Advertisement
E-Paper

রিয়ালের রোনাল্ডো ফিরলেন, ছেষট্টির ইউসেবিও নন

মাঠের জায়ান্ট স্ক্রিনটায় দেখাল, ম্যান অব দ্য ম্যাচ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো...মাঝমাঠে খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ‘সেভেন’ তখন ড্রেসিংরুমের দিকে পা বাড়িয়েছেন। দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ছোট একটা হাততালি দিলেন। তার পর মিলিয়ে গেলেন ওই টানেলে।

অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০১৪ ০৩:১৯
ক্ষমা করো...। ব্রাসিলিয়ায় ছবি উৎপল সরকারের।

ক্ষমা করো...। ব্রাসিলিয়ায় ছবি উৎপল সরকারের।

মাঠের জায়ান্ট স্ক্রিনটায় দেখাল, ম্যান অব দ্য ম্যাচ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো...মাঝমাঠে খানিকক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ‘সেভেন’ তখন ড্রেসিংরুমের দিকে পা বাড়িয়েছেন। দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ছোট একটা হাততালি দিলেন। তার পর মিলিয়ে গেলেন ওই টানেলে।

কী বলবেন এই চলে যাওয়াকে? মহাপ্রস্থান? লোকটার নাম যখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো আর তাঁর বিদায়ের রাস্তা তখন নিশ্চয়ই মহাপ্রস্থান বলতেই হবে। কিন্তু এই রাস্তা কোথায় নিয়ে ফেলবে সিআর সেভেনকে? যেখানেই পৌঁছোন, সেখানে নিশ্চয়ই ফুটবলের কিংবদন্তিরা বাস করেন না। ইতিহাস সেখানে লাইফটাইম মেম্বারশিপও দেয় না ছবিকে অতি যত্নে ফ্রেমবন্দি করে। জীবিতকালে তাঁর সঙ্গে রোনাল্ডোর ক্রমাগত তুলনায় বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন ইউসেবিও। কোথাও বসে তিনি নিশ্চয়ই আজ প্রশ্ন করছেন, ‘ভাই, বিশ্বকাপে তুমি নিজের দেশকে শেষ অবধি কী দিতে পারলে?’

অথচ ইউসেবিও হওয়ার সব উপকরণগুলো হাতের কাছে মজুদ ছিল। গোল সংখ্যা দিয়ে এই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হবে না, রোনাল্ডো কি নিজে জানতেন না? ইউসেবিওকে যখন গোল সংখ্যায় পেরিয়ে গিয়েছিলেন দেশের মিডিয়া দাঁড়িপাল্লায় বসিয়েছিল তাঁকে আর ইউসেবিওকে, প্রথম প্রতিবাদ করেন লুই ফিগো। বলেছিলেন, “একটা লোক ষাটটা ম্যাচে চল্লিশটা গোল করেছিল দেশের হয়ে। আর একটা লোক আজারইবাইজান, লিচেনস্টেইনের বিরুদ্ধে একশোর বেশি ম্যাচে তাকে পেরিয়ে গেল। এটা কোনও তুলনা হয় না।” যতই রিয়াল মাদ্রিদকে তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ দিন, যতই ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ট্রফি নিয়ে দাঁড়ান, শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে পিছনে ফেলার দিনটা ছিল আজই।

কিন্তু রোনাল্ডোর প্রতিভা, প্রভাবকে অস্বীকার করবেন কী করে? কোয়ালিফাইং প্লে অফের সেকেন্ড রাউন্ডের ম্যাচটা মনে আছে? ইব্রাহিমোভিচ সুইডেনকে দু’গোলে এগিয়ে দেওয়ার পর কী ভুল করে দু’টো আঙুল দিয়ে নিজের দু’টো চোখ দেখিয়েছিলেন রোনাল্ডোকে। কেমন দিলাম টাইপের আওয়াজ আর কী! ম্যাচ শেষ হয়েছিল পর্তুগাল ৩: সুইডেন ২। রোনাল্ডোর হ্যাটট্রিক। পর্তুগাল বিশ্বকাপের মূলপর্বে। আসলে অহংবোধে আঘাত লাগলে রোনাল্ডোরা মারাত্মক। কিন্তু নিজের দেশ বিশ্বকাপের মূলপর্ব থেকে ছিটকে যাচ্ছে, নিজের বিশ্বকাপের স্কোরশিট শূন্য, মাঠে তাঁর অদৃশ্য দুই প্রতিপক্ষের স্কোরশিটেই চারটে করে গোল লেখা। এ সব কিছুও কি কোনও ভাবে অহংবোধে আঘাত করল না?

