Advertisement
E-Paper

বাড়ছে পায়ে হেঁটে শহর চেনার আগ্রহ, গত দু’দশকে আর কী কী প্রাপ্তি কলকাতার হেরিটেজ ওয়াকের ঝুলিতে?

হাঁটতে হাঁটতে স্মৃতির কাছে পৌঁছে, দু’হাতে তাদের ছুঁয়ে দেখে, সেকেলে চায়ের দোকানের মাটির ভাঁড়ে চুমুক দিলে তবেই তো ধরা দেবে মণিমানিক!

পরমা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৫
what is the state of Kolkata heritage walk after two decades of initiation

চলতে চলতেই জেনে নিন এ শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

“...তুমিও হেঁটে দেখো কলকাতা!”

জনপ্রিয় ছবির গানে যে কথা বলা, ঠিক সে কথাটাই তো আজও বলেন বয়স্ক মানুষজন। পায়ে হেঁটেই আসলে একটা শহর চিনতে হয়। ছুঁয়ে দেখতে হয় তার নাড়ির স্পন্দন।

এত পুরনো একটা শহর। আড়েবহরে বেড়ে মহানগর। তার গায়ে জড়িয়ে শতকের পর শতকের ইতিহাস। তার ইট-কাঠ-পাথরের খাঁজেখোঁজে, এলোমেলো বাতাসে মিশে আছে গল্পেরা। তার রাজপথের ধুলোয়, গলিঘুঁজিতে, দেওয়ালের গায়ে, মাঠে-ময়দানে, গঙ্গার কিনারে জমে থাকা ধুলোর পরতে অজস্র স্মৃতির ভিড়। হাঁটতে হাঁটতে তাদের কাছে পৌঁছে, দু’হাতে তাদের ছুঁয়ে দেখে, সেকেলে চায়ের দোকানের মাটির ভাঁড়ে চুমুক দিলে তবেই তো ধরা দেবে সেই সব মণিমানিক!

Advertisement
টাউন হল।

টাউন হল। ছবি: সংগৃহীত।

এমন ভাবনা থেকেই বিদেশের আদলে কলকাতাতেও শুরু হয়েছিল হেরিটেজ ওয়াক। যাতে ভিন্‌রাজ্য কিংবা ভিন্‌দেশ, অন্য শহরের মানুষ বা খাস কলকাতার লোকও চিনতে-জানতে পারেন এখানকার জীবনধারাকে, এখানকার সংস্কৃতিকে। সময়ের দলিল বেয়ে যাতে ধরা দেয় জীবন্ত ইতিহাস হয়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা শহরটা, মন ছুঁয়ে যায় তার রূপ-রস, গন্ধ কিংবা স্বাদ।

দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো কলকাতার নানা প্রান্তে। কাছ থেকে দেখা এখানকার হেরিটেজ বাড়িঘর, ধর্মস্থান থেকে সমাধিস্থল, ঐতিহাসিক কেন্দ্র। গল্পে গল্পে জেনে নেওয়া এ শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, জীবনযাপনের সবটুকু। হেরিটেজ ওয়াকে প্রথম প্রথম পা মেলাতেন মূলত কলকাতায় আসা ভিন্‌দেশি পর্যটকেরাই। ক্রমশ অন্য প্রদেশের মানুষ এবং প্রবাসী বাঙালিরাও তার স্বাদে মজতে শুরু করলেন। ইদানীং এ শহরের নানা বয়সের মানুষও নিজের শহরকে ভাল করে চেনার তাগিদে হেরিটেজ ওয়াকে সামিল হচ্ছেন। ক্রমশ পায়ে হাঁটার পাশাপাশি গাড়িতে ঘোরাঘুরি, ঐতিহাসিক ঠিকানার পাশাপাশি এ শহরের খাওয়াদাওয়া, শিল্প-সংস্কৃতি কিংবা জীবনযাপনের অন্যান্য দিকও ঢুকে পড়েছে হেরিটেজ ট্রিপের খাতায়। আর সেই সব রকমের ঘোরাঘুরিতেই আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। কলকাতার গণ্ডি পেরিয়ে শহরতলি বা জেলাও সামিল হয়েছে এমন হেরিটেজ ভ্রমণের তালিকায়।

মার্বেল প্যালেস।

মার্বেল প্যালেস। ছবি: সংগৃহীত।

পায়ে হেঁটে শহর চেনানোর এই উদ্যোগ যাঁদের হাত ধরে কলকাতায় শুরু হয়েছিল, তাঁদেরই অন্যতম ইফতেকার আহসান। ২০০৫ সাল থেকে হেরিটেজ ওয়াক শুরু করালেও নিজের সংস্থা গড়ে এই উদ্যোগের পথচলা শুরু ২০০৭ থেকে। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে হেরিটেজ ওয়াকের এই সফরের অভিজ্ঞতা কেমন তাঁর? কতটাই বা বদল দেখলেন তাতে?

