Advertisement
E-Paper

ইডেন সঞ্জুর! বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে, বড় ম্যাচে বড় ইনিংস স্যামসনের, বৃহস্পতিবার সামনে ইংল্যান্ড

ইডেনে রেকর্ড গড়লেন সঞ্জু স্যামসন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে রান তাড়া করতে নেমে এত দিন ভারতের হয়ে সবচেয়ে বেশি ৮২ রান ছিল বিরাট কোহলির। ৯৭ রান করে সেই রেকর্ড ভেঙে দিলেন সঞ্জু।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ২২:৪৮
cricket

ইডেনে ভারতকে জিতিয়ে সঞ্জু স্যামসন। ছবি: পিটিআই।

এ ভাবেও ফিরে আসা যায়। কয়েক দিন আগে যে ব্যাটারকে দেখে মনে হচ্ছিল, বেঞ্চে বসেই বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে, সেই ব্যাটারই ভারতকে সেমিফাইনালে তুললেন। ইডেনে সঞ্জু স্যামসনের ব্যাটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়কে ৫ উইকেটে হারাল ভারত। ৯৭ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন সঞ্জু। বৃহস্পতিবার মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারতের সামনে ইংল্যান্ড। অবশ্য ম্যাচ জিতলেও বেশ কয়েকটি চিন্তা থেকে গেল গৌতম গম্ভীর, সূর্যকুমার যাদবদের সামনে। স্পিনারদের বোলিং, ফিল্ডিং ও সর্বোপরি অভিষেক শর্মার ফর্ম শেষ চারের লড়াইয়ে ভোগাতে পারে ভারতকে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এটি ভারতের সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জয়। এর আগে ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১৭৩ রান তাড়া করে জিতেছিল ভারত। ১২ বছর পর সেই নজির ভাঙল। ১০ বছর পর একটি বদলাও নিল ভারত। ২০১৬ সালে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারতের বিরুদ্ধে ১৯২ রান তাড়া করে জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। বিদায় নিয়েছিল ভারত। সেই হারের বদলা ইডেনে নিল ভারত।

cricket

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নেন সূর্য। ব্রেন্ডন কিং না থাকায় এই ম্যাচে হোপের সঙ্গে ওপেন করতে নামেন রস্টন চেজ়। পাওয়ার প্লে-তে সাবধানি ব্যাটিং করেন দু’জনে। রান তোলার গতি খুব বেশি না থাকলেও উইকেট পড়েনি। তবে পড়তে পারত। জসপ্রীত বুমরাহের বলে ক্যাচ তোলেন চেজ়। বলের নীচে পৌঁছেও গিয়েছিলেন অভিশেক শর্মা। কিন্তু সহজ ক্যাচ ফেলেন তিনি। সেই ক্যাচ ধরা নয়, ফস্কানো কঠিন। অভিষেক সেটাই করে দেখান। সুযোগ কাজে লাগান চেজ়।

ওপেনিং জুটিতে ৬৮ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। জুটি ভাঙেন বরুণ চক্রবর্তী। তাঁর বল পিছনের পায়ে খেলতে গিয়ে বোল্ড হন হোপ। ৩৩ বলে ৩২ রান করেন তিনি। তিনটি চার ও একটি ছক্কা মারলেও ১৭টি ডট বল খেলেন তিনি। হোপ আউট হওয়ার পর ব্যাট করতে নামেন শিমরন হেটমায়ার। চলতি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের সেরা ব্যাটার। শুরু থেকেই হাত খুলে শট মারতে শুরু করেন তিনি। এক ধাক্কায় দলের রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেন তিনি।

বাধ্য হয়ে বুমরাহের হাতে বল তুলে দেন সূর্য। অধিনায়ককে নিরাশ করেননি বুমরাহ। আউট করেন হেটমায়ারকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের এই ব্যাটারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ২৩ বল করেছেন বুমরাহ। আউট করেছেন ছ’বার। ১২ বলে ২৭ রানে আউট হন হেটমায়ার। দু’বল পরেই বুমরাহ ফেরান চেজ়কে। তিনি করেন ২৫ বলে ৪০ রান।

পর পর উইকেট পড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের রান তোলার গতি কমে যায়। রান পাননি শারফেন রাগারফোর্ড (১৪)। তাঁকে আউট করেন হার্দিক পাণ্ড্য। ১৫ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের রান ছিল ৪ উইকেটে ১২৫। দেখে মনে হচ্ছিল, ১৭০-১৭৫ রানের বেশি হবে না। সেখান থেকে জুটি গড়লেন রভম্যান পাওয়েল ও জেসন হোল্ডার।

অর্শদীপ সিংহের এক ওভারে ২৪ রান করেন দুই ব্যাটার। সেখান থেকে খেলা ঘুরে যায়। পরের ওভারে ১৪ রান দেন বরুণ। তিন ওভারে ৫০ রান হয়। যে ভাবে দুই ব্যাটার হাত খুলে মারছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল, ২১০ রানও করে ফেলতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। শেষ দুই ওভারে হয় ২০ রান। আরও একটি সহজ ক্যাচ ছাড়েন অভিষেক। নইলে রান আরও একটু কম হত। ৪ উইকেট হারিয়ে ১৯৫ রানে শেষ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের ইনিংস। পাওয়েল ১৯ বলে ৩৪ ও হোল্ডার ২২ বলে ৩৭ রানে অপরাজিত থাকেন।

দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ম্যাচ জিততে হলে নিজেদের সেরা ব্যাটিং করতে হবে ভারতকে। কিন্তু শুরুটা ভাল হয়নি। অভিষেককে দেখে মনে হচ্ছিল, এখনও ছন্দ ফেরেননি। বেশ কিছু বল নষ্ট করেন। অপর ওপেনার সঞ্জু স্যামসন বড় শট খেলছিলেন। আকিল হোসেনের নিরীহ বলে গায়ের জোরে শট মারতে গিয়ে আউট হন অভিষেক। বিশ্বকাপের আগে এই বল চোখ বন্ধ করে গ্যালারিতে ফেলতেন তিনি। কিন্তু কঠিন সময়ে কী ভাবে খারাপ বলেও আউট হওয়া যায় তা দেখালেন ভারতীয় ওপেনার। ১১ বলে ১০ রান করলেন তিনি। ঈশান কিশন তিন নম্বরে নেমে ভাল খেলছিলেন। কিন্তু তিনিও হোল্ডারের বলে পুল মারতে গিয়ে বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। ৬ বলে ১০ রান করেন ঈশান। একটু আগে শট খেলে বসেন ঈশান। ফলে বল তাঁর ব্যাটের একেবারে নীচে লাগে। ফলে যতটা জোরে ভেবেছিলেন, ততটা জোরে মারতে পারেননি তিনি। পাওয়ার প্লে-তে ২ উইকেট হারিয়ে ৫৩ রান করে ভারত।

চার নম্বরে নেমে সূর্যও হাত খুলতে পারছিলেন না। কিন্তু সঞ্জু অন্য দিকে সাবলীল ব্যাট করছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল বাকিরা এক পিচে ও তিনি অন্য পিচে খেলছেন। ভারতের রান টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন সঞ্জু। পাওয়ার প্লে-র পরেও হাত খুলে খেলছিলেন তিনি। ২৬ বলে অর্ধশতরান করেন সঞ্জু। ঠিক যখন মনে হচ্ছে, এই জুটিতে বড় রান হবে, ঠিক তখনই ১৬ বলে ১৮ রান করে আউট হন সূর্য। ইডেনে অধিনায়কের থেকে আরও একটু দায়িত্ব আশা করা গিয়েছিল।

cricket

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

অর্ধশতরানের পর তেমন কোনও উল্লাস করলেন না সঞ্জু। আবার গার্ড নিলেন। বুঝিয়ে দিলেন, খেলা এখনও বাকি। সূর্য আউট হওয়ার পর ভারতের রান তোলার গতি একটু কমে গিয়েছিল। শামার জোসেফের একটি ওভারকে নিশানা করলেন তিনি। তাঁকে সঙ্গ দিলেন তিলক বর্মা। সেই ওভারে এল ১৭ রান। হিসাব করে এগোচ্ছিলেন দুই ব্যাটার। ওভার প্রতি ১০ রানের একটু বেশি দরকার ছিল। তাই খুব বেশি ঝুঁকি নিচ্ছিলেন না। বড় শটের পাশাপাশি দৌড়েও রান নিচ্ছিলেন তাঁরা।

