২০০৮ সালে যখন আইপিএলে আটটি দল বিক্রি হয়, তখন সবচেয়ে সস্তার দল ছিল রাজস্থান রয়্যালস। ২৬৮ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছিল দল। সেই দলের দাম ১৮ বছর পর ১৫,২৮৫ কোটি টাকা। রাজস্থান এখন লিগের দ্বিতীয় দামি দল। এই ১৮ বছরে সকলকে টপকে গিয়েছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। ৪৪৬ কোটি টাকা থেকে তাদের দর বেড়ে হয়েছে ১৬,৭০৬ কোটি টাকা।
রাজস্থানের দর বাড়ল ২৫ গুণ
২০০৮ সালে রাজস্থান কিনেছিল ইমার্জিং মিডিয়া গ্রুপ। কর্ণধার মনোজ বাদালে। প্রথম বারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রাজস্থান। তার পর থেকে রাজস্থান আর চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও তাদের বাজারদর কমেনি। উল্টে ক্রমশ তা বেড়েছে। এসেছে নতুন অংশীদার। পরে মনোজের দলের ১৫ শতাংশ মালিকানা কেনে রেডবার্ড ক্যাপিটাল। ১৩ শতাংশ মালিকানা কেনে ল্যাচলান মার্ডক।
পরে আরও কয়েকটি সংস্থা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়। কাল সোমানি, ইয়ান ম্যাককিনন, ফিল জানসেন, রন কালিফা, এড রে, সিমার মায়ো, মিহির পটেলের মতো ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করেন। সেই সময় সোমানি বলেছিলেন, “এই বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ খুব ভাল। আমরা জানি, ভবিষ্যতে আইপিএল থেকে রোজগার আরও বাড়বে।”
২০২৫ সালের শেষ দিকে দল বিক্রির কথা ভাবেন মনোজ। দল বিক্রির প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যায়। বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী রাজস্থান কিনতে আগ্রহী ছিল। একাধিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর সোমানির নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করেছেন রাজস্থানের বর্তমান মালিকেরা। ভারতীয় মূল্যে প্রায় ১৫,২৮৫ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে। সোমানির নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামে রয়েছেন আমেরিকার আরও দুই ব্যবসায়ী। ওয়ালমার্টের কর্ণধার রব ওয়ালটন এবং ফোর্ডের কর্ণধার হ্যাম্প পরিবার। তারা রাজস্থানের ১০০ শতাংশ মালিকানা কিনে নিয়েছে।
কয়েক দিন আগেই রাজস্থানের বর্তমান বোর্ড কলুম্বিয়া প্যাসিফিক ক্যাপিটাল পার্টনার্সের ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় তাঁরা ভেবেছিলেন আরও বেশি দাম পাওয়া উচিত। সেই হিসাবে কম দামেই দলের সম্পূর্ণ মালিকানা বিক্রি করে দিল বর্তমান বোর্ড। এর আগে অন্য একটি আগ্রহী সংস্থা প্রায় ১১,৯৫৬ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। তা-ও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বর্তমান কর্ণধারেরা।
গত ১৮ বছরে রাজস্থানের দাম বেড়েছে ১৫,০১৭ কোটি টাকা। ২০০৮ সালে যা দাম ছিল, এখন তা বেড়েছে ২৩৩২.৮৪ শতাংশ বা প্রায় ২৫ গুণ। তার একটি বড় কারণ, ট্রফি জিততে না পারলেও রাজস্থানের জনপ্রিয়তা কমেনি। গত কয়েক বছরে উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে নজর দিয়েছে তারা। রাজস্থানের বেশ কয়েকটি ম্যাচ গুয়াহাটিতে হচ্ছে। অধিনায়ক করা হয়েছে অসমের ছেলে রিয়ান পরাগকে। ফলে সোমানির মতো ব্যবসায়ীর নজর পড়েছে এই দলের উপর।
১৬ গুণ দর বাড়ল বেঙ্গালুরুর
