শনিবার বিরাট কোহলি। রবিবার রোহিত শর্মা। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে দু’বছর আগে অবসর নিলেও দুই বুড়ো ঘোড়ার ব্যাটের ধার যে এখনও কমেনি তা আইপিএলে পর পর দু’দিন দেখা গেল। কোহলি রান তাড়া করতে নেমে জিতিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন। রোহিত জয়ের ভিত গড়ে দিলেন। ঘরের মাঠে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে হারিয়ে এ বারের আইপিএল শুরু করল মুম্বই। ওয়াংখেড়েতে প্রথমে ব্যাট করে ২২০ রান করে কেকেআর। সেই রান তাড়া করে ৫ বল বাকি থাকতে ৬ উইকেটে জিতল মুম্বই। আইপিএলের ইতিহাসে এটি তাদের সর্বাধিক রান তাড়া করে জয়।
২০১২ সালে শেষ বার আইপিএলে নিজেদের প্রথম ম্যাচ জিতেছিল মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। তার পর থেকে হার দিয়ে শুরু হত তাদের। ১৪ বছর পর আবার জয় দিয়ে আইপিএল শুরু রোহিতদের। আইপিএলে ওয়াংখেড়েতে কেকেআরের খারাপ ফল অব্যাহত থাকল। ১৩ ম্যাচ খেলে ১১টি হারল তারা।
চলতি মাসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই মাঠেই ভারত ও ইংল্যান্ডের ইনিংস মিলিয়ে ৪৯৯ রান হয়েছিল। সেই পিচেই ছিল এ দিনের ম্যাচ। ফলে রান যে হবে সেই ইঙ্গিত আগেই মিলেছিল। সেটাই হল। দু’ইনিংস মিলিয়ে প্রায় ৪৫০ রান হল।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভাল করেন কেকেআরের দুই ওপেনার অজিঙ্ক রাহানে ও ফিন অ্যালেন। পাওয়ার প্লে কাজে লাগিয়ে রান করছিলেন তাঁরা। বেশি বিধ্বংসী দেখাচ্ছিল অ্যালেনকে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফর্মই ধরে রেখেছিলেন তিনি। পাওয়ার প্লে-তে বিনা উইকেটে ৭৮ রান করে কেকেআর।
কলকাতাকে প্রথম ধাক্কা দেন শার্দূল ঠাকুর। ওয়াংখেড়ের উইকেটকে হাতের তালুর মতো চেনেন তিনি। সেটা কাজে লাগালেন। বলের গতির হেরফের করলেন। মন্থর বলে অ্যালেনকে ফেরালেন। ১৭ বলে ৩৭ রান করেন অ্যালেন। ২৫ কোটি ২০ লক্ষ টাকার ক্যামেরন গ্রিন শুরুটা ভাল করলেও বড় রান করতে পারেননি। সেই শার্দূলের বলেই ১৮ রান করে আউট হন তিনি।
পর পর উইকেট হারানোয় কেকেআরের রান তোলার গতি কিছুটা কমে যায়। অর্ধশতরানের পর রাহানেও বড় শট খেলতে পারছিলেন না। বাধ্য হয়ে বড় শট মারতে যান তিনি। ৪০ বলে ৬৭ রান করে সেই শার্দূলের বলেই ফেরেন কেকেআরের অধিনায়ক।
কেকেআরের রান তোলার গতি আবার বাড়ার অঙ্গকৃশ রঘুবংশী। গত বছর থেকেই নজর কেড়েছেন এই তরুণ প্রতিভা। এ বারও নিরাশ করেননি তিনি। ২৯ বলে ৫১ রান করেন। ১৯তম ওভারে হার্দিক পাণ্ড্যের বলে আউট হন। রিঙ্কু সিংহও রান পেয়েছেন। ২১ বলে ৩৩ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ২২০ রান করে কলকাতা।
আরও পড়ুন:
কেকেআর যে ভাবে শুরু করেছিল, তাতে অন্তত ২৪০ রান করতে হত। বিশেষ করে মুম্বইয়ের ব্যাটিং আক্রমণের বিরুদ্ধে। ফিল্ডিংয়ে একটি ক্যাচ ছাড়লেও ব্যাট হাতে তা পুষিয়ে দিলেন রোহিত। প্রথম দুই ওভার তেমন রান না হলেও তৃতীয় ওভার থেকে হাত খোলা শুরু করলেন রোহিত ও রিকেলটন। বৈভব অরোরার এক ওভারে তিনটি ছক্কা মারলেন তাঁরা। সেই শুরু। আর তাঁদের থামানো গেল না।
