ইডেন গার্ডেন্সে গেলে দেখা যায় পঙ্কজ রায়, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, ঝুলন গোস্বামী, জগমোহন ডালমিয়াদের নাম। সকলের নামে স্ট্যান্ড রয়েছে। সম্মানিত করার এই রীতি ক্রিকেটে পরিচিত। দেশ-বিদেশের বহু স্টেডিয়ামেই ক্রিকেটার বা কর্তাদের নামে স্ট্যান্ড রয়েছে। ব্যতিক্রম ছিল বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম।
বেঙ্গালুরুর স্টেডিয়ামের বয়স হল ৫০। বছরের হিসাবে নতুন বা তরুণ বলা যায় না। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) এই স্টেডিয়ামের আলাদা গুরুত্ব দীর্ঘ দিনের। সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তৈরির আগে পর্যন্ত চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামই ছিল বোর্ডের জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। কর্নাটক রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার পরিকাঠামো ব্যবহার করে বছরের পর বছর ভারতীয় ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বোর্ড কর্তারা। ৪০ হাজার দর্শকাসনের এ হেন গুরুত্বপূর্ণ স্টেডিয়ামে গ্যালারি থাকলেও স্ট্যান্ড ছিল না।
বেঙ্গালুরু ভারতীয় দলকে উপহার দিয়েছে একের পর এক ক্রিকেটার। গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, এরাপল্লি প্রসন্ন, ভাগবৎ চন্দ্রশেখর, সৈয়দ কিরমানি, জাভাগল শ্রীনাথ, অনিল কুম্বলে, রাহুল দ্রাবিড়, বেঙ্কটেশ প্রসাদ, লোকেশ রাহুল— তালিকা ছোট নয়। বেদা কৃষ্ণমূর্তি, শান্তা রঙ্গস্বামী, রাজেশ্বরী গায়কোয়াড়, শ্রেয়ঙ্কা পাতিলের মতো নাম রয়েছে। অথচ এত দিনেও কর্নাটকের ক্রিকেট কর্তারা কোনও স্ট্যান্ড কারও নামে নামকরণ করেননি।
নানা রাজ্য সংস্থা বিভিন্ন সময় ক্রিকেটার এবং কর্তাদের সম্মানিত করেছে। সুনীল গাওস্কর সচিন তেন্ডুলকর, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, বীরেন্দ্র সহবাগ, গৌতম গম্ভীর, যুবরাজ সিংহ, হরভজন সিংহ, হরমনপ্রীত কৌরদের নামে স্ট্যান্ড রয়েছে বিভিন্ন স্টেডিয়ামে। আরও অনেকের নামে স্ট্যান্ড রয়েছে। কারও কারও নামে রয়েছে সাজঘর। এত দিন এমন সম্মান থেকে ব্রাত্যই ছিলেন কর্নাটকের ক্রিকেটারেরা।
অবশেষে উদ্যোগ নিলেন প্রসাদ। জাতীয় দলের প্রাক্তন বোলার এখন কর্নাটক রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি। স্টেডিয়ামের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তিন প্রাক্তন ক্রিকেটারের নামে স্ট্যান্ড করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেই মতো শুক্রবার দ্রাবিড়, কুম্বলে এবং রঙ্গস্বামীর নামে তিনটি স্ট্যান্ডের নামকরণ হয়েছে।