আইপিএলের শুরুতে ৪৪৬ কোটি টাকায় বেঙ্গালুরু কিনেছিলেন বিজয় মাল্য। তখন মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের পর আইপিএলের দ্বিতীয় দামি দল ছিল আরসিবি। কিন্তু ক্রিকেটের স্বার্থে দল কেনেননি মাল্য। ঋণখেলাপি মামলায় অভিযুক্ত মাল্য ভারত থেকে পালিয়ে বর্তমানে ব্রিটেনে থাকেন। সেখানেই একটি পডকাস্টে মাল্য বলেছেন, “আরসিবি কেনার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আমার মদের ব্র্যান্ড রয়্যাল চ্যালেঞ্জের প্রচার। ক্রিকেটের প্রতি কোনও ভালবাসা ছিল না।”
২০১২-১৩ সালে বেঙ্গালুরুর মালিকানা নেয় ব্রিটিশ কোম্পানি দিয়াজিও পিএলসি। ইন্ডিয়ান আর্ম ইউনাইটেড স্পিরিট লিমিটেডের মাধ্যমে আরসিবি’র কর্মকাণ্ড সামলাত তারা। ২০১৬ সালে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েন মাল্য। ফলে তাঁর হাত থেকে সব ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া হয়। তার পর থেকে দিয়াজিও পুরো দায়িত্ব সামলাচ্ছিল।
আরও পড়ুন:
২০২৪ সালে দলের নাম রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালোর থেকে বদলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু করে তারা। ২০২৫ সালে প্রথম বার আইপিএল জেতেন কোহলিরা। তার পরেই দল বিক্রি করার পরিকল্পনা করে দিয়াজিও। শেষ পর্যন্ত ১৬,৭০৬ কোটি টাকায় সেই দল কিনেছে আদিত্য বিড়লা গোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম।
এই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে আমেরিকার ক্রীড়া বিনিয়োগকারী ডেভিড ব্লিটজ়ার, আমেরিকার সংস্থা ব্ল্যাকস্টোন এবং টাইমস অফ ইন্ডিয়া গোষ্ঠী। দলের নতুন চেয়ারম্যান হচ্ছেন আদিত্য বিড়লা গোষ্ঠীর ডিরেক্টর আর্যমান বিক্রম বিড়লা। ভাইস চেয়ারম্যান হচ্ছেন টাইমস অফ ইন্ডিয়া গোষ্ঠীর সত্যন গজওয়ানি। ২০২৬ সালের আইপিএলের পর তাঁরা দায়িত্ব নেবেন।
আরসিবি কেনার লড়াইয়ে ছিল সুইডেনের সংস্থা ইকিউটি এবং মণিপাল হাসপাতাল গোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন কনসোর্টয়াম। ওই কনসোর্টিয়ামে ছিল আমেরিকার সংস্থা কোহ্লবার্গ ক্রেভিস রবার্টস (কেকেআর) ও সিঙ্গাপুরের সংস্থা টেমাসেক। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের অন্যতম মালিক গ্লেজ়ার্স এবং কোভিডের টিকা তৈরি করা সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার সিইও এবং পুনাওয়ালা ফিনকর্পের চেয়ারম্যান আদার পুনাওয়ালা প্রথম দিকে আরসিবি কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও পরে সরে যান। বরং আদিত্য বিড়লা গোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম শেষ দিকে এই লড়াইয়ে ঢোকে। রাজস্থান রয়্যালস কেনা সম্ভব হবে না বুঝতে পেতে সর্বশক্তি দিয়ে তারা আরসিবি কিনতে ঝাঁপায়। শেষ হাসি তারাই হাসে।
১৮ বছরে বেঙ্গালুরুর দাম বেড়েছে ১৬,১৩৯ কোটি টাকা। তার একটা প্রধান কারণ, দলের সমর্থন। বিরাট কোহলি ভারতীয় ক্রিকেটের পোস্টার বয়। তিনি প্রথম থেকে এই দলে খেলেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে বেঙ্গালুরুর জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা। সেই কারণ, এক ধাক্কায় এতটা দাম বেড়েছে তাদের। ২০০৮ সালে বেঙ্গালুরুর যা দাম ছিল তার থেকে এখন ১৪৯৫ শতাংশ বা ১৬ গুণ দাম বেড়েছে। আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি দলের মুকুট পরেছেন কোহলিরা।