দিয়েগো মারাদোনার আর্জেন্টিনা সেরা, না লিয়োনেল মেসির? কোনও দল একাধিক বার বিশ্বকাপ জিতলেই তুলনা চলে আসে। ভারত তিন বার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল, যা কোনও দলই হতে পারেনি। তুলনা আসছেই। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, রোহিত শর্মা না সূর্যকুমার যাদব? কোন অধিনায়কের বিশ্বজয়ী দল সেরা? প্রশ্নের উত্তর খুঁজল আনন্দবাজার ডট কম।
নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফাইনালে একপেশে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন সূর্যকুমারেরা। বলা ভাল, ভারতকে কোনও চ্যালেঞ্জই ছুড়ে দিতে পারেননি কিউয়িরা। এমন দাপুটে জয় ২০০৭ বা ২০২৪ সালের ফাইনালে আসেনি। আগের দু’বার পাকিস্তান এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সমানে সমানে লড়াই করেছিল। তা হলে কি সূর্যকুমারের দলই সেরা?
অপরাজিত নয় বিশ্বজয়ীরা
সূর্যকুমারের দল এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এ কথা যেমন ঠিক, তেমনই ঠিক, অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি তারা। সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছিল ভারত। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডও চাপে ফেলে দিয়েছিল এক সময়। চ্যাম্পিয়ন হলেও এই দলের বেশ কয়েকটি দুর্বলতা নজরে পড়েছে। যদিও টানা তিন বছর আইসিসির সাদা বলের তিনটি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ভারত।
ষষ্ঠ বোলারের অভাব
বিশ্বকাপের প্রায় সব ম্যাচেই ষষ্ঠ বোলারের অভাব ভুগিয়েছে ভারতকে। অর্শদীপ সিংহ, বরুণ চক্রবর্তী বা হার্দিক পাণ্ড্যদের একজন মার খেলেও উপযুক্ত বিকল্প কাউকে পাননি অধিনায়ক। শিবম দুবেকে দিয়ে কয়েকটি ম্যাচে বল করিয়েছেন। কিন্তু মুম্বইয়ের অলরাউন্ডারের বোলিং ক্লাবস্তরের থেকেও খারাপ। অভিষেক শর্মা, তিলক বর্মারা বল করতে পারলেও তা বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতার উপযুক্ত নয়। প্রধান বোলারদের ব্যর্থতা ঢাকতে পারেননি সূর্যকুমার। ভারতের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে সব দলই। বাড়তি বেশ কিছু রানও করেছে তারা। অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এমন হলে ভারতীয় দল কতগুলি ম্যাচে জিতত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
উদ্বেগজনক ফিল্ডিং
সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ছাড়া বিশ্বকাপের অন্য ম্যাচগুলিতে প্রত্যাশিত মানে পৌঁছোয়নি ভারতের ফিল্ডিং। বেশ কিছু সহজ ক্যাচ ফেলেছেন অভিষেক, হার্দিকেরা। গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়েও ভারতীয় ক্রিকেটারদের দুর্বলতা দেখা গিয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। বিশ্বজয়ী দলের ফিল্ডিংয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শক্তিশালী ব্যাটিং
বিশ্বজয়ী দলের দুর্বলতাগুলি নিয়ে এখন হয়তো খুব বেশি আলোচনা হবে না। তবে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে এগুলি নিয়ে কাটাছেঁড়া হতই। তা-ও এই দল শক্তিশালী। বিশেষ করে ব্যাটিংয়ে। দু’টি ম্যাচ ছাড়া ব্যর্থ অভিষেক। তাঁর অভাব বুঝতে দেননি দলের বাকি ব্যাটারেরা। শুভমন গিল, যশস্বী জয়সওয়াল, শ্রেয়স আয়ার, রুতুরাজ গায়কোয়াড়ের মতো ব্যাটারের জায়গাই হয়নি বিশ্বকাপের দলে। প্রতিযোগিতার শুরুতে বসিয়ে রাখা হয়েছিল ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট সঞ্জু স্যামসনকেও!
