দেশের হয়ে একটি টেস্ট এবং ৩১টি এক দিনের ম্যাচ খেলা অজয় শর্মা হারিয়ে গিয়েছিলেন। দিল্লির প্রাক্তন ব্যাটারের সঙ্গে ক্রিকেটের কোনও যোগাযোগি ছিল না কয়েক বছর। কপিল দেব, মহম্মদ আজহারউদ্দিন, সচিন তেন্ডুলকরদের প্রাক্তন সতীর্থকে খুঁজে এনে জম্মু-কাশ্মীরের রঞ্জি দলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিঠুন মানহাস। সেই অজয়ের প্রশিক্ষণেই ভারতীয় ক্রিকেটে ইতিহাস তৈরি করল জম্মু-কাশ্মীর।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সভাপতি হওয়ার আগে মানহাস ছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের ডিরেক্টর অফ ক্রিকেট। তিনিই রাজ্য দলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন অজয়ের হাতে। শনিবার ফাইনালের শেষ দিন খেলার মাঝে অজয় বলছিলেন, ‘‘আমি ক্রিকেট থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। জম্মু-কাশ্মীরের কর্তারা তা-ও আমার উপর ভরসা রেখেছিলেন। বলতে পারেন তাঁরা আমায় পুনর্জন্ম দিয়েছেন।’’
কোচ হিসাবে অজয় অত্যন্ত কড়া ধাঁচের। মাঠের মধ্যে এবং বাইরে শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনও রকম আপস করতে রাজি নন। প্রাক্তন সতীর্থ চেতন শর্মাকে তিনি বলছিলেন, ‘‘জম্মু-কাশ্মীরে প্রতিভার অভাব নেই। প্রয়োজন সঠিক পরামর্শের। সুযোগ সুবিধাও সীমিত। কিন্তু চেষ্টা করলে ফল আসতে বাধ্য। ক্রিকেটারেরা চেষ্টার ফল পেয়েছে। এটা সম্পূর্ণ ওদের কৃতিত্ব। আমি শুধু সাহায্য করেছি।’’ দলটাকে এই জায়গায় আনলেন কী ভাবে? অজয় বললেন, ‘‘এটা লাল বলের ক্রিকেট। টি-টোয়েন্টি নয়। মরসুমের শুরুতেই ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম ক্রিকেটারের। তুলে মারা যাবে না। ছয় মারার কোনও প্রয়োজন নেই। ওভার প্রতি রান তোলার কোনও লক্ষ্য নেই। কোনও ঝুঁকি নেওয়া চলবে না। নেটে তুলে মারার প্রবণতা দেখলেও প্রথম একাদশ থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। যতক্ষণ বেশি সম্ভব উইকেটে থাকতে হবে।’’
আব্দুল সামাদ আইপিএলে আগ্রাসী ব্যাটিং করেন। তাঁকে কী করে এমন শৃঙ্খলায় বাঁধলেন? অজয় বলেছেন, ‘‘সকলের জন্য একই নিয়ম। এই দলে কোনও তারকা নেই। আমার দলে তারকা প্রথা চলে না। সামাদ ভাল ব্যাটার সন্দেহ নেই। ওকেও শাস্তি দিয়েছি। একটা ম্যাচে খারাপ শট খেলে আউট হয়েছিল। পরের ম্যাচে বসিয়ে দিয়েছিলাম। আর ভুল করেনি। ইচ্ছা মতো খেলা যাবে না।’’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শেষটা ভাল করতে পারেননি অজয়। নিজের শেষ এক দিনের ম্যাচে আউট হয়েছিলেন শূন্য রানে। হিরো কাপের সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ম্যাচে ভারতের ইনিংস গুটিয়ে গিয়েছিল ১০০ রানে। আর দেশের হয়ে খেলা হয়নি অজয়ের। ইডেন গার্ডেন্সে দেশের জার্সিতে অভিষেক হওয়া অজয় শুরু করেছিলেন শূন্য থেকে। ৬৬ বছরে রঞ্জি ট্রফির সেমিফাইনালে উঠতে না পারা একটা দলকে চ্যাম্পিয়ন করলেন।
