চাঁদে জল আছে কি না, তা নিয়ে গত এক দশকে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। আলোচনা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের একাংশ দাবি করেন, চাঁদে জল রয়েছে। তবে তা তরল নয়। বরফ আকারে বা খনিজের সঙ্গে আবদ্ধ অবস্থায় জলের অণু থাকতে পারে। এ বার চাঁদের সেই সম্ভাব্য বরফের বিষয়ে নতুন তথ্য তুলে ধরল ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। দাবি করা হচ্ছে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মাটির নীচে বরফ থাকতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনটাই আভাস মিলেছে।
গত কয়েক দশক ধরেই চন্দ্রপৃষ্ঠে জলের সন্ধানে বিভিন্ন মহাকাশ অভিযান চলেছে। যেমন ২০০৮ সালে ভারতের পাঠানো চন্দ্রযান ১ থেকেই ইঙ্গিত মিলেছিল, চাঁদে জলের অণু থাকতে পারে। ওই সময়ে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সহায়তায় তৈরি ‘মুন মিনারেলজি ম্যাপার’ পাঠানো হয়েছিল চন্দ্রযান ১-এর সঙ্গে। ২০১৮ সালে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে দাবি করা হয়, চাঁদের স্থায়ী ভাবে ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলে (যেখানে সূর্যের আলো পড়ে না) বিভিন্ন জায়গায় বরফ রয়েছে।
পরে ২০২০ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক অবজ়ারভেটরি ফর ইনফ্রারেড অ্যাস্ট্রোনমি’ (সংক্ষেপে ‘সোফিয়া’) মিশনেও এই সংক্রান্ত তথ্য উঠে আসে। নাসা ওই সময়ে দাবি করে, চাঁদের শুধু অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলেই নয়, আলোকিত পৃষ্ঠেও বরফ রয়েছে। তাদের দাবি, চাঁদের অন্যতম বড় গহ্বর ক্লেভিয়াসের পৃষ্ঠদেশে প্রতি ঘনমিটার মাটিতে প্রায় তিন লিটার পর্যন্ত জল মিশে রয়েছে। এ বার ইসরো দাবি করল, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ভূগর্ভস্থ বরফ থাকারও ‘প্রমাণ’ মিলেছে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে গবেষণা চালানো এবং সেখানে জল ও অন্য খনিজের সন্ধান চালানোর জন্য ২০১৯ সালে চন্দ্রযান ২ মহাকাশে পাঠিয়েছিল ভারত। কিন্তু চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফল ভাবে অবতরণ করতে পারেনি চন্দ্রযান ২ (পরে চন্দ্রযান ৩ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফল ভাবে অবতরণ করে)। অবতরণ করার সময়ে শেষ মুহূর্তে চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২.১ কিলোমিটার উপর থেকে আছড়ে পড়ে ল্যান্ডার ‘বিক্রম’। তবে অভিযান পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। চন্দ্রযান ২-এর অরবিটারটি চাঁদের কক্ষপথ থেকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাতে থাকে ইসরোর কন্ট্রোল রুমে। এর অরবিটারে রয়েছে ডুয়াল-ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থেটিক অ্যাপারচার র্যাডার। ওই র্যাডারের পাঠানো তথ্য সম্প্রতি বিশ্লেষণ করে দেখেছে অহমদাবাদের ফিজ়িক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (পিআরএল)।
আরও পড়ুন:
অহমদাবাদের সংস্থার ওই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল, চাঁদের অধিক ছায়াচ্ছন্ন গহ্বর বা ‘ডবললি শ্যাডোড ক্রেটার’ (চাঁদের স্থায়ী ভাবে ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলের মধ্যে থাকা এক বিশেষ ধরনের গহ্বর, যেখানে সূর্যালোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনও ভাবেই পৌঁছোয় না) বিশ্লেষণ করা। এই ধরনের গহ্বরে সূর্যের আলো কোনও ভাবেই পৌঁছোতে না পারার ফলে এগুলি অত্যন্ত শীতল হয়। এখানে তাপমাত্রা থাকে ২৫ কেলভিন বা প্রায় মাইনাস ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চাঁদের এমন শীতল অঞ্চল দীর্ঘ সময় ধরে বরফ সংরক্ষণ করার জন্য অনুকূল স্থান বলে বিবেচনা করা হয়।
ইসরো এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এমন চারটি অধিক ছায়াচ্ছন্ন গহ্বরের নীচে ভূগর্ভস্থ বরফ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। র্যাডারে তেমনই সংকেত ধরা পড়েছে বলে জানাচ্ছে ইসরো। এর মধ্যে রয়েছে ফাউস্টিনি গহ্বর। সেখানে ১.১ কিলোমিটার ব্যাসের একটি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ বরফ থাকার জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে বলে দাবি করা হচ্ছে গবেষণায়।
আরও পড়ুন:
চন্দ্রযান ২-এর অরবিটার থেকে পাওয়া এই তথ্য আগামী দিনে চাঁদে জলের খোঁজে অভিযানে গোটা বিশ্বকে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। চাঁদের অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং আলোকিত উভয় জায়গাতেই ‘বরফ’-এর সন্ধান পাওয়ার দাবি আগেই করা হয়েছে। এ বার চাঁদে ভূগর্ভস্থ বরফ থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরল ইসরো। যদিও চাঁদে তরল অবস্থায় জল পাওয়া গিয়েছে, এমন তথ্য এখনও জানা যায়নি।