সূর্যকুমারের এই দল ব্যাট করেই হারাতে চায় প্রতিপক্ষদের। রবিবার খেলার পর গৌতম গম্ভীর বলেছেন, ‘‘আমরা অন্তত ২০০ রান করার লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নামি। তা করতে গিয়ে কোনও ম্যাচে ১০০-র কম রানে অল আউট হলেও সমস্যা নেই। আমরা আগ্রাসী ব্যাটিংই করব।’’ গম্ভীরের এই ক্রিকেট দর্শন মেনেই খেলছেন ভারতীয় ক্রিকেটারেরা। এ বারের বিশ্বকাপে ১০৬টি ছক্কা মেরেছে ভারত! প্রথম দল হিসাবে একটি বিশ্বকাপে ১০০-র বেশি ছয় মারার নজির গড়েছে। ব্যাটিংয়ের শক্তিতে সব দুর্বলতা ঢেকে ফেলতে চায়।
অনবদ্য জসপ্রীত বুমরাহ
ব্যাটিং সূর্যকুমারের দলের প্রধান শক্তি। তবু কঠিন সময় ভারতীয় শিবির তাকিয়ে থাকে বুমরাহের দিকে। তাঁর হাতে বল দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন অধিনায়ক। কিছু না কিছু হবেই। অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বুমরাহ আরও ‘আনপ্লেবল’ হয়ে যাচ্ছেন। সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে প্রথম বলেই উইকেট নিয়েছেন। অহমদাবাদে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারা ম্যাচে ১৫ রানে ৩ উইকেট নেন। নিজের ঘরের মাঠে ফাইনালে ১৫ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন বোলিং সম্ভবত তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাবড় বোলারদের টেস্টের পারফরম্যান্সকেও লজ্জায় ফেলে দিতে পারেন। ষষ্ঠ বোলারের অভাব ঢেকে দেন।
কঠিনতর লক্ষ্য
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া কঠিন। ভীষণ কঠিন। তার চেয়ে অনেক কঠিন খেতাব ধরে রাখা। সঙ্গে ঘরের মাঠে প্রত্যাশার বিপুল চাপ সামলাতে হলে তো কথাই নেই। ঠিক সেই কাজটাই সাফল্যের সঙ্গে করেছেন সূর্যকুমারের দলের সঞ্জু, বুমরাহ, ঈশান কিশন, অক্ষর পটেলেরা। ভারতীয় দলের গায়ে সেঁটে যাওয়া চোকার্স তকমাটা ছিঁড়ে দিয়েছিলেন বিরাট কোহলি-রোহিতে শর্মারা। খেতাব ধরে রাখার কঠিনতর কাজটা করেছে সূর্যকুমারের দল।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মহেন্দ্র সিংহ ধোনির দলকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল না
১৯ বছর আগে টি-টোয়েন্টি ঘরানা ভারতীয় ক্রিকেটে ম্লেচ্ছ ছিল। ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বোর্ড, ২০ ওভারের ক্রিকেট শুনলেই নাক সিঁটকাতেন। সে সময় ভারতীয় দলের নিউক্লিয়াস ছিলেন সচিন তেন্ডুলকর। সঙ্গে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, রাহুল দ্রাবিড়, অনিল কুম্বলের মতো ক্রিকেটার। তাঁরা কেউই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে চাননি। বীরেন্দ্র সহবাগও নন। ‘আনকোরা’ ধোনির নেতৃত্বে তরুণদের দল দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠিয়েছিল বিসিসিআই। ধোনির দলকে নিয়ে কোনও প্রত্যাশা ছিল না। ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে ধোনিদের বিশ্বজয়ই বদলে দিয়েছিল বোর্ড কর্তাদের ভাবনা। ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ।
প্রাক্তন জাতীয় নির্বাচক সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক এই কারণেই এগিয়ে রাখছেন ধোনির দলকে। তাঁর যুক্তি, ‘‘ওই সময় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট নিয়ে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। জনপ্রিয়তাও ছিল না। বিসিসিআইও সে বার বিশ্বকাপকে খুব গুরুত্ব দেয়নি। সিনিয়র ক্রিকেটারদের বাদ দিয়ে তরুণ, অনভিজ্ঞদের নিয়ে দল করা হয়েছিল ধোনির নেতৃত্বে। তা-ও সেই দল বিদেশের মাটিতে একাধিক শক্তিশালী দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তিনটে দলই বিশ্বকাপ জিতেছে। কৃতিত্ব কারও কম নয়। ক্রিকেটীয় যুক্তিতে ধোনির দলই এগিয়ে থাকবে।’’