চ্যাম্পিয়ন হয়ে কেমন লাগছে? পুরস্কার নিতে এসেও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারলেন না অধিনায়ক পরশ দোগরা। তিনি বললেন, ‘‘কী বলব বুঝতেই পারছি না। ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আমার একটু সময় লাগবে। এটুকু বলতে পারি, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমরা ১৪-১৫ জন মরসুমের শুরু থেকে প্রতিটি বলে নিজেদের ১০০ শতাংশ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এটা শুধু মাঠের ১১ জনের সাফল্য নয়। সকলের সাফল্য। আমাদের কোচ, কর্মকর্তা সকলের।’’
ফাইনালের সেরা ক্রিকেটার শুভম পুন্ডিরের গলাতেও অবিশ্বাস! তিনি বললেন, ‘‘অসাধারণ অনুভূতি। রূপকথার মতো মনে হচ্ছে। জম্মু-কাশ্মীর, ক্রিকেটার, কর্তা— সকলের জন্যই এই জয়টা দুর্দান্ত। এটা সকলের সাফল্য। আমরা সব সময় চেয়েছি, যতক্ষণ বেশি সম্ভব ব্যাট করতে। ঝুঁকি না নিয়ে খেলতে।’’ উচ্ছ্বাস গোপন করেননি রঞ্জি ট্রফির সেরা ক্রিকেটার আকিব নবিও। জোরে বোলার বললেন, ‘‘একটা দুর্দান্ত, অবিশ্বাস্য মরসুম শেষ হল। যখন খেলতে শুরু করেছিলাম, তখন থেকে রঞ্জি ট্রফি জেতার স্বপ্ন দেখতাম। এত দিনে সেই স্বপ্নপূরণ হল। এত দিনের কঠোর পরিশ্রম দাম পেল। আমাদের রাজ্যে পরিকাঠামোর সমস্যা রয়েছে। সুযোগ-সুবিধা সীমিত। আমরা এই খামতিগুলো পূরণ করেছি পরিশ্রম দিয়ে।’’
আবেগ সংযত রাখার চেষ্টা করছিলেন মানহাস। বিসিসিআই সভাপতি নিজের রাজ্যের সাফল্যে প্রকাশ্যে অন্তত উচ্ছ্বসিত হতে পারেন না। গোটা দেশের ক্রিকেটের প্রধান তিনি। মুখে প্রকাশ না করলেও তাঁর চোখ-মুখে ধরা পড়ছিল তৃপ্তি। বোর্ড সভাপতি বললেন, ‘‘দারুণ একটা যাত্রা পথ। কয়েক দিন বা কয়েক মাসে এটা হয়নি। আমরা শুরু করেছিলাম ২০২১ সালের জুনে। একটা পদ্ধতি মেনে এগোনোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিসিসিআই গত কয়েক বছরে জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটকে প্রচুর সাহায্য করেছে। বিশেষ করে জয় শাহ সচিব হওয়ার পর যা যা প্রয়োজন সব দিয়েছেন। জয় ভাইয়ের আগের সচিবেরা তো জম্মুতেই আসেননি। জয় ভাই নিজে সব দেখে, বুঝে উদ্যোগ নিয়েছেন। যেমন পরশ আসার পর আমাদের দল অনেক একাত্ম হয়েছে। আর অজয় ভাইয়ের কথা বলব। পাঁচটা রঞ্জি ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা দিয়ে দলটাকে তৈরি করেছেন। ভীষণ ঠান্ডা মাথার মানুষ। আবার কড়াও। দলের ব্যাটিং, মানসিকতা সব বদলে দিয়েছেন। এই সাফল্য দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল।’’ জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন ক্রিকেটার, কোচেরও কৃতিত্ব দিলেন বোর্ড সভাপতি। জানিয়ে দিলেন, তাঁদের অবদানও কম নয়।
আরও পড়ুন:
কামরাম ইকবালের মতো জুনিয়র ক্রিকেটার থেকে বোর্ড সভাপতি কেউ কৃতিত্ব নিতে চাইলেন না! ঐতিহাসিক সাফল্যের কারিগর হিসাবে অন্যদের দেখিয়ে দিলেন। আসলে সকলে মিলে দেখিয়ে দিলেন একটা দল মাঠে খেললেও পিছনে ছিল আরও কয়েকটা দল। সব মিলে একটাই দল। সাফল্যটা ক্রিকেটারদের মতো কোচ, কর্তা, প্রাক্তন ক্রিকেটারদেরও। বছরের পর বছরের চেষ্টায় ভারত চ্যাম্পিয়ন জম্মু-কাশ্মীর। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে সেরারা শুধু দলেই বড় নন, মনটা আরও বড়।
দেশের ভৌগলিক মুকুটে আগামী এক বছর শোভা পাবে ঘরোয়া ক্রিকেটের সেরা রত্ন।