Advertisement
E-Paper

এ বার আন্টার্কটিকাতেও লার্ভার শরীরে প্লাস্টিক-কণা পেলেন বিজ্ঞানীরা! দূষণ নিয়ে বিপদঘণ্টা আরও জোরালো বিশ্বে

আন্টার্কটিকা মহাদেশে কোনও মনুষ্যবসতি নেই ঠিকই, তবে প্লাস্টিক পৌঁছে গিয়েছে সেখানেও। অতীতে বেশ কিছু গবেষণায় আন্টার্কটিকার বরফে এবং সংলগ্ন সমুদ্রে প্লাস্টিকের টুকরো পাওয়া গিয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮
আন্টার্কটিকায় পতঙ্গের লার্ভার শরীরে মিলল প্লাস্টিকের কণা।

আন্টার্কটিকায় পতঙ্গের লার্ভার শরীরে মিলল প্লাস্টিকের কণা। গ্রাফিক: এআই সহায়তায় প্রণীত।

মাছির মতোই। কিন্তু ডানা নেই। উড়তে পারে না। পোকা বলতে আন্টার্কটিকা মহাদেশে একমাত্র এদেরই বাস। নাম বেলজিকা আন্টার্কটিকা। সেই পোকাও শিকার হচ্ছে প্লাস্টিক দূষণের। এদের লার্ভার শরীরে মিলল প্লাস্টিকের কণা, যা বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি করল।

বরফঢাকা আন্টার্কটিকার চরম শীতল পরিবেশও বেঁচে থাকতে পারে এই পোকারা। দেখতে অনেকটা চালের দানার মতো, গড় দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ মিলিমিটার। মনুষ্যবসতিহীন এক মহাদেশেও (আন্টার্কটিকায় কোনও স্থায়ী মনুষ্য বসতি নেই, শুধু গবেষণার কাজে মানুষ সেখানে যায়) প্লাস্টিক দূষণের কবলে পড়ছে পোকারা। আমেরিকার কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল পরিবেশবিদের নেতৃত্বে এই গবেষণা চলে। সম্প্রতি ‘সায়েন্স অফ দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণাটি শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। গবেষকদলের প্রধান জ্যাক ডেভলিন তখন পিএইচডি কর ছিলেন। ডেভলিনের কথায়, প্লাস্টিক দূষণ সংক্রান্ত একটি তথ্যচিত্র থেকেই এই গবেষণায় অনুপ্রাণিত হন তিনি। কীটপতঙ্গের উপরে প্লাস্টিক দূষণের কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন নথিপত্র ঘাঁটতে শুরু করেন তিনি।

আন্টার্কটিকা মহাদেশে কোনও মনুষ্যবসতি নেই ঠিকই, তবে প্লাস্টিক পৌঁছে গিয়েছে সেখানেও। অতীতে বেশ কিছু গবেষণায় আন্টার্কটিকার বরফে এবং সংলগ্ন সমুদ্রে প্লাস্টিকের টুকরো পাওয়া গিয়েছে। যদিও বিশ্বের অন্য প্রান্তে যে পরিমাণ প্লাস্টিক রয়েছে, তার তুলনায় আন্টার্কটিকায় প্লাস্টিকের পরিমাণ অনেকটাই কম। এই প্লাস্টিক আন্টার্কটিকায় বাস করা একমাত্র পতঙ্গ প্রজাতির উপরে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ডেভলিন।

আন্টার্কটিকার যে এলাকাগুলিতে শৈবাল থাকে, সেখানেই ডিম পা়ড়ে এই পোকা। এদের লার্ভারা গাছ থেকেই পুষ্টি সংগ্রহ করে। প্লাস্টিক এদের উপরে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা খতিয়ে দেখতে প্রথমে নিয়ন্ত্রিত (যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে নয়) কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা চালান গবেষকেরা। তাতে প্রাথমিক ভাবে দেখা যায়, কোনও অঞ্চলে প্লাস্টিকের ঘনত্ব বেশি হলেও এদের বেঁচে থাকার হার কমেনি। এমনকি তাদের মৌলিক বিপাকেও বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। আপাত ভাবে বিষয়টিতে উদ্বেগজনক কিছু মেলেনি। কিন্তু আরও বিশ্লেষণের পরে দেখা যায়, খুব বেশি মাত্রায় প্লাস্টিক-কণা থাকলে, তাতে এই পোকার লার্ভাদের উপরে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এদের শরীরে কার্বোহাইড্রেট এবং প্রোটিনের মাত্রায় কোনও প্রভাব না-পড়লেও ফ্যাটের পরিমাণ কমে যায়। এবং এটিই এই পোকাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ আন্টার্কটিকার চরম পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য শরীরে পর্যাপ্ত ফ্যাট মজুত থাকা দরকার।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই তথ্য পাওয়ার পরে শুরু হয় গবেষণার দ্বিতীয় পর্ব। প্রাকৃতিক পরিবেশে এই পোকারা ইতিমধ্যে প্লাস্টিক খেয়েছে কি না, তা বিশ্লেষণ করতে উদ্যোগী হন ডেভলিন এবং তাঁর গবেষকদল। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হয় গবেষণার এই দ্বিতীয় অধ্যায়। তাঁরা আন্টার্কটিকার ১৩টি দ্বীপের ২০টি এলাকা থেকে বেলজিকা আন্টার্কটিকার লার্ভা সংগ্রহ করেন। তাঁরা পাঁচ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের কিছু লার্ভার ব্যবচ্ছেদ করেন। এমন ৪০টি লার্ভার নমুনা ব্যবচ্ছেদ করা হয়। তার মধ্যে দু’টি লার্ভার শরীরে প্লাস্টিক-কণা পাওয়া যায়। চার মাইক্রোমিটার (এক মিটারের ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগকে মাইক্রোমিটার বলে) মাপের অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক-কণা পাওয়া যায় ওই লার্ভাগুলির শরীরে। যা খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়, তবে উন্নত আনুবীক্ষণিক যন্ত্রের মাধ্যমে তা শনাক্ত করতে পারেন ডেভলিনেরা।

গবেষকদলের প্রধান ডেভলিনের কথায়, এতগুলি নমুনার মধ্যে মাত্র দু’টি লার্ভায় প্লাস্টিক-কণা খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি আপাত ভাবে তুচ্ছ মনে হতেই পারে। কিন্তু এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তাও হতে পারে। তিনি বলেন, “এখনও পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের তুলনায় আন্টার্কটিকায় প্লাস্টিকের পরিমাণ অনেক কম। এটিই যা একটু ভাল খবর। আমাদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্লাস্টিক-কণা আপাতত এই পোকাদের সমস্যায় ফেলছে না। তবে প্লাস্টিক যে এদের শরীরে ঢুকে গিয়েছে, তা নিয়ে আমরা নিশ্চিত। এবং এর মাত্রা বেশি হয়ে গেলে এগুলি পোকাগুলির উপরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।”

তবে আন্টার্কটিকায় খাদ্য-খাদক শৃঙ্খলে এই পোকার সেই অর্থে কোনও খাদক বা শিকারি নেই। ফলে খাদ্য-খাদক শৃঙ্খলে এই প্লাস্টিক খুব বেশি উপরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই আপাত ভাবে মনে করছেন গবেষকেরা। তবে আন্টার্কটিকায় পৌঁছে যাওয়া প্লাস্টিক-কণায় অন্য জীবের উপরেও ভবিষ্যতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, সেই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁরা।

Plastic pollution Antarctica
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy