২০২২, ২০২৪-এর পর ২০২৬। টানা তিনটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নামছে ভারত। প্রথমটিতে তারা শোচনীয় ভাবে হেরেছে। পরেরটি বড় ব্যবধানে জিতেছে। বৃহস্পতিবার ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে দুই দলই চাইবে ফাইনালে উঠতে। ইংল্যান্ড চার বছর পর বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখছে। ভারতের লক্ষ্য ট্রফি ধরে রাখা। তবে দুই দলই চিন্তায় রয়েছে নিজেদের অন্যতম সেরা ব্যাটারকে নিয়ে। অভিষেক শর্মা এবং জস বাটলার, দুই সেরা ব্যাটারই নিজেদের ফর্মের ধারেকাছে নেই। ওয়াংখেড়ে কি দু’জনের কাছে প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ হতে চলেছে?
চিন্তার নাম অভিষেক
বিশ্বকাপের আগে ছন্দে থাকা অভিষেক যে এ ভাবে রান করতে ভুলে যাবেন তা কেউই ভাবতে পারেননি। বিশ্বকাপ শুরুই হয় শূন্য দিয়ে। পরের ম্যাচে পেটের সমস্যায় খেলতে পারেননি। পরের দু’টি ম্যাচে আবার শূন্য। সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে খাতা খোলেন ১৫ রান দিয়ে। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে অর্ধশতরানের পর মনে করা হয়েছিল ফর্মে ফিরেছেন। তা মিলিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ম্যাচেই।
কেন বার বার অভিষেক ব্যর্থ হচ্ছেন? বিভিন্ন কারণ উঠে আসছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তরুণ এই ক্রিকেটারের উপর বড্ড বেশি প্রত্যাশার চাপ তৈরি হয়েছে। তা তিনি সামলাতে পারছেন না। বিশ্বকাপ সব সময়েই বড় মঞ্চ। অতীতে তারকা ক্রিকেটারেরাও বার বার এই মঞ্চে ব্যর্থ হয়েছেন। অভিষেক সবে প্রথম বিশ্বকাপ খেলছেন। প্রথম বারেই যে তিনি ‘হিট’ হয়ে যাবেন এমন ভাবা ভুল।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপের আগে অভিষেক অনুমান করেছিলেন, তাঁকে আটকাতে স্পিন অথবা মন্থর গতির বল করা হবে। সে কারণে বিপক্ষে যেমন যেমন বোলার রয়েছে, তেমন বোলারদের বিরুদ্ধেই নেটে অনুশীলন করতেন তিনি। কিন্তু ম্যাচে নামলে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। প্রথাগত বোলার নয়, বিপক্ষ তাঁর সামনে নিয়ে আসছে এমন সব বোলার, যাঁদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি হয়তো সারেনইনি অভিষেক। পাকিস্তান ম্যাচে সলমন আঘা, নেদারল্যান্ডস ম্যাচে আরিয়ান দত্তের বলে আউট হওয়াই তার প্রমাণ।
তৃতীয়ত, নিজেকে চাপে ফেলছেন অভিষেক। তিনি হয়তো ভাবছেন, মাঠে নামলেই তাঁর থেকে ৫০ বা ১০০ রান প্রত্যাশা করছে দল। তাই শুরু থেকেই অনাবশ্যক চালিয়ে খেলতে গিয়ে উইকেট খোয়াচ্ছেন তিনি। বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার শ্রীবৎস গোস্বামী ‘ইন্ডিয়া টুডে’কে বলেছেন, “বড্ড বেশি ভাবছে অভিষেক। ব্যাটিংয়ের সময় ওর মনে হাজারো চিন্তা ভিড় করে আসছে। মানসিক ভাবে ঠিক জায়গায় না থাকলে কখনও ভাল ইনিংস খেলা যাবে না।”
যদিও অভিষেককে বাদ দেওয়ার স্বপক্ষে এখনই বিশেষ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। সতীর্থ থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার, সকলেই তরুণ ব্যাটারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব তো বলেই দিয়েছেন, “গত দু’বছর ধরে অভিষেক দিনের পর দিন দলকে টেনেছে। এ বার আমাদের উচিত ওর পাশে থাকা।” ঘটনাচক্রে, অভিষেকের আত্মবিশ্বাস এতটাই কমে গিয়েছে যে তিনি লোপ্পা সব ক্যাচও ফেলে দিচ্ছেন।
আইপিএলে অভিষেক স্পিন খেলতে বেশ স্বচ্ছন্দ। কাঁড়ি কাঁড়ি রানও করেছেন। কেন বিশ্বকাপে সমস্যা হচ্ছে? বেশির ভাগেরই মত, সমস্যাটা টেকনিকে নয়, মানসিক। অভিষেক অহেতুক নিজেকে চাপ দেওয়া বন্ধ করুন। নিজের মতো ছন্দে খেলুন। রানে ঠিকই ফিরবেন। এই ওয়াংখেড়েতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টিতে শতরান রয়েছে অভিষেকের। ফলে মঞ্চ তাঁর সামনে তৈরিই। শুধু কাজে লাগানোর অপেক্ষা।
কী হল বাটলারের?
