Advertisement
০২ ডিসেম্বর ২০২২
Umran Malik

Umran Malik: পাঁচ উইকেট নিয়েও হার, তবু ঋদ্ধিদের বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়া উমরানই মাতালেন ওয়াংখেড়ে

নিয়মিত দেড়শোয় গতিতে বল করা উমরান আইপিএল গ্রহে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি যে কৃপণ বোলিং করে উইকেটও নিতে পারেন, সেটাও বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

ঋদ্ধিকে আউট করে উমরান

ঋদ্ধিকে আউট করে উমরান ছবি আইপিএল

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২২ ২৩:৫০
Share: Save:

দিন কয়েক আগে পঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে আইপিএলের ম্যাচে চার উইকেট নিয়েছিলেন। বুধবার সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন উমরান মালিক। জম্মু এবং কাশ্মীরের জোরে বোলার গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধে পাঁচ উইকেট নিলেন। আইপিএলে এটাই তাঁর প্রথম পাঁচ উইকেট। এ বারের প্রতিযোগিতায় যুজবেন্দ্র চহালের পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে এই কীর্তি গড়লেন। তবে দিনের শেষে হাসি বজায় থাকল না তাঁর। গুজরাতের কাছে পাঁচ উইকেটে হেরে গেল হায়দরাবাদ।

নিয়মিত দেড়শোর উপর গতিতে বল করা উমরান ইতিমধ্যেই আইপিএল গ্রহে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি যে কৃপণ বোলিং করে উইকেটও নিতে পারেন, সেটাও প্রতি ম্যাচে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এ দিন চার ওভার বল করে ২৫ রানে পাঁচ উইকেট নিলেন। চহালের থেকেও ভাল বোলিং পারফরম্যান্স। সাধেই কি আর তাঁকে ভারতের হয়ে খেলানোর দাবি উঠছে বারবার!

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মাইকেল ভন বলেন, “সময় নষ্ট না করে এখনই উমরানকে ভারতীয় দলে নেওয়া উচিত। যে কোনও উইকেটে ও গতিতেই শেষ করে দেবে ব্যাটারদের।” একই কথা বলেছেন সুনীল গাওস্করও। তাঁর কথায়, “উমরানকে দেখে খুব ভাল লাগছে। শুধু ওর বলের গতি নয়, নিয়ন্ত্রণ আমাকে অবাক করেছে। অনেক বোলার রয়েছে যারা খুব জোরে বল করতে পারে। কিন্তু তাদের বলে নিয়ন্ত্রণ নেই।”

Advertisement

হায়দরাবাদের বোলারের জন্য একটিই পরামর্শ দিয়েছেন গাওস্কর। বলেছেন, “উমরান যদি ওর ওয়াইড বল করার প্রবণতা একটু কমাতে পারে তা হলে ও সাংঘাতিক বোলার হয়ে উঠবে। কারণ সে ক্ষেত্রে ও উইকেট লক্ষ্য করে বল করবে। যদি ও উইকেট লক্ষ্য করে ওই গতিবেগে বল করে, তা হলে উমরানকে খেলা সহজ হবে না। উমরান ভারতের হয়ে খেলবেই।”

ক্রিকেটবিশ্বও এত দিনে স্তম্ভিত উমরানের গতিতে। প্রাক্তন ক্যারিবিয়ান পেসার ইয়ান বিশপ যেমন ভারতীয় পেসারের মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন ইংল্যান্ড পেসার জফ্রা আর্চারের ছায়া। কিছুদিন আগে সম্প্রচারকারী চ্যানেলে তিনি বলেছেন, “গত বছর উমরানের গতি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এ বার ও আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। ডেল স্টেনের সাহচর্যে আরও পরিণত হয়ে উঠলে বিশ্বের যে কোনও ব্যাটার উমরানের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে আতঙ্কে ভুগবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এ ভাবেই কিন্তু বিশ্বক্রিকেটে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল জফ্রা আর্চার। আমি উমরানের মধ্যে জফ্রার সেই ভয়ঙ্কর রূপটা দেখতে পাচ্ছি।”

যাঁর সাহচর্যে উমরান বেড়ে উঠেছেন, সেই ডেল স্টেনও মুগ্ধ। সম্প্রতি তিনি বলেন, “উমরানকে আমার পরামর্শ, কখনওই বলের গতি কমিয়ো না। ১৩০-১৩৫ কিলোমিটার গতিতে তো যে কেউ বল করতে পারে। উমরান আমার কাছেও প্রেরণা।” পাশাপাশি উমরানকে অবশ্য আরও একটা কথা বলেছেন স্টেন — “এই গতির সঙ্গে কিছুটা বৈচিত্র মিশলে অনেক দূর যাবে উমরান।”

Advertisement

ভারতের জোরে বোলারদের মধ্যে উমরানের বলের গতি এখন সর্বোচ্চ। তাঁর এই উত্থানকে এক কথায় বলা যেতে পারে, গলি থেকে রাজপথ। গতির উড়ানে চড়েই গলি ক্রিকেট থেকে আইপিএলের ঝকঝকে মঞ্চে উমরান। শ্রীনগরে জন্ম হলেও উমরানরা থাকেন জম্মুতে। আইপিএলে উমরানের সাফল্যের পর তাঁর ক্রিকেট জীবন কোন খাতে বইবে, তা অজানা। উমরানের বাবা ফল-সবজি বিক্রেতা। কিন্তু এখনই খ্যাতনামী। উমরানের বাবা আবদুল রশিদ বলেছেন, “এখন আর আমার কাছে কেউ অতিরিক্ত লঙ্কা বা ধনে পাতা চায় না। সবজির দাম নিয়েও কেউ আর আগের মতো দরাদরি করে না।” আসলে আইপিএলে ছেলের পারফরম্যান্স এখন মহল্লায় তাঁরও দর বাড়িয়ে দিয়েছে।