২০০৭ বিশ্বজয়ী দলের সদস্য হরভজন সিংহও ‘বলব না, বলব না’ করেও নিজেদেরই এগিয়ে রেখেছেন। তিনটি প্রজন্মের দলের তুলনায় রাজি নন। তবু তিনি বলেছেন, ‘‘তিনটে সময়ের তিনটে দল। আলাদা আলাদা ক্রিকেটারেরা খেলেছে। সব কিছু মিশিয়ে দেওয়া যায় না। সূর্যকুমারের দলের সাফল্য দুর্দান্ত। ওরা একটা মান তৈরি করে দিল। দেখিয়ে দিল, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট কী ভাবে খেলা উচিত। কিন্তু ২০০৭ সালের দলের কোনও ধারণাই ছিল না ২০ ওভারের ক্রিকেট নিয়ে। দলটাও অনেক অনভিজ্ঞ ছিল। তখন ১৪০-১৫০ রান করেই জেতা যেত। এখন ২০০ রান তুলেও নিশ্চিত থাকা যায় না। খেলাটাই বদলে গিয়েছে। আমার কাছে আমাদের ২০০৭-এর দলটাই এগিয়ে থাকবে।’’
বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ও তিন দলের মধ্যে তুলনায় রাজি নন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সঙ্গে এখনকার খেলার কোনও মিল নেই। সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। পার্থক্য বলতে, তখন ২০ ওভারের ক্রিকেট সম্পর্কে ধারণা ছিল না। খুব বেশি খেলা হত না। এখনকার ক্রিকেটারেরা অনেক বেশি তৈরি। সারা বছর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলে। তিনটে দলই বিশ্বকাপ জিতেছে। তবে, ২০০৭ সালের দলে জসপ্রীত বুমরাহের মতো বোলার ছিল না।’’
২০০৭-এর সাফল্য বদলে দেয় ভারতের ক্রিকেট
১৯৮৩ সালে কপিল দেব, সুনীল গাওস্করদের বিশ্বকাপ জয়ের ২৪ বছর পর আর একটা বিশ্বকাপ ট্রফি নতুন উন্মাদনা তৈরি করেছিল ক্রিকেটমহলে। ধোনির দলের সাফল্য টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যবসায়িক সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে আসে। পরের বছর, ২০০৮ সাল থেকেই শুরু হয় আইপিএল। টাকা ঢুকতে শুরু করে বোর্ডের তহবিলে। সেই সূত্রে বোর্ডের প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থায় (আইসিসি)। প্রভাব বাড়লেও আন্তর্জাতিক স্তরে বড় সাফল্য আসছিল না। ২০১১ সালে ধোনির দলের এক দিনের বিশ্বকাপ জয়ের পর টানা ব্যর্থতা। ভারতীয় ক্রিকেটের মুনাফা, প্রভাব ক্রমশ বাড়লেও মন ভরছিল না ক্রিকেটপ্রেমীদের। ২০২৩ সালে এক দিনের বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও হার। ক্রিকেটারদের একের পর ব্যর্থতা ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল।
কোহলি-রোহিতদের ভারত
ততদিন ভারতীয় দলে শুরু হয়েছে কোহলি, রোহিত, রবীন্দ্র জাডেজা, জসপ্রীত বুমরাহদের যুগ। সকলেই বিশ্বক্রিকেটে বড় নাম। প্রত্যাশাও প্রচুর। তা-ও বিশ্বস্তরে সাফল্য ছিল অধরা। চাপে ডুবে থাকা কোহলি-রোহিতেরা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এনে দেন ২০২৪ সালে। বার বার সমালোচিত হওয়া একটা দলের পক্ষে কাজটা সহজ ছিল না। ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর পর কোহলি-রোহিতদের আবেগ বুঝিয়ে দিয়েছিল, ঠিক কতটা চাপে ছিলেন তাঁরা।
ধোনির দলের থেকে রোহিতের দলকে নিয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল। সূর্যকুমারের দলের ক্ষেত্রে তা উচ্চতর হয়েছে।