অভিষেক তবু প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছেন। বাটলার তো অনেক অভিজ্ঞ। আইপিএলে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করেছেন। ভারতের পিচ হাতের তালুর মতো চেনা। তাঁর এত অসুবিধা হচ্ছে কেন?
বিশ্বকাপে সাতটি ম্যাচ খেলেছেন বাটলার। প্রথম দু’টি ম্যাচে কুড়ির ঘরে রান করেছিলেন। তার পরের পাঁচটি ম্যাচে দু’অঙ্কের ঘরে পৌঁছতে পারেননি। শেষ ম্যাচে তো খাতাই খুলতে পারেননি। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকে চতুর্থ সর্বোচ্চ রান রয়েছে বাটলারের। গত সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৩৫ বলে ৮৩ রানের ইনিংস এখনও কেউ ভোলেননি। কিন্তু শেষ ১৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অর্ধশতরান করতে পারেননি তিনি। উল্লেখ্য, ২০২৩ এক দিনের বিশ্বকাপ, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি— গত তিনটি আইসিসি প্রতিযোগিতাতেই বাটলারের ফর্ম খুব খারাপ ছিল। তবে ওয়াংখেড়েতে তাঁর পরিসংখ্যান আকর্ষণীয়। আইপিএলে শতরান রয়েছেন। ৯০-এর ঘরেও রান তুলেছেন দু’বার।
বাটলার যদি ফর্মে থাকেন, তা হলে একাই বিপক্ষের থেকে ম্যাচ কেড়ে নিতে পারেন। ইংল্যান্ড একটি কাজ করতে পারে। বাটলারকে নীচের দিকে নামাতে পারে। টি-টোয়েন্টিতে ৪৫টি ম্যাচে পাঁচে বা ছয়ে ব্যাট করেছেন। ফর্মে ফেরাতে জায়গা বদল করা যেতেই পারে। তবে ইংল্যান্ডের অন্যতম শক্তি হল ফিল সল্টের সঙ্গে বাটলারের ধ্বংসাত্মক ওপেনিং জুটি। দু’জনের বোঝাপড়াও ভাল। এই পরিস্থিতিতে বাটলারকে হঠাৎ নীচে নামিয়ে দেওয়া হলে সল্টের ফর্ম পড়ে যেতে পারে।
সতীর্থেরা বাটলারের পাশেই রয়েছেন। অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক বলেছেন, “জসকে নিয়ে অনেক কথা শুনছি। মনে রাখবেন, ইংল্যান্ডের হয়ে প্রায় ১৫০টা ম্যাচ খেলেছে ও। তাই ওকে নিয়ে কিছু বলার আগে এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া উচিত। সাদা বলের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারদের একজন ও। খারাপ ছন্দে আছে ঠিকই। কিন্তু বাটলারের রানের খিদে মোটেই কমেনি।” অভিষেকের মতোই বাটলারেরও মানসিক সমস্যা হচ্ছে বলে বেশির ভাগের মত।
আরও পড়ুন:
শুধু অভিষেক নয়, ভারতের চিন্তা থাকছে অন্য ব্যাপারেও। তার মধ্যে একটি হল বরুণ চক্রবর্তীর ফর্ম। কোন দিন তিনি ভাল খেলবেন কোন দিন খারাপ তা নিজেই জানেন না। ওয়াংখেড়েতে এমনিতেই বাউন্ডারির দৈর্ঘ্য ছোট। ফলে বরুণ নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতে না পারলে প্রচুর রান হজম করতে হতে পারে। একই ভাবে লাইন-লেংথ ঠিক রাখতে হবে অক্ষর পটেলকেও।
ভারতের ওপেনারদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইংল্যান্ড বিশেষ জোর দিচ্ছে লিয়াম ডসনের উপরে। তৈরি আছেন আদিল রশিদ এবং উইল জ্যাকসও। এ ছাড়া শুরুতে জফ্রা আর্চারের বাউন্সারের ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে, যা সামলাতে হবে সঞ্জুকে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শেষ দুই সাক্ষাতে ফলাফল ১-১। বৃহস্পতিবারের ওয়াংখেড়েতে কারা এগিয়ে যেতে পারে, সেটাই এখন দেখার।