দ্রাবিড় এবং কুম্বলে প্রাক্তন ক্রিকেটারই শুধু নয়। তাঁরা জাতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক এবং কোচও। এমন কৃতিত্ব দেশে খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। খেলোয়াড় হিসাবেও শুধু নিজেদের সময় তাঁরা বিশ্বের অন্যতম সেরা ছিলেন না। বিশ্বের সর্বকালের সেরাদের সঙ্গে তাঁদের নাম উচ্চারিত হয়। টেস্ট ক্রিকেট হলে তো বটেই। ভারতীয়দের মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিক কুম্বলে। দেশের হয়ে ৪০৩টি ম্যাচ খেলে তাঁর উইকেট সংখ্যা ৯৫৬। পিছিয়ে নেই দ্রাবিড়ও। দেশের হয়ে ৫০৯টি ম্যাচ খেলেছেন। ২৪২০৮ রান রয়েছে তাঁর। সচিন এবং কোহলির পর তৃতীয় স্থানে তিনি। কোচ দ্রাবিড় দেশকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও দিয়েছেন। অথচ এত দিন দেশের কোনও স্টেডিয়ামে এই দু’জনের নামে স্ট্যান্ড ছিল না। অন্য রাজ্যে তো নয়ই, তাঁদের ঘরের মাঠ চিন্নাস্বামীতেও নয়। তাঁদের সঙ্গেই প্রসাদের কমিটি সম্মানিত করেছে রঙ্গস্বামীকে। ভারতীয় মহিলা দলের প্রাক্তন অধিনায়ক তিনি। ভারতের প্রথম মহিলা ক্রিকেটার হিসাবে টেস্ট শতরান করার কৃতিত্বও তাঁর।
সম্মানিত হয়ে দ্রাবিড়, কুম্বলেরা চিন্নাস্বামীকে তাঁদের দ্বিতীয় বাড়ি বলে উল্লেখ করেছেন। দ্রাবিড় বলেছেন, এই মাঠে যত সময় কাটিয়েছি, তত সময় বাড়িতেও কাটাইনি। ঠিকই তো। খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠের সম্পর্ক আত্মিক। কোনও না কোনও মাঠেই তাঁরা বেড়ে ওঠেন। শিক্ষার্থী থেকে কিংবদন্তি হয়ে ওঠার যাত্রাপথের প্রতিটি পর্যায়ের লড়াই, সংগ্রামের সাক্ষী সেই মাঠ। তাঁদের সাফল্য-ব্যর্থতা, উচ্ছ্বাস-হতাশার হিসাব জানে মাঠের ঘাস। সচিন, রোহিতের যেমন ওয়াংখেড়ে। গম্ভীর, কোহলির যেমন অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম। পঙ্কজ, সৌরভের যেমন ইডেন। হরভজন, যুবরাজের যেমন মোহালি। তেমনই দ্রাবিড়, কুম্বলের কাছে চিন্নাস্বামী। যিনি যে মাঠে খেলে বড় হন, সেই মাঠ খেলোয়াড়ের মনের আলাদা কোঠরে থাকে। যে কোঠরে অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ। কারও কারও ক্ষেত্রে প্রেমিক-প্রেমিকা বা জীবনসঙ্গীরও। অথচ প্রিয় চিন্নাস্বামীতেই এত দিন তাঁদের অবদান স্বীকৃতি পায়নি।
আরও পড়ুন:
কয়েক দিন আগে বিশ্বকাপ জেতা হরমনপ্রীতের নামে স্ট্যান্ড রয়েছে পঞ্জাবের নতুন মুল্লানপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। এখনও খেলে চলা রোহিতের নামে স্ট্যান্ড হয়েছে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। অনেক আগেই দিল্লির ক্রিকেট কর্তারা সম্মানিত করেছেন ভারতের এক দিনের দলের সদস্য কোহলিকে। পরের, তারও পরের প্রজন্মের ক্রিকেটারেরা সম্মানিত হলেও ‘স্ট্যান্ড বাই’ থেকে গিয়েছেন কর্নাটকের ক্রিকেটারেরা। অবশেষে প্রসাদের উদ্যোগে স্ট্যান্ডে জায়গা পেলেন দ্রাবিড়, কুম্বলে এবং রঙ্গস্বামী। সিএবি সভাপতি প্রাক্তন সতীর্থের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে প্রসাদকে মনে করিয়ে দিয়ে সৌরভ আশা প্রকাশ করেছেন, বিশ্বনাথের নামেও স্ট্যান্ড হবে।