এক জন দৃষ্টিহীনকে কেন এত দূরের স্কুল দেওয়া হল! যারা নিয়োগপত্র দিল, তাদের কি কোনও মানবিকতা নেই! কেউ কেউ বলেছিল, আমি দৃষ্টিহীন, এই কারণ দেখিয়ে বাড়ির কাছেকোনও স্কুলে নিয়োগ দেওয়ার জন্য এসএসসি-কে অনুরোধ করতে।

আমি বলেছিলাম, “না, আমি ওই সুন্দরবনের গ্রামের স্কুলেই পড়াতে যাব। এক জন দৃষ্টিমান মানুষ কি বাসন্তীতে স্কুলে চাকরি পেলে ছেড়ে দিত? তা হলে আমি কেন ছাড়ব?”

২০০৬-এ এসএসসি পেয়েছিলাম। স্কুলে যোগ দিতে দিতে ২০০৭। প্রথমে আমার দাদা গিয়ে স্কুলটা দেখে এসেছিল। তার পর বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে মায়ের সঙ্গে স্কুলের উদ্দেশে। সঙ্গে ছিল আমার এক দিদি। আর নিজের জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া সঙ্গে ছিল ব্রেলের বই ও ব্রেলে লেখার জন্য বিশেষ ধরনের ব্রেল স্লেট, আর আমাদের বিশেষ ধরনের পেন, যাকে বলাহয় স্টাইলাস।

স্কুলে যাওয়ার জন্য সে এক জার্নি! প্রথমে বেহালা থেকে বাসে করে যাদবপুর। যাদবপুর থেকে ট্রেনে ক্যানিং। তখনও মাতলা নদী পেরোতে সেতু হয়নি। তাই নৌকো করে মাতলা নদী পেরিয়ে ওপারে গিয়ে ভ্যানরিকশা করে সোনাখালি। সেখান থেকে আবার নৌকো করে বাসন্তী। বাসন্তী থেকে আবার ভ্যানরিকশা করে রানীগড়। যেখানে আমার থাকার জায়গা তার থেকে মিনিট দশেক দূরে আমার স্কুল রানীগড় জ্যোতিষপুর হাইস্কুল।

আমি ওখানে পৌঁছতে অনেকেই ভেবেছিলেন, কলকাতা থেকে এত দূরে সুন্দরবন এলাকা! আমি এক একাকী মহিলা, তাও আবার দৃষ্টিহীন, আমি কি পারব এখানে শিক্ষকতা করতে!

স্বীকার করি, প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে আমিও একটু ঘাবড়ে গেছিলাম। সব তো অচেনা। আমার দাদা মিহির চক্রবর্তী আমাকে সাহস জুগিয়েছিল। বলেছিল, “তুই পারবি।”

এখন মনে হয়, দাদা সাহস জুগিয়েছিল বলেই থেকে গেলাম ওখানে। সঙ্গে মা ছায়া চক্রবর্তী তো ছিলই। ওখানে একটা ভাড়াবাড়িতে থাকতে শুরু করলাম। পরে ওখানে এসে থাকতে শুরু করেন আমার এক দিদি, রীনা চৌধুরী।

ধীরে ধীরে রানীগড়ের গন্ধ, শব্দ আর স্পর্শ আমার পরিচিত হয়ে উঠতে থাকল।

স্কুল যাওয়ার রাস্তা চিনে গেলাম সহজে। বেহালায় এখন যে স্কুলে শিক্ষকতা করি, সেই স্কুলে পৌঁছলাম কি না যেমন বুঝতে পারি স্কুলের কাছে মন্দিরের ধূপের গন্ধে, সে রকম রানীগড়ে স্কুলের কাছে পৌঁছলাম কি না, বুঝতে পারতাম স্কুলের কাছে একটা পোলট্রি খামারের মুরগির ডাকে। খামারের একটা নিজস্ব গন্ধও ছিল।

দিদি আমাকে হাত ধরে বাড়ি থেকে স্কুলে নিয়ে যেত। স্কুলে যাওয়ার পথ ছিল খেতজমির মধ্যে দিয়ে আলপথ। দিদির হাত ধরে সেই আলপথ দিয়ে যাওার সময় খেতজমির মাটির আলাদা গন্ধ পেতাম। গ্রাম থেকে একটু দূরে নদী। স্কুলে যাওয়ার সময় ফাঁকা মাঠে অনেক সময় হাওয়া দিত খুব। হাওয়ায় ভেসে আসত নদীর গন্ধ। শেওলা, জলের পানা, মাটি, মাছ মিলিয়ে জলের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে।

আমি ইতিহাসের শিক্ষিকা। কিন্তু এক দৃষ্টিহীন শিক্ষিকাকে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা-পড়ুয়ারা কেমন ভাবে নেবে? আমি কি পারব পড়াতে? আমাকে কি মানবে আমার দৃষ্টিমান ছাত্রছাত্রীরা? প্রথম দিন স্কুল যাওয়ার আগে কেমন একটা ভয় আর কুণ্ঠা আমাকে গ্রাস করেছিল। আমার মা আমাকে সব সময় সাহস জোগাত। বলত, “তুই পারবি।”

স্কুল যাওয়ার আগে মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “তুই দৃষ্টিহীন। তোর চোখে আলো নেই। কিন্তু শিক্ষার আলো ছোট ছোট পড়ুয়াদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ভার যখন তোর ওপর, তোকে পারতেই হবে।”

ভয়ে ভয়ে স্কুলে গেলাম। আর স্কুলে প্রথম দিনই আমার সব কুণ্ঠা, ভয়, সঙ্কোচ ভেঙে দিলেন অন্য শিক্ষকরা, সঙ্গে পড়ুয়ারাও। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত মণ্ডল আমায় প্রথম থেকেসাহস জুগিয়েছেন।

স্কুলে প্রথম দিনের কথা কি ভুলতে পারি? পঞ্চম শ্রেণিতে ইতিহাস পড়াতে গেলাম। সঙ্গে ব্রেলে লেখা ইতিহাসের পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্য বই।

শুনলাম ক্লাসে ৬০ জন পড়ুয়া। এক জন পড়ুয়ার হাতে যে পাঠ্যবই রয়েছে, সেই বইটাই আছে আমার কাছে। ব্রেলে লেখা বইটাই আমার ভরসা। সেই ব্রেল বই দিয়ে আমি পড়াতে শুরু করলাম। পড়া বোঝালাম। প্রশ্ন করলাম। ওরা উত্তর দিচ্ছিল। বুঝলাম, ওরা পড়াটা শুনেছে। ওদের হোমটাস্কও দিলাম। আমরা তো বোর্ডে লিখতে পারি না। এক জন পড়ুয়াকেই বোর্ডে কিছু লিখতে দিয়ে বললাম, “কী লিখলে মুখে বলো।”

যদি ভুল বলে তা হলে সেটা শুধরে দিতাম।

আমার সাবলীল পড়ানো দেখে কিছু পড়ুয়া খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল। তখন ওদের বোঝালাম, “তোমরা যেটা চোখ দিয়ে দেখছ, আমি সেটা স্পর্শ করে বুঝছি। তোমাদের চোখে যেমন অক্ষরের ছবি ফুটে ওঠে, ভেসে ওঠে; আমরা যখন ব্রেলের বইয়ে বিভিন্ন অক্ষর আঙুল দিয়ে স্পর্শ করি, তখন অক্ষরগুলো ছবির মতো ভেসে ওঠে। তোমরা চোখ দিয়ে যেটা দেখো, আমরা সেটাই স্পর্শ করে দেখি।”

কিন্তু ক্লাসে তো শুধু পড়া নয়, অনেক বাচ্চা তো দুষ্টুমিও করে। তাদের কী ভাবে সামলাব? ভেবে একটা উপায় বার করেছিলাম। ক্লাসের পড়ুয়াদের মধ্যেই এক জনকে দায়িত্ব দিলাম। ওকে বললাম, “যারা গন্ডগোল করবে তাদের নাম লিখে আমাকে দিবি। এই দায়িত্ব তোর।”

প্রথম দিন কেউ গন্ডগোল করেনি। কিন্তু পরে কেউ গন্ডগোল করলে ক্লাসেরই কোনও পড়ুয়া তাদের নাম লিখে আমাকে বলত। আমি ওদের হয়তো বললাম, “যারা দুষ্টুমি করেছ, তারা ক্লাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকো।”

কেউ না দাঁড়িয়ে বসে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে অন্য পড়ুয়ারাই বলে দেয়, “দিদিমণি, এক জন কিন্তু বসে পড়েছে।” কেন জানি না ওই প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলের পড়ুয়া থেকে শিক্ষকরা শুরুর দিন থেকেই আমাকে আপন করে নিয়েছিল।

মনে আছে, প্রথম দিন বাড়ি ফিরে মাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলাম। বলেছিলাম, “মা, আমি পেরেছি। প্রথম দিন স্কুলে আমাকে সবাইখুব ভালবেসেছে।”

মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, “দেখলি তো, আমি বলেছিলাম তুই পারবি। তোর স্বপ্ন আজকে সফল হল।”

এই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নটা দেখতে শুরু করি সেই মাধ্যমিক পাশ করার পর থেকেই। সেটা ১৯৯১ সাল। আমি মাধ্যমিক দিয়েছি। সেই সময় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিছু বয়স্ক দৃষ্টিহীনকে ব্রেলের মাধ্যমে পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে। আমি তখন ব্রেলের মাধ্যমে খুব ভাল ভাবে পড়তে, লিখতে পারি। ব্রেলের স্লেট বা আই পি ফ্রেমে (ইন্টারপয়েন্ট ফ্রেম) ছ’টা বিন্দুর মাধ্যমে ৬৩ রকমের ফিগার হয়। এই ছ’টা বিন্দুর মাধ্যমে লেখা হয়। সপ্তাহে এক দিন দশ থেকে বারো জন বয়স্ক দৃষ্টিহীনকে ব্রেল শেখাতে যেতাম। তখনই আমার মনে হল, আমাকে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়, তা হলে তো শিক্ষকতা করতে পারি। তখন থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করি। বিএড করেছি স্নাতক হওয়ার পরে। আমি বিবেকানন্দ উইমেন’স কলেজ থেকে স্নাতক। বিএড করেছি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ব্লাইন্ড বয়েজ় অ্যাকাডেমি থেকে।

গ্রামের স্কুলে বাড়ি ফেরার পরে কিছু করার থাকত না। আমি তখন পড়ুয়াদের জন্য ব্রেলের মাধ্যমে নোটস তৈরি শুরু করি। তখন ধ্যানজ্ঞান ছিল শুধুই গ্রামের ছেলেদের পড়ানো। কত গরিব ঘরের ছেলেমেয়ে ছিল! পড়ায় ওদের খুব আগ্রহ। ওরা পড়াশোনা করে সুন্দরবন ছেড়ে কলকাতার কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ওদের বলি, স্বপ্ন সফল করতে গেলে ভাল রেজ়াল্ট করতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি ওদের প্রোজেক্ট পেপারও তৈরি করতে বললাম, যেটা আমি স্পর্শ করে বুঝতে পারি। যেমন ওদের প্রোজেক্টে ম্যাপ আঁকতে বললে ওদের বলতাম, ভারতের ম্যাপের বর্ডারলাইন সুতো দিয়ে বানাতে। সুতো স্পর্শ করে বুঝতে পারতাম ওরা ভারতের ম্যাপটা ঠিকমতো এঁকেছে কি না। হয়তো বললাম, কোনও নদীর গতিপথ উল দিয়ে তৈরি করতে। উল স্পর্শ করে বুঝতে পারতাম, নদীর গতিপথ ঠিকমতো করতে পেরেছে কি না।

স্কুলের পড়ুয়ারা আমার এতটাই আপন হয়ে গিয়েছিল যে, ক্লাসের ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়ুয়ারা চলে আসত টিচার্স রুমে— কে আগে দিদিমণিকে হাত ধরে আমাকে ক্লাসে নিয়ে যাবে। আমি হয়তো একা একাই যেতে পারতাম ক্লাসে। কিন্তু ওরা আমাকে ক্লাসে একা যেতে দিত না। হাত ধরে নিয়ে যেত ক্লাসে। সহ-শিক্ষকরাও আমাকে কখনও একা ছেড়ে দেননি।

ওখানে ২০০৭ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছিলাম। এর মধ্যে আমার বিয়ে হয়ে গেল। বাসন্তীর ওই স্কুলে এত ভালবাসায় আবদ্ধ হয়ে গিয়েও কলকাতায় ফেরার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। ২০১৬ সালে বদলি নিয়ে আমার শীলপাড়ার বাড়ির কাছে শখের বাজার এলাকার বৈদ্যপাড়া গার্লস স্কুলে যোগ দিলাম। সেই ২০১৬ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত এই স্কুলেই আছি। এখানেও দশ বছর হয়ে গেল।

আজকে বৈদ্যপাড়ার স্কুলে বসে বাসন্তীর ওই স্কুলের এক পড়ুয়ার ফোন আসতে সব কথা মনে পড়ে গেল। সেই ছোট ছোট পড়ুয়াদের উষ্ণ, আন্তরিক স্পর্শ আজও ভুলতে পারি না। খেতের মধ্য দিয়ে স্কুলে যাওয়া। গ্রামের মাটির গন্ধ। বর্ষাকালে নদী ফুলে ফেঁপে উঠলে তার রূপ চোখে দেখতে পেতাম না ঠিকই, কিন্তু নদীর বড় বড় ঢেউয়ে নৌকো যখন খুব দুলে উঠত, অনুভব করতে পারতাম আপাত-শান্ত নদী কত ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে।

মনে আছে আমি যখন ওখানে, আয়লা এল। ২০০৯ সাল। সব তছনছ হয়ে গেল আয়লাতে।

যতই দুর্যোগ হোক না কেন, গ্রামের ওই স্কুলে কোনও দিন নিজের নিরাপত্তার অভাব বোধ করিনি। শুধু একটা ঘটনা আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনাটা আয়লার পরেই ঘটেছিল। আয়লার পরে বেশ কিছু সংস্থা ত্রাণ দিতে এসেছিল আমাদের স্কুলে। এক দিন ত্রাণ সংস্থার দু’জন লোক আমার ঘরে ঢুকে অসভ্যতার চেষ্টা করে। আমি চিৎকার করে উঠতেই আশপাশের লোকেরা চলে আসে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্রাম থেকে বার করে দেওয়া হয়। গ্রামের লোকেরা আমাকে এতটাই ভালবাসত যে, ওই সংস্থাকে আর গ্রামে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি।

সুন্দরবনের ওই গ্রামের স্কুল থেকে চলে এসেছি প্রায় দশ বছর হয়ে গেল। বৈদ্যপাড়া গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা দেবযানী ঘোষ আমাকে বলে দিয়েছেন, শুধু ক্লাসে পড়ানো নয়, স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও আমাকে থাকতে হবে। আমার মিউজ়িকে মাস্টার্স করা আছে। প্রধান শিক্ষিকার নির্দেশে স্কুলের যে কোনও অনুষ্ঠানে গান আমাকে গাইতেই হয়। স্বাধীনতা দিবসে পতাকা উত্তোলনের সময় আমাকে পতাকার দড়ি স্পর্শ করে থাকতে হয়। প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে সঙ্গে সহ-শিক্ষিকারাও আমাকে এতটাই ভালবাসেন যে, তাঁরা বলে দিয়েছেন, আমাকে বাদ দিয়ে স্কুলে কোনও অনুষ্ঠানই হবে না।

দেখতে দেখতে স্কুলে পড়ানোর প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল। এই যে স্কুলে এত ছাত্রছাত্রীর ভালবাসা পেয়েছি, সেই ভালবাসা কিন্তু দৃষ্টিহীন বলে করুণার ভালবাসা নয়। আমাকে আমার ছাত্রছাত্রীরা বলেছে, “দিদিমণি, আপনার পড়ানো আমাদের খুব ভাল লাগে। আপনি যখন ইতিহাসের কোনও অধ্যায় বোঝান, তখন মনে হয় চোখের সামনে ঘটনাটা দেখতে পাচ্ছি। একদম গল্পের মতো মনে হয়।”

পৃথিবীতে আমি আলো দেখতে পাইনি, কিন্তু শিক্ষার আলো এই ভাবে ছোট ছোট পড়ুয়াদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াটাই আমার গত কুড়ি বছরের সাফল্য। এটা এসেছে আমি ব্রেলের মাধ্যমে খুব ভাল করে পড়াশোনা শিখতে পেরেছি বলে। এখন দৃষ্টিহীনদের পড়াশোনার জন্য অনেক আধুনিক সরঞ্জাম চলে এসেছে। অডিয়ো-বুক থেকে শুরু করে অনেক কিছু। কিন্তু আমার কাছে ব্রেল পড়াশোনার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মাধ্যম। এক জন দৃষ্টিহীন ব্রেলের মাধ্যমে স্বাধীন ভাবে পড়াশোনা করতে পারে। অডিয়ো-বুক বা অন্যান্য যন্ত্রের মাধ্যমে পড়াশোনা করতে গেলে অনেক সময় অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ব্রেল হল দৃষ্টিহীনদের নিজস্ব জগৎ। এটা তাকে শিখতেই হবে। তবে উচ্চশিক্ষার ব্রেলের উপর আরও বেশি বই লেখা হওয়া দরকার।

আজ চারটে ক্লাস করতে হল। বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে গেল। স্কুল ছুটির ঘণ্টা বেজে গেলে কয়েকটি মেয়ে আমার কাছে চলে আসে। হাত ধরে আমাকে নিয়ে যায় স্কুলের বাইরে রিকশার কাছে।

রিকশায় যেতে যেতে বাড়ি ফেরার সময় ঠিক বুঝে যাই, কখন বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি। বাড়ির কাছে একটা রোল-চাউমিনের দোকান আছে। বিকেলে রোল-চাউমিন রান্নার একটা গন্ধ পাই। বাড়ি ফিরলে আমার জন্য সন্ধ্যার জলখাবার আমার দিদি রীনাই বানিয়ে দেয়। রীনা তো আমার সঙ্গে রয়েছে আমার বিয়ের পরে সেই বাসন্তীর স্কুলে পড়ানোর সময় থেকে। বাড়ির সব বিষয়ে সাহায্য করে। আর আমাদের পাশে আছেন আমার এক দাদা, মৃগাঙ্ক হালদার। এই দু’জনকে আমাদের পরিবারের সিম কার্ড বলা যায়। পারিবারিক যে কোনও কাজে ওঁরা সব সময় পাশে থাকেন। আমার স্বামী রাজা ফয়েজ আলমও দৃষ্টিহীন। রাজা বড়িশা হাই স্কুলের শিক্ষক। শুধু স্কুলে পড়ানোই নয়, ও বড়িশার একটি পেশাদার নাটকের দলের সঙ্গেও যুক্ত। আমাদের বিয়ে হয়েছে ২০০৯ সালে। কখনও কখনও আমার স্বামীও আমার জন্য রান্না করে দেয়। ও আমার দিদির সাহায্য নিয়ে খুব ভাল বিরিয়ানি রান্না করতে পারে। আর বিরিয়ানি আমার খুব প্রিয়। আমি যে-হেতু ছোট থেকে পড়াশোনা নিয়ে থেকেছি, তাই রান্না খুব ভাল পারি না। আমার ছেলে রাজজ্যোতি আলম চক্রবর্তী নবম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলের জন্য যখন দিদি কিছু রান্না করে, তখন সাহায্য করি।

এখন আমি দিদির কাছে মাছভাজা কী করে করতে হয়, সেটা শিখছি। মাছ ভাজার সময় মাছটা কতটা ভাজা হল, যেন পুড়ে না যায় সেটা দেখতে, কিংবা তেলে মাছটা ভাজতে ভাজতে কখন মাছটা উল্টে দিতে হবে, সেটা আন্দাজ করে নিতে পারলেই মাছ ভাজাটা শিখে যাব। মাছভাজার গন্ধ বলে দেবে মাছটা ঠিকমতো ভাজা হল, নাকি কাঁচা থেকে গেল, নাকি পুড়ে গেল। এত কিছু যখন শিখে ফেলেছি, তখন মাছ ভাজাটাও শিখে যাব।

পৃথিবীর আলো আমি দেখতে পাইনি। তাতে কি মনে খেদ নেই? নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু গন্ধ, স্পর্শ আর শব্দের যে একটা আলাদা জগৎ আছে, তা আমাদের থেকে কে-ই বা ভাল বোঝে। আর দৃষ্টিমান মানুষরাও তো আমাদের বড় ভরসা। আমার ছেলে রাজজ্যোতির চোখ দিয়ে এখন আমি কত কিছু দেখি! ও বলেছে, বড় হয়ে আমাকে পাহাড়ে নতুন নতুন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে। সমুদ্রে নিয়ে যাবে। সেখানে নতুন নতুন গন্ধ, স্পর্শ আর শব্দের অনুভূতি পাব। ওর চোখ দিয়ে সব কিছু দেখব। আমি বলেছি, ও যেন আমাকে আর এক বার সুন্দরবনের বাসন্তীতে আমার পুরনো স্কুলেও নিয়ে যায়। সেই মাতলা নদীর জলের শব্দ আর এক বার শুনতে চাই। শুনতে চাই আমার স্কুলের ছোট ছোট পড়ুয়ার কোলাহল। আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন।

অনুলিখন: আর্যভট্ট খান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Braille

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy