মিচেল স্যান্টনারকে পর পর দু’টি ছক্কা মেরে শতরান পূর্ণ করে ফেললেন ঈশান কিশন। অফ স্টাম্পের এক হাত বাইরে পড়া বল পাঠিয়ে দিলেন মিড অন বাইন্ডারির বাইরে। অথচ ‘অবাধ্য’ ঈশানের দল থাকারই কথা ছিল না।
ঋষভ পন্থের চোট আর সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফির ১০ ম্যাচে ৫১৭ রান। ভারতীয় দলের মূল স্রোত থেকে দূরে চলে যাওয়া ২৭ বছরের তরুণকে নতুন ক্রিকেটজীবন দিয়েছিল। ফিরে পাওয়া ক্রিকেটজীবনকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে চাইছেন ঈশান। নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে রায়পুরে ৭৬ রানের ইনিংসে ইঙ্গিত ছিল। সিরিজ়ের চতুর্থ ম্যাচ খেলতে পারেননি কুঁচকিতে হাল্কা চোট পাওয়ায়। শেষ ম্যাচে জ্বলে উঠলেন ব্যাট হাতে।
শনিবার ঈশান খেলেছেন ৪৩ বল। করেছেন ১০৩ রান। ৬টি চার মেরেছেন। সঙ্গে ১০টি ছক্কা। স্ট্রাইক রেট ২৩৯.৫৩। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম শতরানেই বিশ্বকাপের প্রথম একাদশে জায়গা নিশ্চিত করে ফেলেছেন। ২০২৩ সালে এক দিনের বিশ্বকাপের পর হঠাৎ হারিয়ে যান ঈশান। হতাশায় ক্রিকেট থেকে মন সরে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে হঠাৎ ফিরে এসেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে। অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন তৎকালীন কোচ রাহুল দ্রাবিড় এবং সেই সফরের অধিনায়ক লোকেশ রাহুল। তবু তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটারের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা।
ছুটি নেওয়ার পর ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান ঈশান। বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। ঝাড়খণ্ড ক্রিকেট সংস্থার কর্তাদেরও অন্ধকারে রেখেছিলেন। অথচ দুবাইয়ে মহেন্দ্র সিংহ ধোনির সঙ্গে একটি পার্টিতে স্বমেজাজে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সে সময় ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন ঈশান। বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ বোর্ড কর্তারা তাঁকে ছেঁটে ফেলেন সব দল থেকে। কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকেও বাদ দিয়ে দেওয়া হয়।
নিরুদ্দেশ ঈশানকে ২২ গজে ফিরিয়ে ছিলেন হার্দিক পাণ্ড্য। বডোদরায় হার্দিক এবং ক্রুণাল পাণ্ড্যর সঙ্গে অনুশীলন, ফিটনেস ট্রেনিং শুরু করেন। তবু বোর্ড এবং রাজ্য সংস্থার কর্তারা মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন। ‘অবাধ্য’ ঈশানকে দলে ঠাঁই দিতে রাজি ছিলেন না কেউ। ২০২৪ সালের আইপিএলে আবার ঈশান ফেরেন প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে। দারুণ কিছু করতে পারেননি সে বার। ভারতীয় দলে ফেরার রাস্তা তখনও ভেজিয়ে রেখেছিলেন বোর্ড কর্তারা। পথ কঠিন বুঝে যান ঈশান।
না প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। অপেক্ষা করেছেন। অনুশীলন করেছেন। নতুন করে ক্রিকেটের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ফিরে আসার এই পথের প্রদর্শক ছিলেন হার্দিক। কিছুটা শুভমনও। প্রিয় বন্ধুকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল পারফর্ম করতে শুরু করেন। তবু জাতীয় দলের নির্বাচনী বৈঠকে তাঁর নাম উচ্চারণই করতেন না অজিত আগরকরেরা।
ঈশান হাল ছাড়েননি। ভরসা রেখেছিলেন নিজের ক্রিকেটীয় দক্ষতায়। নানা কারণে সমস্যায় জর্জরিত ঈশান শান্তি খুঁজতে ভগবদ্গীতাকে বেছে নেন। ২০২৪-এর ডিসেম্বরে মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ভগবদ্গীতার শ্লোক চোখে পড়ে, যেখানে লেখা ছিল, ‘কর্ম করো, ফলের আশা কোরো না’। বাবা প্রণব পাণ্ডেকে এই শ্লোকের অর্থ জিজ্ঞাসা করেন। বাবা অর্থ বোঝানোর পাশাপাশি আরও কিছু শ্লোক বলেন। তার পর থেকে এই বই ঈশানের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যাট, উইকেট রক্ষার দস্তানার সঙ্গে এই বইও তাঁর কিটব্যাগে থাকবেই।
ঝাড়খণ্ডতে সৈয়দ মুস্তাক আলিতে চ্যাম্পিয়ন করা পর ঈশান বলেছিলেন, ‘‘ভাল পারফর্ম করার পরও ভারতীয় দলে নির্বাচিত হইনি। তখন খারাপ লেগেছিল। নিজেকে বুঝিয়ে ছিলাম, এমন পারফর্ম করেও যদি সুযোগ না পাই, তা হলে আমাকে আরও ভাল কিছু করে দেখাতে হবে। দলকে জেতানোর মতো পারফরম্যান্স করতে হবে। আমাদের দল হিসাবে আরও ভাল কিছু করতে হবে। ‘‘আমরা অনেক সময় অনেক কিছু আশা করি। দলে নিজের নাম না দেখলে একটু তো খারাপ লাগেই। কিন্তু মানসিক ভাবে আমি এখন অনেক শক্ত। কোনও প্রত্যাশা নিয়ে খেলি না। শুধু নিজের কাজটা ভাল ভাবে করার চেষ্টা করি।’’
শুধু নিজের কাজই করে গিয়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ম্যাচ পর ম্যাচ পারফর্ম করেছেন। ভাল, আরও ভাল খেলার চেষ্টা করেছেন। আগরকরদের ভাবতে বাধ্য করেছেন। ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীরকেও আপত্তি করার সুযোগ দেননি। ভারতীয় দলের ভেজানো দরজাটা খুলে দিয়েছেন সৈয়দ মুস্তাক আলির ফাইনালে শতরান করে। এক বিশ্বকাপের পর হারিয়ে যাওয়া ঈশান সরাসরি ঢুকে পড়েছেন আর এক বিশ্বকাপের দলে।
আরও পড়ুন:
দু’বছরের বেশি সময় পর ভারতীয় দলে ফেরা ঈশানও নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। উইকেট রক্ষা করার সুযোগ পাননি তিনটি ম্যাচে। উইকেটের সামনেই যা করার করে দিচ্ছেন। দলের জয়ের রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছেন। মাস দুয়েক আগেও ভারতীয় দল থেকে অনেক দূরে থাকা ঈশানই আগামী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সূর্যকুমার যাদবের অন্যতম ভরসা। ক্রিকেটপ্রেমীরা তাকিয়ে থাকবেন তাঁর ব্যাটের দিকে। গম্ভীরও স্বস্তিতে থাকবেন। পন্থের চোট আর সঞ্জু স্যামসনের অফ ফর্মের মাঝে ঈশানই ভরসা দিচ্ছেন। শনিবার সেই ভরসার হাতে উঠল উইকেটরক্ষকের দস্তানাও।
২০২৩ সালের বিশ্বকাপ থেকে ২০২৬-এর বিশ্বকাপ। ঈশানের হারিয়ে যাওয়া থেকে ফিরে আসার বৃত্ত সম্পূর্ণ। মহেন্দ্র সিংহ ধোনির রাজ্যের উইকেটরক্ষক বলে কথা।