২০২১ সালের আইপিএলে উমরান হায়দরাবাদের নেট বোলার ছিলেন। নটরাজন করোনা আক্রান্ত হওয়ায় উমরান সুযোগ পান মূল দলে। সে বারও বল হাতে গতির ঝড় তুলেছিলেন ২২ বছরের তরুণ। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের বিরুদ্ধে ১৫২.৯৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে বল করেছিলেন। যা ছিল প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় দ্রুততম বল। তাঁর বোলিংয়ের প্রশংসা করেছিলেন বিরাট কোহলীও। উমরানের মতো প্রতিভাকে আগলে রাখার কথা বলেছিলেন কোহলী। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নেট বোলার হিসেবে ভারতীয় দলের সঙ্গে ছিলেন উমরান।

জম্মুর গুজ্জর নগরের শাহিদি চকে ফল-সবজির দোকান আবদুল রশিদের। সেটি এখন উমরানের বাবার দোকান বলে বিখ্যাত। আইপিএলে ছেলের সাফল্যে খুশি রশিদও। তিনি বলেছেন, “এই দোকান থেকে আমি সংসার চালাই। এখন আমার ছেলের নাম দেশের ঘরে ঘরে সকলে জানেন। কিন্তু তার জন্য আমি কাজ থামাতে রাজি নই। দোকান করে যাব।” তিনি মনে করেন উমরান এখন আর শুধু তাঁর ছেলে নয়। গোটা দেশের প্রিয় পাত্র। বলেছেন, “ও এখন ভারতের সন্তান। ঈশ্বর চাইলে এক দিন দেশের নামও উজ্জ্বল করবে।”

গোটা দেশ চমকে গেলেও তাঁর প্রথম কোচ রণধীর সিংহ মানহাসের দাবি, আরও বেশি গতিতে বল করতে পারেন উমরান। রণধীর বলেছেন, “মাত্র পাঁচ বছর আগে ডিউস বলে বল করতে শুরু করেছে উমরান। নিজের চেষ্টাতেই ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করছে। এটা ওরই কৃতিত্ব।” জম্মুর মৌলানা আজাদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দেন রণধীরের বন্ধু আবদুল সামাদ। প্রতিভা দেখে সামাদের কাছে উমরানকে পাঠান রণধীর। টেনিস বলের ক্রিকেটার উমরানের বোলিং দেখে ভাল লাগে তাঁরও।

রণধীর বলেছেন, “শুরুতে অনুশীলনে মন দিত না উমরান। এক সপ্তাহ আসার পর তিন-চার দিন বেপাত্তা হয়ে যেত। এটার জন্য ওকে দোষ দেওয়া যায় না। কারণ নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে ওর কোনও ধারণাই ছিল না। এক দিন ডেকে বললাম, উমরান তুমি কিন্তু ভারতের হয়ে খেলতে পার। ১০-১৫ সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর হাসতে শুরু করল। উত্তরে বলল, ‘স্যর আপনি কি সত্যি বলছেন?’ ওর দিকে একটু কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘আমরা সঙ্গে কখনও এ ভাবে কথা বলবে না।’ সে দিনের পর থেকে আর কখনও অনুশীলনে কামাই করেনি।”

উমরান যখন অনূর্ধ্ব ১৯ জম্মু-কাশ্মীর দলের ট্রায়ালে যোগ দেন, সে সময় তাঁর জুতো পর্যন্ত ছিল না। বিনু মাঁকড় প্রতিযোগিতায় একটি ম্যাচে খেলার সুযোগ পান। কিন্তু সেই ম্যাচ বৃষ্টিতে বাতিল হয়ে যায়। পরের বছর অনূর্ধ্ব ২৩ দলের ট্রায়ালে যোগ দিলেও সুযোগ মেলেনি। ২০১৯-২০ মরসুমে জম্মু-কাশ্মীরের রঞ্জি দলের নেট বোলার ছিলেন উমরান। কিন্তু তৎকালীন কোচ অজয় রাতরা মাত্র চারটি বল করার পর উমরানকে আর বল করতে দেননি। তিনি মনে করেছিলেন উমরানের বলে দলের যে কোনও ব্যাটার আহত হতে পারেন। কিন্তু ওই চার বলেই ভারতীয় দলের প্রাক্তন উইকেটরক্ষক উমরানের জাত চিনে নিয়েছিলেন। উপত্যকার ক্রিকেট কর্তাদের সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, এমন এক জন বোলারকে বাদ দিয়ে কী ভাবে আপনারা রঞ্জি দল গঠন করলেন?

রাতরা বলেছেন, “নেটে উমরানের বল দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। আরও বিস্মিত হয়েছিলাম রঞ্জি দলে ওকে না দেখে। পাটা উইকেট থেকেও অবিশ্বাস্য বাউন্স পাচ্ছিল।” এর পর দলের অধিনায়ক, সাপোর্ট স্টাফ এবং নির্বাচকদের সঙ্গে কথা বলে মূল দলে উমরানকে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন রাতরা।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.