কেকেআরের পেসারদের গতি ব্যবহার করে একের পর এক বড় শট খেললেন। মাত্র ২২ বলে অর্ধশতরান করলেন রোহিত। তার মাঝেই হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন রাহানে। ফলে অধিনায়কের দায়িত্ব সামলাতে হয় রিঙ্কুকে। মুম্বইয়ের ইনিংস যত এগোল, তত কাঁধ ঝুঁকে গেল কেকেআরের ক্রিকেটারদের।
কেকেআর ভরসা করেছিল দুই স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী ও সুনীল নারাইনের উপর। কিন্তু বরুণের রহস্য যে উন্মোচিত হয়ে গিয়েছে, তা এই ম্যাচেও বোঝা গেল। তাঁকে নিশানা করলেন রোহিত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই বোঝা গিয়েছিল, বরুণকে খেলতে সমস্যা হচ্ছে না। এই ম্যাচেও গায়ের জোরে বল করে গেলেন তিনি। মাঝ পিচে বল ফেললেন। ভয়ে ভয়ে বল করলেন। তাঁর কাজ মাঝের ওভারে উইকেট তোলা। সেই তিনিই যদি কিছু করতে না পারেন, তা হলে দল কী ভাবে জিতবে। হলও তাই।
নারাইনের বিরুদ্ধে আবার হাত খুললেন রিকেলটন। কোনও বোলার ব্যাটারদের চাপে রাখতে পারেননি। যে কাজটা মুম্বইয়ের হয়ে জসপ্রীত বুমরাহ করেছেন, সেটা করার বোলার পেল না কেকেআর।
হতাশ করল কলকাতার ফিল্ডিংও। দুই ওপেনারের ক্যাচ পড়ল। তার মধ্যে বৈভব তো হাতের ক্যাচ ছাড়লেন। ক্যাচ ছাড়লে আর কী করে ম্যাচ জেতা যায়? ওজন ঝরিয়ে রোহিতের ফিটনেস যে কতটা বেড়েছে তা এই ম্যাচে দেখা গেল। আরাম করে একের পর এক ছক্কা মারলেন তিনি। দেখে মনে হচ্ছিল, না ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ২২০ রান তাড়া করতে নেমে চাপের লেশমাত্র দেখা গেল না।
অবশেষে ৩৮ বলে ৭৮ রান করে আউট হলেন রোহিত। তাতে অবশ্য বোলারের কৃতিত্ব নেই। ভাল ক্যাচ ধরলেন অনুকূল রায়। ছ’টি চার ও ছ’টি ছক্কা মারলেন মুম্বইয়ের ব্যাটার। রোহিত আউট হলেও যে ভিত তিনি গড়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকে হেরে যাওয়াটাই অসম্ভব ছিল।
কেকেআরের বোলারদের নিয়ে ছেলেখেলা করল মুম্বই। যে বোলিং আক্রমণের পরিকল্পনা কেকেআর করেছিল, তা নেই। পুরো বোলিং আক্রমণ নতুন করে সাজাতে হয়েছে। তার ফল পেল কেকেআর। সূর্যকুমার যাদব ১৬ রান করে আউট হলেন। রিকেলটন যে ভাবে খেলছিলেন, তাতে দেখে মনে হচ্ছিল, খেলা শেষ করে ফিরবেন। কিন্তু বাউন্ডারি থেকে অনুকূলের সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হলেন তিনি। ৪৩ বলে ৮১ রান করেন তিনি। আটটি ছক্কা মারেন মুম্বইয়ের বাঁহাতি ব্যাটার।
তবে তত ক্ষণে খেলার ফয়সালা প্রায় হয়ে গিয়েছে। তিলক, হার্দিক, রাদারফোর্ডদের ব্যাটিং আক্রমণের সামনে ২৭ বলে ৩৬ রান দরকার ছিল। সেই রান তাড়া করতে বেশি সময় নিলেন না হার্দিকেরা। জয় দিয়ে আইপিএলের যাত্রা শুরু করে দিল মুম্বই। অন্য দিকে আরও এক বার হার দিয়ে শুরু হল কেকেআরের।