কাল এখানে বম্বেইরো ১৯৩-র মাঠে পর্তুগাল অনুশীলনে গিয়ে দেখেছিলাম, কী অদ্ভুত চাপহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রোনাল্ডো। চুলের নতুন স্টাইল করেছেন। প্র্যাকটিসে ঢুকলেন সবার পর। যেন কোথাও একটা বুঝিয়ে দেওয়া যতই তোমরা দেশের আবেগে ভিজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করো, ব্র্যান্ড রোনাল্ডোর একবিন্দু যায় আসে না। রিয়াল মাদ্রিদ মাথায় করে রাখবে। দুনিয়ার ভক্তকুলের একজনও কমে যাবে না। এনডোর্সমেন্টের বাজার এক শতাংশও কমবে না। আবার এই লোকটাকেই আজ মাঠের জায়ান্টস্ক্রিনে দেখলাম, ম্যাচের আগে টানেলে দাঁড়িয়ে ঠোঁট চাটছেন। মুখে মলিন হাসি। বোধহয় বুঝতে পারছিলেন, এটা জীবনের শেষ সুযোগ। এই মঞ্চ তাই আলাদা। কে জানে কোন রোনাল্ডোটা আসল।

ম্যাচের প্রথম ৩৫ মিনিট দেখে মনে হচ্ছিল যাঁকে চোখের সামনে দেখছি, তিনিই আসল। প্রথম থেকেই যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন কেন সিআর সেভেনকে মাথায় তুলে রাখে রিয়াল। কেন ইউরোপের ক্লাবগুলোর ডিফেন্ডাররা তাঁর নামে বিনিদ্র রাত কাটায়। ম্যাচের পাঁচ মিনিটেই দুরন্ত একটা ভলি ক্রসপিসে লেগে ফিরে এল। কুড়ি মিনিটের মধ্যে আবার একটা হেড, যেটা বাঁচিয়ে দিলেন ঘানা গোলকিপার। মরিয়া ভাবটা যেন গোটা মাঠে ফুটে উঠছিল। কখনও নিজের বক্সের সামনে গিয়ে ট্যাকল করছেন, পরমুহূর্তেই ঘানা বক্সে গিয়ে চকিত শট মেরে আসছেন। ৩১ মিনিটে ঘানা একটা আত্মঘাতী গোল করে বসল। জাল থেকে বল কুড়িয়ে সেন্টার লাইনের দিকে ছুটতে দেখলাম রোনাল্ডোকে। ছেষট্টির ভিডিও দেখবেন, উত্তর কোরিয়া ম্যাচেও এ ভাবেই জাল থেকে বল কুড়িয়ে সেন্টার লাইনের দিকে এ ভাবেই ছুটেছিলেন ইউসেবিও। কিন্তু সেই দলটায় ইউসেবিওর পাশে ছিলেন তোরেস, অগাস্তোর মতো ফুটবলাররা। এই পর্তুগালে মুটিনহো, এডের। রোনাল্ডোর কাছাকাছি তো নয়ই। এমনকী নুনো গোমস, ডেকোরাও এঁদের তুলনায় অনেক ভাল মানের ফুটবলার ছিলেন। বিরতির কিছু আগেই ঘানার গোলশোধ আর তার কিছু পরেই ম্যাচের সেরা সিটারটা মিস করলেন আইয়ু। এই গোলটা হয়ে গেলে হয়তো কোনও ম্যাচ না জিতেই ফিরতে হত রোনাল্ডোকে। কিন্তু ফুটবল-ঈশ্বর বোধহয় অতটা নির্দয় নন। যদিও লাভ কিছু হল না। একদিন পরে ব্রাজিলের মাঠে যে ষোলোটা দল পরের রাউন্ডে নামবে, তার মধ্যে সিআর সেভেনের দল নেই।

ঘানার গোলটার সঙ্গে সঙ্গেই খবর এল, মুলারের গোলে জার্মানি এগিয়ে। মিডিয়া ট্রিবিউনে প্রায় সবাই চ্যানেল ঘুরিয়ে জার্মানি ম্যাচের রেজাল্ট দেখতে চাইছিলেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। গোল পার্থক্যটা ধরাছোঁয়ার বাইরে হয়ে গিয়েছে। রোনাল্ডোর মধ্যেও যেন সেই মরিয়া ভাবটা উধাও। তবু খেলা শেষ হওয়ার আগে পর্তুগালকে জয়ের গোল এনে দিলেন বাঁ পায়ের একটা জোরালো জ্যাবে।

আবার ফিরবেন বিশ্বকাপে। চার বছর পর?

কে জানে! যে ভাবে দ্রুত ঢুকে গেলেন ড্রেসিংরুমে মনে হল যেন, প্রশ্নটার মুখেই পড়তে চান না। নাকি লুকিয়ে ফেলতে চান অনেক কিছু। চোখের জল?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy