কৃষক-বিক্ষোভের মুখে পড়লেন রাজ্যের মন্ত্রী গৌতম দেব। শুক্রবার জলপাইগুড়ির গজলডোবায় জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা কাটাতে বৈঠক করতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়েন পর্যটন মন্ত্রী। গজলডোবা তিস্তা সেচ খালের পাশে হাওয়া মহলে বিক্ষোভকারী কৃষকরা কালো পতাকাও দেখান তাঁকে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপির কর্মী সমর্থকরাই কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে। পুলিশের দাবি, ওই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়েছে বিজেপি।

গজলডোবায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রকল্প ‘ভোরের আলো’ (পর্যটন হাব) গড়ার জন্য ইতিমধ্যেই ২১০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে রাজ্য সরকার। সম্প্রতি পর্যটন দফতর গজলডোবা থেকে কিছুটা দূরে বোদাগঞ্জের মিলনপল্লিতে ভোরের আলো প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত একটি হেলিপ্যাড, আবাসন এবং সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের জন্য আরও ২৫ একর জমি অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনা করে। তারা রাজগঞ্জ ব্লকে জঙ্গল মহল মৌজার ৩৭-৩৮ নম্বর দাগে জমি অধিগ্রহণের জন্য গত সপ্তাহে মাপজোক শুরু করে। তার পর গত সোমবার অধিগ্রহণের একটি বোর্ডও লাগিয়ে দেওয়া হয় সেখানে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়ে কৃষক অসন্তোষ। কৃষকদের অভিযোগ, ‘‘জমিতে ফসল রয়েছে আমাদের। বাদাম, কচু সব মাঠেই। অথচ পুলিশ আমাদের মাঠে যেতে দিচ্ছে না। ফসল মাঠে নষ্ট হচ্ছে। মাঠে যেতে গেলে পুলিশ আমাদের হুমকি দিচ্ছে, গ্রেফতার করবে।’’

কৃষকদের দাবি, বাম আমলে ওই জমির পাট্টা তাঁদের দেওয়া হয়েছে। অথচ সরকার তাঁদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে জমি অধিগ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার কৃষকরা অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ওই বোর্ড উপড়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের জানানো হয়, পর্যটন মন্ত্রী এবং জেলাশাসক তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। মিলনপল্লির কৃষকদের দাবি, স্থানীয় থানা থেকে জানানো হয়েছিল, বৃহস্পতিবার মন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কিন্তু কৃষকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সরকার চিঠি দিয়ে না ডাকলে তাঁরা বৈঠকে যাবেন না।

আরও পড়ুন: কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত জারি, মোদীর ডাকা নীতি আয়োগ বৈঠকে যাচ্ছেন না মমতা​

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বৃহস্পতিবার মন্ত্রী গৌতম দেব আসেননি। তিনি শুক্রবার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। কিন্তু আন্দোলনকারী কৃষকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, যত ক্ষণ না সরকার চিঠি দিয়ে ডাকছে তত ক্ষণ তাঁরা কোনও আলোচনায় অংশ নেবেন না। ওই সময় কৃষকরা তিস্তা সেচ খালের পাশে হাওয়া মহলে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। সেই সময় গৌতম দেবের কনভয় ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি কৃষকদের দেখে গাড়ি থামিয়ে কথা বলতে গেলে কৃষকরা ‘গৌতম দেব গো ব্যাক’, ‘দালাল’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁকে কালো পতাকা দেখান আন্দোলনকারী কয়েকশো কৃষক। এর পর মন্ত্রী সেখান থেকে সোজা চলে যান ‘ভোরের আলো’তে।

দেখা গিয়েছে এমন প্ল্যাকার্ডও।—নিজস্ব চিত্র।

গোটা ঘটনার পিছনে বিজেপির হাত রয়েছে বলে শাসক দল তৃণমূলের দাবি। তবে বিজেপির কৃষক মোর্চার রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অরুণ মণ্ডল বলেন, ‘‘আমরা কৃষকদের এই আন্দোলনে পাশে দাঁড়িয়েছি। কারণ, রাজ্য সরকার কৃষকদের ঠকিয়ে তাঁদের জমি নেওয়ার চেষ্টা করছে।” এ দিন অরুণ মণ্ডল-সহ আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, ‘‘সরকার এখানে দু’টি দাগ নম্বরে ৫৫০ একর এবং ২০০ একর, সব মিলিয়ে ৭৫০ একর জমি চিহ্নিত করে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরি করেছে। এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করবেন না। অথচ ঘুরপথে সেটাই তিনি করছেন। কারণ ওই ৭৫০ একর জমির পুরোটাই পাট্টা জমি। সেখানে বাম আমলে কৃষকরা পাট্টা পেয়েছেন। তাঁদের সেই চাষের জমি কেড়ে পর্যায় ক্রমে কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার।”

আরও পড়ুন: সারদার লাল ডায়েরি, পেনড্রাইভ কোথায়? ফের সিবিআইয়ের মুখোমুখি রাজীব কুমার​

কৃষকদের অভিযোগ, পাট্টা প্রাপ্ত কৃষক থেকে শুরু করে স্থানীয় পঞ্চায়েত সবাইকে অন্ধকারে রেখে ওই জমি অধিগ্রহণ করার চেষ্টা করছে সরকার। গজলডোবা মিলনপল্লি ভূমি রক্ষা কমিটি-র চেয়ারম্যান নকুল দাস পরিষ্কার বলেন, ‘‘আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব। কোনও ভাবে সরকারের চাপের কাছে মাথা নোয়াব না। আমাদের পাট্টা পাওয়া জমি কোনও ভাবেই অধিগ্রহন করতে দেব না।” তিনি বলেন, ‘‘আজ বৈঠক করে ঠিক করেছি, আমরা মাঠে যাব। পুলিশ বাধা দিলে তা প্রতিরোধ করব। ওই জমিতে চাষ করা আমাদের অধিকার।”

(পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার খবর এবং বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলায় খবর পেতে চোখ রাখুন আমাদের রাজ্য বিভাগে।)