বিয়ের ধকল কাটিয়ে নবদম্পতিরা নিভৃতে সময় কাটাতে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। মধুচন্দ্রিমা বরাবরই রোমাঞ্চের স্বাদ বয়ে আনে নবজীবনে। অনেকেরই শখ হয় বিদেশে গিয়ে মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করার। বিদেশে মধুচন্দ্রিমা বলতে ইদানীং নবদম্পতিদের পছন্দের তালিকায় প্রথমের দিকে থাকে মলদ্বীপ, তাইল্যান্ড, দুবাই, সিঙ্গাপুর, গ্রিস, মাসাইমারার মতো জায়গাগুলি। তবে পশ্চিম এশিয়ায় বাড়তে থাকা উত্তেজনার আবহে ভারতের অর্থনীতির উপর চাপ কমাতে মিতব্যয়িতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অনুরোধ করেছেন বিদেশযাত্রায় রাশ টানতে। মনখারাপ না করে দেশের মধ্যেই এমন সব গন্তব্যে পৌঁছে যান, যেখানে গিয়ে পেয়ে যাবেন একেবারে বিদেশের আমেজ। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানকার সৌন্দর্য চাক্ষুষ করার পর বিদেশে না যাওয়ার জন্য কোনও রকম আফসোস থাকবে বলে মনে হয় না।
কুর্গ
পশ্চিমঘাট পর্বতের ঢালে কোদাগু জেলায় ছবির মতো সাজানো জায়গা কুর্গ। একে 'ভারতের স্কটল্যান্ড'ও বলা হয়। বেঙ্গালুরু থেকে দূরত্ব ২৫২ কিলোমিটার। কর্নাটকের এই মনোরম জায়গাটিতে রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ, বিরামহীন ছোট ছোট ঝর্না, বিস্তীর্ণ কফি বাগান। শহুরে কোলাহলের বাইরে যেন এক টুকরো স্বর্গ। মিলবে রিভার র্যাফটিং, জ়িপলিং, ট্রেকিং ও কায়াকিংয়ের সুযোগও। এখানে ঘুরতে গিয়ে রাজাসিট পার্ক, অ্যাবি ঝর্না, ওঙ্কারেশ্বর মন্দির, তালকাবেরি, নাগরহোল জাতীয় উদ্যান, দুবারের হাতি সংরক্ষালয় কিন্তু ঘুরে দেখতেই হবে। জেলার সদর শহর মদিকেরী থেকে ২০ কিলোমিটার মতো দূরত্বে ভাগমণ্ডল মন্দির। মাদিকেরী থেকে ১ কিলোমিটার দূরে অ্যাবে জলপ্রপাত।
কী ভাবে যাবেন?
বেঙ্গালুরু থেকে মদিকেরীর দূরত্ব ২৫২ কিলোমিটার, গাড়িতে গেলে পাঁচ ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। বাস পরিষেবাও রয়েছে।
লক্ষদ্বীপ
কয়েক বছর ধরে ভারতীয়রা মধুচন্দ্রিমার জন্য মলদ্বীপে গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। তবে লক্ষদ্বীপ কিন্তু মলদ্বীপকেও টেক্কা দিতে পারে। নীল লেগুন, সাদা বালির সৈকত এবং প্রচুর প্রবাল— লক্ষদ্বীপ এবং মলদ্বীপের মধ্যে মিল প্রচুর। আরব সাগরের উপরে মাত্র ৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে লক্ষদ্বীপ। খাতায়-কলমে দ্বীপের সংখ্যা ৩৬টি। তবে সবই সমুদ্রের মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েক খণ্ড জমি। অগাতি দ্বীপ, বাঙ্গরম দ্বীপ, কবরত্তি দ্বীপ, কদমত দ্বীপ এবং মিনিকয় দ্বীপগুলি বেশ জনপ্রিয়। দ্বীপের মাঝে রাত্রিবাস থেকে ওয়াটার স্পোটর্স অ্যাডভেঞ্চার— সবেরই সুযোগ মিলবে লক্ষদ্বীপে। লক্ষদ্বীপে গেলে যে পদ খেতেই হবে, তা হল মুস কবাব। সুগন্ধি চালের উপর টুনা মাছ, সবজি এবং মশলার স্তর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। পরে মুখবন্ধ পাত্রে রান্না করা হয়। এ ছাড়াও বিরিয়ানি, কদালাক্কা এবং টুনা কারি সেখানকার জনপ্রিয় খাবার। লক্ষদ্বীপের পর্যটন বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, কেন্দ্রশাসিত এই দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। তবেই সেখানে যাওয়ার অনুমতি মেলে। লক্ষদ্বীপের দ্বীপগুলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বহু উপজাতির বাস। তাঁদের সুরক্ষা, নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই সব দ্বীপে পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
কেরলের কোচি থেকে দু’ভাবে লক্ষদ্বীপ যেতে পারেন। একটি হল বিমানে চড়ে, এ ক্ষেত্রে দেড় ঘণ্টা মতো সময় লাগবে। আর দ্বিতীয়ত, জলপথে জাহাজে চড়েও যেতে পারেন। যাত্রাপথে সময় লাগবে ১৪-১৮ ঘণ্টা।
খজ্জিয়ার
হিমাচল প্রদেশের চম্বা জেলায় এই গ্রামের অবস্থান। এই গ্রামের প্রাকৃতিক শোভা দেখে অনেকেই এর নাম দিয়েছেন ‘মিনি সুইৎজ়ারল্যান্ড’। গাঁয়ের নাম খজ্জিয়ার। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন ঢেউখেলানো মোলায়েম সবুজে ঢাকা উপত্যকা। মাথার উপরে নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা। হাত বাড়ালেই যেন ছুঁয়ে ফেলা যায় তাদের। ঘন পাইন বন, ছোট্ট লেক, পাহাড়ি উপত্যকার ঢাল বরাবর রংবেরঙের বাড়ি— ঠিক যেন হাতে আঁকা কোনও নিসর্গদৃশ্য। এমনই মায়াবী পরিবেশ এখানে। শীতকালে বরফের চাদরে ঢেকে যায় এই গ্রাম। সেই সৌন্দর্যও নজরকাড়া। তবে শহরের গরমের হাত থেকে দিন কয়েকের জন্য নিস্তার পেতে হলে এই মরসুমেও ঘুরে আসতে পারেন এই ঠিকানা থেকে। গরমের সময়েও হালকা শীতের আমেজ পাবেন এখানে। সমতলের চারপাশে পাইনের জঙ্গল, গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের মিঠে রোদ এসে পড়ে উপত্যকার গায়ে। সবুজ মাঠের মাঝে ছোট্ট এক টুকরো জলাশয়। সেখানে রয়েছে নৌকাবিহারের ব্যবস্থা। ছবিতে দেখলে জায়গাটিকে সুইৎজ়ারল্যান্ডের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন অনেকেই। ট্রেকিং ভালবাসলে এই ঠিকানাটি নিশ্চয়ই মনে ধরবে। খজ্জিয়ারের চারপাশে রয়েছে ছোট ছোট ট্রেকিংয়ের রাস্তা। সেই পথ অবশ্য খুব একটা কঠিন নয়। শরীর ফিট থাকলে সহজেই এই ট্রেক সেরে ফেলতে পারবেন। এক দিন আশপাশে খজ্জিয়ার লেক, নাগ মন্দির, কালাটপ অভয়ারণ্য, সোনার দেবী মন্দির ঘুরে দেখতে পারেন। এখান থেকে কৈলাস পর্বতের অপরূপ শোভাও চাক্ষুষ করতে পারবেন। খজ্জিয়ারে প্যারাগ্লাইডিং, জোর্বিং-এরও ব্যবস্থা রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
বিমানে চড়ে খজ্জিয়ারে যেতে হলে ধর্মশালা বিমানবন্দরে নামতে হবে। সেখান থেকে গা়ড়ি বা ট্যাক্সি বুক করে খজ্জিয়ার পৌঁছে যেতে পারেন। ট্রেনে চড়ে যেতে হলে আপনার গন্তব্য হবে পাঠানকোট জাংশন। সেখান থেকেও খজ্জিয়ার যাওয়ার গাড়ি পেয়ে যাবেন সহজেই।
চিত্রকোট জলপ্রপাত
কানাডার নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সৌন্দর্য চাক্ষুষ করার জন্য অনেক পর্যটক প্রতি বছর সেখানে ভিড় করেন। তবে অত দূর না গিয়ে ভারতে বসেই নায়াগ্রা দেখার সাধ মেটানো সম্ভব। উঁচু পাহাড় থেকে তীব্র স্রোতে আছড়ে পড়ছে ইন্দ্রাবতী নদী। মনভোলানো সেই রূপ নিয়ে অপেক্ষা করছে ছত্তীশগঢ়ের জগদলপুর। এখানেই রয়েছে ‘ভারতের নায়াগ্রা’। এমনই উপমা দেওয়া হয় চিত্রকোট জলপ্রপাতকে। এ রূপের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য ভরা বর্ষায়। মুষলধারে কয়েকটি দিন বৃষ্টি হলেই ফুলে ফেঁপে ওঠে ইন্দ্রবতী। যৌবনবতী নদী জলপ্রপাত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায় ১০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে। জলের তোড়ে তখন আশপাশ ঢেকে যায় বাষ্পে। ছত্তীসগঢ়ের জগদলপুর শহরের পশ্চিমে ৩৮ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে চিত্রকোট। চওড়ায় জলপ্রপাতটি ৯৮০ ফুট। উচ্চতা নয়, বরং বিস্তৃতিই এর বৈশিষ্ট্য। জগদলপুর শহরটি বস্তার জেলায়। এই জায়গার আনাচকানাচে রয়েছে এমন অনেক সুন্দর জলপ্রপাত। এখনও এই অঞ্চলে রয়েছে সবুজের সমারোহ। রয়েছে জঙ্গল। অথচ এর অনেকটাই রয়ে গিয়েছে অগোচরে। যাঁরা নিরিবিলিতে মধুচন্দ্রিমা উপভোগ করতে চান, তাঁদের জন্য এই স্থানটি আদর্শ।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে বা উড়ানে বিশাখাপত্তনমে গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে জগদলপুর যেতে পারেন। হাওড়া থেকে রাতে ছাড়ে সমলেশ্বরী এক্সপ্রেস। এই ট্রেনটি সরাসরি জগদলপুর যায়।
আন্দামান নিকোবর
আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, আর নীচে অসীম জলরাশি। রং কোথাও ঘন নীল, কোথাও আবার খানিক হালকা। তারই মধ্যে দৃশ্যমান, সাগরের বুকে ঘন হয়ে থাকা সবুজ। সেই সবুজের ফাঁকফোকর গলে চোখে পড়ে সৈকতে ঝাঁপিয়ে পড়া ঢেউয়ের সাদা ফেনিল ঢেউ। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। জলপ্রেমী হলে মধুচন্দ্রিমার জন্য আদর্শ ঠিকানা হতে পারে এই দীপপুঞ্জ। তাইল্যান্ডের কর্বি আইল্যান্ডের সঙ্গে আন্দামানের তুলনা করা হয়। আন্দামান ভ্রমণের সূচনা করতে হয় পোর্ট ব্লেয়ার থেকেই। ছোট্ট একটি শহর। শহরকে ঘিরে রয়েছে একাধিক সমুদ্র সৈকত। কোথাও আবার সমুদ্রের পাশ দিয়েই গিয়েছে কালো পিচের মসৃণ রাস্তা। শহর ঘিরে চড়াই-উতরাই পথ। পোর্ট ব্লেয়ার থেকেই ঘুরে নেওয়া যায় সেলুলার জেল, রস ও নর্থ বে দ্বীপ, সংগ্রহশালা, মাড ভলক্যানো। ঘুরে নিতে পারেন করবাইনস কোভ, ওয়ান্ডুর সমুদ্রসৈকত, চিড়িয়া টাপু। আন্দামানের সবচেয়ে সুন্দর জায়গার মধ্যে জলিবয় একটি। বছরে মাত্র ছ’মাস সেখানে পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি মেলে, তা-ও আবার সীমিত। প্রবাল দেখার সবচেয়ে ভাল জায়গা নিঃসন্দেহে জলিবয়। হ্যাভলক দ্বীপটিও খুব সুন্দর। চারদিকে নারকেল গাছের সারি। সমুদ্রের পারে ম্যানগ্রোভের ছোঁয়া। এখান থেকে ঘুরে নেওয়া যায় হ্যাভলক দ্বীপের রাধানগর ও কালাপাথর সৈকত। রাধানগর সৈকতে স্নান করা যায়। চারপাশে বড় বড় গাছ ঘেরা এই সৈকতের সূর্যাস্ত বড়ই মনোরম। সেখান থেকে ঘুরে নেওয়া যায় এলিফ্যান্ট বিচ, নীল আইল্যান্ড।
কী ভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে সরাসরি উড়ান আছে পোর্ট ব্লেয়ারের। জলপথেও আসা যায়, তবে তা সময়সাপেক্ষ। পোর্ট ব্লেয়ার, হ্যাভলক ও নিল দ্বীপে ঘোরার সবচেয়ে ভাল উপায় স্কুটি ভাড়া করে নেওয়া। লাইসেন্স থাকলে ভাড়ার জন্য সহজেই স্কুটার ও বাইক মেলে।