ইফতেকারের কথায়, “আগে বিদেশিরাই মূলত হাঁটতেন আমাদের সঙ্গে, কিংবা অন্য রাজ্যের মানুষ। এখন এ শহরের মানুষের মধ্যে কলকাতায় হেরিটেজ ওয়াক করার উৎসাহ অনেক বেড়েছে। তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা আরও বেশি কঠিন। কারণ, বাইরে থেকে আসা মানুষ একটা নতুন জায়গা দেখছেন, যার সম্পর্কে তাঁদের তেমন ধারণা নেই। ফলে তাঁদের যেমনই তথ্য দেওয়া হোক, যে ইতিহাস বা যে গল্পই বলা হোক, তাঁরা উপভোগ করবেন। কিন্তু এখানকার মানুষ যে জায়গাটা চেনেন, তাকেই আরও ভাল করে চিনতে এসেছেন। তাঁদের দেওয়া উত্তর বা তথ্যগুলোয় আরও গভীরে যেতেই হবে। এই দুই গোত্রের মানুষদের প্রশ্নগুলো বা কৌতূহলগুলো আলাদা রকমের হয়। চেষ্টা করি, দুই ধরনের মানুষই যাতে ভাল অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন। হেরিটেজ ওয়াক মানে তো শুধু হাঁটা আর কিছু তথ্য নিয়ে ফেরা নয়। বরং একটা সিনেমার মতো, বলা যায়। দলবেঁধে ঘোরাঘুরি, ইতিহাসচর্চা, গল্প শোনা, সব রকম প্রশ্নের উত্তর পাওয়া, নতুন মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব-আড্ডা, খাওয়াদাওয়া, চা-বিরতি— সব মিলিয়েই সেই অভিজ্ঞতা। তবে হ্যাঁ, কলকাতার মানুষকে কলকাতা চেনানো, তাঁদের নিজের এত দিনের চেনা শহরেরই এক অচেনা দিককে তাঁদের সামনে তুলে ধরার তৃপ্তি কিন্তু আলাদা!”

সেন্ট জন্‌’স চার্চ।

সেন্ট জন্‌’স চার্চ। ছবি: সংগৃহীত।

২০০৮ সাল থেকে হেরিটেজ ওয়াক করাচ্ছেন বিশিষ্ট আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ গৌতম বসুমল্লিকও। সাংবাদিক হিসেবে অবসর নেওয়ার পরে সদ্য নিজের সংস্থা গড়েছেন। প্রায় ২০ বছরে তাঁর অভিজ্ঞতাটা ঠিক কী রকম?

“শুরুতে বন্ধুরা, চেনা মানুষেরা দল গড়ে নিজেদের মতো করে হেঁটে হেঁটে শহর চেনা, খাওয়াদাওয়া এবং ইতিহাসচর্চা করতাম। কলকাতার গল্প বা ইতিহাস বলাটাও হত মনের মতো করে। কারণ ওই ওয়াকগুলোতে যাঁরা থাকতেন, তাঁদের আগ্রহ, কৌতূহল, ইতিহাসের প্রতি ভালবাসা— সবই বেশি থাকত। পরবর্তীতে যখন থেকে পেশাদারি উদ্যোগে হেরিটেজ ওয়াক করানো শুরু করলাম, প্রথম দিকে একটু এলোমেলো ভাবে ঘুরতাম। আস্তে আস্তে খানিকটা গুছিয়ে ঘোরা শুরু করলাম। কখনও ডালহাউসি পাড়া, কখনও এসপ্ল্যানেড, কখনও উত্তর কলকাতা। হয় মিশ্র সংস্কৃতি, কিংবা আলাদা ভাবে শুধু মন্দির, মসজিদ, বা গির্জা, তাদের ইতিহাস বা স্থাপত্যরীতি। তবে আগে মানুষ যতটা বিস্তৃত ইতিহাস শুনতে চাইতেন, ইদানীং ততটা আগ্রহ দেখি না। সংক্ষেপে ইতিহাস শোনা, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা— সব মিলিয়ে হেরিটেজ ওয়াক ঘিরে উৎসাহ চোখে পড়ে বেশি। বরং চাহিদা বাড়ছে ফুড ওয়াক, ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার খোঁজে ঘোরাঘুরির।”