জয়ের জন্য শেষ ছ’ওভারে দরকার ছিল ৬০ রান। অর্থাৎ, প্রতি ওভারে ১০ রান। হাতে তখনও ৭ উইকেট। টি-টোয়েন্টিতে ১০ বারের মধ্যে ৯ বার এই রান তাড়া করতে দেখা যায়। কিন্তু যে ম্যাচের উপর সেমিফাইনালে ওঠা নির্ভর করছে সেই ম্যাচে চাপ কিছুটা হলেও থাকে। তবে সঞ্জু ও তিলককে দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁরা ঠিক করে ফেলেছেন ম্যাচ শেষ করে ফিরবেন। ঠিক তখনই আউট হলেন তিলক। আরও একটি ভাল ক্যাচ ধরলেন হেটমায়ার। ১৫ বলে ২৭ রান করলেন তিলক।

সঞ্জু অবশ্য তত ক্ষণে ক্রিকেট বলকে ফুটবলের মতো দেখছিলেন। আরাম করে বড় শট মারছিলেন। কয়েক দিন আগে এই সঞ্জুকে খেলানো নিয়ে প্রশ্নের জবাব অধিনায়ক সূর্য বলেছিলেন, “আপনি চাইছেন আমি অভিষেককে বসিয়ে সঞ্জুকে খেলাই।” সেই কথার মধ্যে কোথাও একটি তাচ্ছিল্য মেশানো ছিল। ফলে অনেককে জবাব দেওয়ার ছিল সঞ্জুর। বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচকে মঞ্চ করে তুললেন তিনি। বুঝিয়ে দিলেন, সুযোগ পেলে তা কী ভাবে কাজে লাগাতে হয়।

এই ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কোনও সুযোগ দেননি সঞ্জু। ক্রিকেটের পরিভাষায় ক্লিনিক্যাল ইনিংস যাকে বলে। ঝুঁকি নিয়ে একটিও শট খেলেননি। যখন বড় শট খেলেছেন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলেছেন। যত সময় গড়াচ্ছিল, তত ভারত জয়ের পথে এগোচ্ছিল। তার মধ্যে হার্দিকের ক্যাচ ফস্কান হোল্ডার। তত ক্ষণ ভাল ফিল্ডিং করছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। কিন্তু কঠিন সময়ে চাপ সামলাতে পারল না তারা।

ইডেনে রান তাড়া করতে নেমে একটি রেকর্ডও গড়লেন সঞ্জু। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এত দিন ভারতের হয়ে রান তাড়া করতে নেমে সবচেয়ে বেশি রান ছিল বিরাট কোহলির দখলে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৮২ রান করেছিলেন তিনি। সেই রেকর্ড এই ম্যাচে ভেঙে দিলেন সঞ্জু।

শেষ ওভারের প্রথম দুই বলে ছক্কা ও চার মেরে দলকে জেতালেন সঞ্জু। ৫০ বলে ৯৭ রানে অপরাজিত থাকলেন। ১২ চার ও চার ছক্কা মারলেন। ৩ রানের জন্য শতরান হাতছাড়া হলেও এই ইনিংস শতরানের থেকে কম নয়। দলকে জিতিয়েও কোনও বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখালেন না সঞ্জু। পিচে হাঁটু মুড়ে বসে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। হাতজোড় করে প্রণাম করলেন। তার পর মাঠ ছাড়লেন। তত ক্ষণে ভারতের সাজঘরে শুরু হয়েছে উল্লাস। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার উল্লাস।

Team India Suryakumar Yadav
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy