১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন বাংলার জনমানসকে আবেগমথিত করেছিল, শহিদের শোণিতে রক্তাক্ত হয়েছিল বাংলার মাটি। ভাষা প্রেমিকদের সেই রক্তদান বিফল হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলা ভাষা সেখানে স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা। শহিদের রক্তে রাঙা ভাষা আন্দোলন আজও দুই বাংলার মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ স্মরণে ধ্বনিত হয় সেই অমর সঙ্গীত:

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি’?

আমরা ভুলিনি। যেমন ভুলিনি অসমের বরাক উপত্যকায় সংগঠিত বাংলাভাষী মানুষের ভাষা আন্দোলন। ১৯৬১ সালের ১৯ মে এই ভাষা আন্দোলনে ১১ জন শহিদ হন। ফলে, অসম সরকার ১৯৬০ সালের ভাষা আইন সংশোধন করে ১৯৬১ সালে বরাকের জন্য বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তাই আজও বরাকে সরকারি কার্যালয়ে বাংলার ব্যবহার আইনসম্মত।

ভাষা আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে যে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তার ফলে পৃথিবীর বুকে এক নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি হল—বাংলাদেশ। পৃথিবীর ইতিহাসে এর তুলনা নেই।

বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষার মর্যাদা স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হল। বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষাগুলির মধ্যে বাংলাও আজ স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ভাবলে শিহরিত হই, এ গৌরবের আমরাও অংশীদার।

কিন্তু রাঢ় বাংলার বাংলাভাষী মানুষ হিসেবে একটি বেদনাবোধ আজও আমাদের পীড়া দেয়। পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের চার দশক আগে ১৯১২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মানভূমে সংগঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলনের কথা কি আমরা তেমন ভাবে স্মরণে রেখেছি?

সে আন্দোলন কতটা দুর্বার ছিল, কতটা সংকল্পদীপ্ত ছিল, তা বোঝা যাবে ‘মুক্তি’ পত্রিকার পুরনো হলুদ হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠাগুলি উল্টালে। বোঝা যাবে আঞ্চলিক ইতিহাসের অনুসন্ধানে ব্রতী গবেষকদের প্রবন্ধগুলি পাঠ করলে।

১৯৩১ এর আগে আদমসুমারি অনুযায়ী, মানভূমের সদর মহকুমার শতকরা ৮৭ জন বাংলাভাষী। এই অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলা ভাষার নাড়ির যোগ। অথচ, ১৯৫৬ সালের আগে পুরুলিয়া ছিল বিহারের অন্তর্ভুক্ত। বিহারে রাজনৈতিক ভাবে স্কুল-কলেজ-সরকারি দফতরে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গর্জে ওঠেন মানভূমের বাঙালিরা। হিন্দিভাষীদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানভূমের অনেক বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা এআইসিসি (অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি)-তে প্রতিবাদ জানিয়েও প্রতিকার পেলেন না। বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় অবশেষে তাঁরা জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী আঞ্চলিক দল ‘লোকসেবক সঙ্ঘ’ গড়ে তোলেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে এটাই ছিল তাঁদের সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ এই আন্দোলন ছিল তীব্র ও বেগবান। পুরুলিয়া কোর্টের আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার, শরৎচন্দ্র সেন এবং গুণেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন এই আন্দোলনের কর্ণধার।

শুরু হল সংসদের ভিতরে ও বাইরে তুমুল সংগ্রাম। সে দিন লোকসভার ভিতরে নজিরবিহীন লড়াই করে মানভূমের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে ঝ়ড় তুলেছিলেন যে সব বাগ্মী সাংসদ তাঁদের মধ্যে নির্মলকুমার চট্টোপাধ্যায় (‌সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা), কমলকুমার বসু, তুষার চট্টোপাধ্যায়, হীরেন মুখোপাধ্যায়, মোহিত মৈত্র, চৈতন মাঝি, ভজহরি মাহাতো অন্যতম। সংসদের বাইরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দল, জনগণ ও বিদ্বজ্জন এগিয়ে আসেন সমর্থনে।

শুরু হয় টুসু সত্যাগ্রহ।

মানভূমকে ভালবেসে অনেকে বলেন গান-ভূম। খেত খামারের কাজ থেকে প্রেম, সবই ধরা পড়ে টুসু, ঝুমুর কিংবা ভাদু গানের সুরে। প্রতিবাদের ভাষাও ফুটে ওঠে গানে। সেরকমই একটি টুসু গানের অন্তিম চারটি চরণ:

‘বাংলা ভাষার পদবিতে

কোন ভেদের কথা নাই।

এক ভারতে ভাইয়ে ভাইয়ে

মাতৃভাষার রাজ্য চাই’।

ভাষা আন্দোলনের টুসু গান হয়ে উঠেছিল শানিত। সত্যাগ্রহীদের বিহার সরকার কারাগারে পাঠায়। লোকসেবক সঙ্ঘের কর্ণধার অতুলচন্দ্র ঘোষ, তাঁর স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, সাংসদ ভজহরি মাহাতো, অরুণচন্দ্র ঘোষ, অশোক চৌধুরী প্রমুখদের কারাগারে অন্তরীণ করা হয়। বহু সত্যাগ্রহী, এমনকী, শিশু-নারীরাও ছিল দমন-পীড়নের শিকার। হাজার অত্যাচারেও কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি।

১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল। শুরু হয় পুরুলিয়ার পুঞ্চা থানার পাকবিড়রা গ্রাম থেকে ঐতিহাসিক পদযাত্রা। লাবণ্যপ্রভা দেবী ও অতুলচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে সহস্রাধিক মানুষ সামিল হন এই পদযাত্রায়। পাকবিড়রা থেকে কলকাতা দীর্ঘ ৩০০ কিলোমিটার পথে কত গ্রাম, কত গঞ্জ, কত জনপদ। অভ্যর্থনার জন্য মোড়ে মোড়ে কত তোরণ। জনতা সত্যাগ্রহীদের সংবর্ধিত করছেন পুষ্পস্তবক দিয়ে। সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ আবেগরঞ্জিত সঙ্গীত। মাতৃভাষার প্রতি ওই ভালবাসা, ওই নাড়িছেঁড়া টান আজও স্মরণে আছে বহু প্রবীণের। ১৯৫৬ এর ৬ মে ওই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা কলকাতায় পৌঁছয়।

১ নভেম্বর ১৯৫৬। সৃষ্টি হল পুরুলিয়া জেলা। পুরুলিয়ার বাংলায় অন্তর্ভুক্তি বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জয়। অথচ, আমাদের অবহেলায় এই ইতিহাস বিস্মৃতির পথে। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রপুঞ্জ বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমরা এই দিনটি পালন করি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায়, কবিতায়, নাটকে, ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে। যে আনন্দ-সমারোহে, ভাষা প্রেমের মথিত আবেগে ২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণ করি, ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, সেই আমরাই কেন ভুলে যাই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামীদের কথা?

 

তথ্যঋণ: শান্তি সিংহ, দিলীপকুমার গোস্বামী

লেখক কবি ও ইসিএল-এর প্রাক্তন কর্মী