শিশু যখন জন্মায়, তখন আপাত ভাবে মনে হয়, তার চেয়ে অসহায় কেউ নেই। সে নিজের প্রাথমিক চাহিদা পর্যন্ত পূরণ করতে পারে না। কিন্তু তাকে নিষ্ক্রিয় মনে করা ঠিক হবে না। কারণ, জন্মের মুহূর্ত থেকেই শিশু দেখতে পায়, শুনতে পায়, আশপাশের মানুষজনকে সাড়া দেয়। একই সঙ্গে এই সচেতনতা এবং নির্ভরশীলতা প্রাণীজগতে বিরল।
বিজ্ঞানীরা এখন এই দুই পরস্পরবিরোধী বিষয় নিয়েই গবেষণা শুরু করেছেন। তাঁরা মনে করেন, এই অসহায়তা আসলে সমস্যা নয়। বরং তার বেঁচে থাকার পথ। তাকে বাকি মানুষজনের সঙ্গে সংযোগ, সহযোগিতা গড়তে সাহায্য করে এই অসহায়তা। শিশুকে শিখতে সাহায্য করে, মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। মোট কথা, বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই অসহায়তাই তাকে অনেক বেশি সামাজিক করে তোলে। বিশাল এক প্রক্রিয়ার ছোট একটা অংশ হল সদ্যোজাতের অসহায়তা।
স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে কোনও কোনও প্রাণী আগে চলাফেরা করতে শুরু করে, কেউ দেরিতে। মানব শিশু দীর্ঘ দিন পরের উপর নির্ভরশীল থাকে, চলাফেরা করতে পারে না। কিন্তু তার বোধ, জ্ঞান আসে অনেক আগে। ওটাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট হ্যামন্ড জানান, মানব শিশু স্বাধীন ভাবে চলাফেরার আগে বাকি দুনিয়ার সঙ্গে একটা সংযোগ গড়ে ফেলে। এই যে তারা দেরিতে হাঁটাচলা শেখে, এর ফলেই পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে তার একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। শিশু কী ভাবে পারিপার্শ্বিককে পর্যবেক্ষণ করবে, কী ভাবে সাড়া দেবে, তা গঠন করে দেয় তার ওই অসহায়তা। কারণ, তাকে নিজের প্রাথমিক চাহিদার জন্য অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়।
বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী যখন জন্মায়, তখন তার চোখ, কান বন্ধ থাকে। আবার ঘোড়া জন্মানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দাঁড়াতে শিখে যায়। মানবশিশু দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে। জন্মের সময় তার দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি থাকে। কিন্তু তার চলাফেরা শিখতে অনেক বেশি সময় লাগে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের যা আয়তন থাকে, তার ২৫ শতাংশ থাকে সদ্যোজাতের। সেই অবস্থাতেও পূর্ণবয়স্ক ইঁদুরের থেকে তার মস্তিষ্কের আয়তন থাকে ১৫ শতাংশ বড়। কিন্তু যে সব স্তন্যপায়ী জন্মেই হাঁটাচলা করতে পারে, তাদের তুলনায় মানব শিশুর মস্তিষ্কের আয়তন ছোট থাকে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্কের কারণেই মানব শিশু যখন কোলে চেপে ঘোরে, তখনও সে কাউকে দেখা মাত্রই প্রত্যক্ষ করতে পারে। বড় করার জন্য মানবশিশুকে যে যত্নআত্তি করা হয়, তা কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে। তারা কী দেখবে, কী শুনবে, সেই ক্ষমতা তৈরি করে দেয় এই লালনপালন। পরনির্ভরশীলতা কোনও ভাবে শিশুর বিকাশে বাধা হয় না। বিজ্ঞানীদের মতে, শিশু হাঁটাচলা করতে শেখার আগে নিষ্ক্রিয় থাকে, তেমন মনে করা ঠিক নয়। কেউ তাকে কোলে নিতে গেলে সে কিন্তু সেই মতো নিজের অঙ্গবিন্যাস বদলে ফেলে।
আরও পড়ুন:
গবেষকদের একাংশ মনে করেন, শিশুর মস্তিষ্ক বেশি পরিণত হয়ে গেলে প্রসবে সমস্যা হতে পারে। তাই মানব শিশু সময়ের আগেই জন্মায়। যদিও হ্যামন্ড এই তত্ত্বের সঙ্গে সহমত নন। তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা মনে করেন, শিশু যদি সময়ের আগে জন্মায়, তবুও পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে তার সমস্যা হয় না। তার অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়ে দেয়। যে হেতু মানুষের শৈশব অন্য প্রাণীর তুলনায় দীর্ঘ, সে কারণে সে শেখেও বাকিদের তুলনায় বেশি। হ্যামন্ডের দাবি, জন্মের পর থেকে পরের উপর নির্ভরশীলতাই শিশুকে অনেক বেশি সামাজিক করে তোলে। পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
কেউ মনে করেন, মানবশিশু জ্ঞান-বোধ নিয়েই জন্মায়। কেউ মনে করেন, সে ‘খুঁটে খেতে’ শেখে। আবার হ্যামন্ড-সহ এক দল বিজ্ঞানী মনে করেন, জন্মের পরে শিশুর অসহায়তাই তাকে সব শেখায়। আর তাকে বাকি স্তন্যপায়ীদের থেকে এগিয়ে দেয়।