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ছবি: সংগৃহীত।

সে কথা মানছেন কলকাতাবাসী কর্পোরেটকর্মী রশ্মিতা সান্যাল কিংবা প্রবাসী অধ্যাপক রুদ্রদীপ মুখোপাধ্যায়ও। দু’জনেই বলছেন, আসলে একটা শহরকে, তার ঐতিহ্যকে চিনতে চেয়ে হেরিটেজ ওয়াক নিয়ে আগ্রহ যথেষ্ট বাড়লেও কমে গিয়েছে একটানা অনেকটা কথা শোনার ধৈর্য। “আর কিছুটা ইতিহাস জেনে নেওয়ার পরে বাকিটা তো বইপত্র, গুগল বা এআই প্রযুক্তির হাত ধরে জানার সুযোগ থাকছেই। তাই ঘোরাঘুরি, ইতিহাস জানা, আড্ডা, পেটপুজোর একটা ঠিকঠাক মিশেলই বেশি উপভোগ করি,” বলছেন রশ্মিতা। একমত রুদ্রদীপও।

পর্যটনের ক্ষেত্রে হেরিটেজ ওয়াক ঠিক কী ভাবে সাহায্য করে? গৌতম বলছেন, “পর্যটনের একটা ছোট অংশ হেরিটেজ ওয়াক। কোনও একটা জায়গার ইতিহাস সম্পর্কে যাঁরা ততটা জানেন না, তাঁরা এর থেকে সেই সচেতনতা পেতে পারেন। বিদেশি বা ভিন্‌রাজ্যের মানুষ যখন কলকাতায় আসেন, তাঁরা হয়তো এ শহরটার বিভিন্ন জায়গা বা স্থাপত্য সম্পর্কে জেনে আসেন, ছবি দেখে আসেন। কিন্তু সেই জানাটা সম্পূর্ণ হয়, যখন হেরিটেজ ওয়াকে গিয়ে সেই জায়গা বা স্থাপত্যগুলো তাঁরা নিজের চোখে দেখেন। এ বার সেই অভিজ্ঞতা যদি তাঁরা লেখেন বা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেন, সে ক্ষেত্রে আরও কিছু মানুষ এ শহরে আসতে আগ্রহী হবেন। পর্যটন শিল্পের দিক থেকে তা লাভজনক। আবার এ শহরের বাসিন্দারা যখন হেরিটেজ ওয়াকে যান, তখন তা কিন্তু নিছক মনোরঞ্জন থাকে না। বরং অনেক অচেনা জায়গা দেখা, অনেক অজানা তথ্য জানার সুযোগ মেলে। তা নিশ্চয়ই তাঁদের সমৃদ্ধ করে।”

চৌরঙ্গী ম্য়ানসন।

চৌরঙ্গী ম্য়ানসন। ছবি: সংগৃহীত।

হেরিটেজ ওয়াকের লক্ষ্য যেমন একটা শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, তার প্রতিফলন বাস্তবে কতটা ঘটছে? হেরিটেজ ওয়াকে আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি কলকাতার পুরনো বাড়ি, ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদও কি বাড়ছে?

প্রিন্সেপ ঘাট।

প্রিন্সেপ ঘাট। ছবি: সংগৃহীত।

ফোনে এ বার খানিকটা হতাশ শোনায় ইফতেকারের গলা। বলেন, “মানুষ হয়তো আগ্রহ ভরে ইতিহাস বা কোনও একটা বাড়ি বা স্থাপত্যের গল্প শুনছেন। কিন্তু এত সুন্দর সুন্দর পুরনো বাড়িঘরকে কি আমরা ধরে রাখতে পারছি? সবই তো ভেঙে, ভোল পাল্টে আধুনিক ঝাঁ-চকচকে চেহারায় নতুন করে গড়ে উঠছে। কিন্তু সেই সঙ্গে তো হারিয়ে যাচ্ছে এই শহরটার ইতিহাসও। যখন বিদেশিদের বা অন্য রাজ্যের মানুষকে পুরনো কলকাতার আভিজাত্য, ইতিহাস আর স্থাপত্য চেনাই, বার বারই একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে। আমাদের ঝুলিতে এত কিছু আছে, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা কী করছি? আশা রাখি, সরকার উদ্যোগী হয়ে নিশ্চয়ই পুরনো কলকাতার কিছুটা স্বাদ অন্তত বাঁচিয়ে রাখবে আগামী প্রজন্মের জন্য। তবে তার জন্য সমান দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের শহরের মানুষকেও।”

Kolkata Heritage
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy