বাড়ির সামনে পাড়ার ক্লাবের সরস্বতী পুজোর অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখানেই শনিবার রাতে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ছোড়া গুলিতে খুন হয়ে গেলেন নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস (৪২)। জেলার যুব তৃণমূল সভাপতিও ছিলেন তিনি।

হাঁসখালির ফুলবাড়ি এলাকায় পুজোর অনুষ্ঠান চলাকালীন যে ভাবে এ দিন দর্শকাসনে বসে থাকা বিধায়কের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি চালানো হয়, তাতে উপস্থিত জনতা কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিহ্বল হয়ে যায়। পরক্ষণেই সকলে সত্যজিৎবাবুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেই ফাঁকে খুনি পালায়। সত্যজিৎবাবুকে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। সত্যজিতের স্ত্রী এবং দেড় বছরের পুত্র বর্তমান।

আততায়ীকে এখনও চিহ্নিত করা না-গেলেও তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, বিজেপিই সত্যজিৎবাবুকে খুন করিয়েছে। বিশেষ করে এর পিছনে বিজেপি নেতা, প্রাক্তন তৃণমূল মুকুল রায়ের হাত রয়েছে বলে তাঁদের সন্দেহ। মুকুল অভিযোগ অস্বীকার করে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের দিকে আঙুল তুলেছেন।

আরও পড়ুন: ‘হঠাৎ করে গুলির শব্দ, কিছু বোঝার আগেই দেখি রক্তে ভেসে যাচ্ছে’

তৃণমূল ও পুলিশ সূত্রের খবর, এ দিন সত্যজিৎবাবুর বাড়ির উল্টো দিকে একটি ক্লাবের পুজোর উদ্বোধন ছিল। এই দিনই সত্যজিৎবাবু দেহরক্ষীকে ছুটি দিয়েছিলেন। রাজ্যের মন্ত্রী তথা চাকদহের বিধায়ক রত্না ঘোষ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, উদ্বোধনের পর তাঁকে গাড়িতে তুলে দিয়ে সত্যজিৎবাবু দর্শকাসনে বসে ছোটদের অনুষ্ঠান দেখছিলেন। রাত সওয়া আটটা নাগাদ হঠাৎ গুলির শব্দ। মুখ থুবড়ে পড়েন বিধায়ক। চেয়ারের পাশ থেকে পরে ওয়ানশটারটি উদ্ধার হয়। পাড়ারই এক যুবক ঘটনার পর থেকে পলাতক। তার সঙ্গে এর যোগ আছে কি না, খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

আরও পড়ুন: অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল আমারও

হাসপাতালে তৃণমূলের জেলা সভাপতি গৌরীশঙ্কর দত্ত থেকে শুরু করে জেলা পরিষদের সভাধিপতি রিক্তা কু্ণ্ডু— সকলে হাউহাউ করে কাঁদছিলেন। কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস এসে সত্যজিতের দেহ দেখে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে যান। তার পর মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পড়েন। রাত ১০টা নাগাদ আসেন মন্ত্রী রত্না ঘোষ।

ফুলবাড়ির অনুষ্ঠানে তৃণমূল বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র (ইনসেটে)।

রাজনৈতিক মহলে সত্যজিৎকে গৌরীবাবুর ‘বড় ছেলে’ বলা হত। কান্নাভেজা গলায় তিনি বলতে থাকেন, ‘‘মুকুল রায় এর পর জেলায় পা রাখার সাহস দেখালে ভয়ঙ্কর হবে।’’ রাতে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পরিকল্পনা করে সত্যজিৎকে খুন করল বিজেপি। ওদের খুনের রাজনীতির পরিণাম বাংলা বুঝতে পারছে, প্রতিরোধও করবে।’’ জবাবে মুকুলের বক্তব্য, ‘‘সত্যজিৎ বাচ্চা ছেলে, ভাল ছেলে। ও কার বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে দেখা হোক। নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই বোঝা যাবে ওদের অন্তর্দ্বন্দ্বে খুন হয়েছে।’’

পুলিশ সুপার রূপেশ কুমার এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমনদীপ, এডিজি নীরজ কুমার সিংহ-সহ পুলিশের কর্তারা সকলেই এ দিন হাসপাতালে পৌঁছে যান। রাতের দিকে নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে হাসপাতালেরই একটি ঘরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। ঘটনাস্থলে আসেন জেলাশাসক সুমিত গুপ্ত। তিনি বলেন, ‘‘অপরাধীকে খুঁজে বার করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে।’’

গ্রামেরই বাসিন্দা অভিজিৎ পুন্ডারি নামে এক যুবক এলাকাছাড়া। ঘটনার সঙ্গে তার যোগ থাকতে পারে বলে পুলিশের সন্দেহ। বেশি রাতে অভিজিতের বাড়িতে ভাঙচুর চালায় জনতা। অভিজিতের মা ও ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তবে অভিজিতের রাজনৈতিক পরিচয় এখনও জানা যায়নি। দলীয় সূত্রে খবর, নদিয়ায় তৃণমূলের মতুয়া রাজনীতির মুখ ছিলেন সত্যজিৎ। পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকেই জেলায় বিজেপি-তৃণমূল লড়াই তীব্র হয়। সম্প্রতি সংগঠনকে আরও শক্ত করতে বীরভূমের নেতা অনুব্রত মণ্ডলকে নদিয়ায় বিশেষ দায়িত্ব দেয় দল।

বিজেপির নদিয়া দক্ষিণ সাংগঠনিক সভাপতি জগন্নাথ সরকারের দাবি, ‘‘বোঝাই যাচ্ছে আততায়ী অনুষ্ঠানে ছিল, চেনা লোক।’’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের মন্তব্য, ‘‘সিবিআই তদন্ত হলেও সহযোগিতা করব। সত্য সামনে আসুক।’’ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘‘আবার প্রমাণিত হল, তৃণমূলের রাজত্বে কেউ নিরাপদ নয়।’’

রবিবার কৃষ্ণগঞ্জে যাচ্ছেন অনুব্রত। তাঁর দাবি, ‘‘বিজেপির পায়ের তলায় মাটি নেই। মরিয়া হয়ে ওরা এ সব করছে।’’