বাইক এক। সওয়ারি চার।
‘শোলে’ ছবির গব্বর সিংহ হলে হয় তো বলে ফেলত, ‘‘বহুত না-ইনসাফি হ্যায়!’’ কিন্তু এই কাণ্ডটাই করে বসেছিল চার কিশোর। তার উপরে যে গাড়ি চালাচ্ছিল, তার লাইসেন্স নেই, থাকার অবশ্য কথাও নয়। কারণ, বয়স আঠারো পেরোয়নি। আর হেলমেটও ছিল না কারও মাথায়।
সব মিলিয়ে যা হওয়ার তাই। দুর্ঘটনায় জখম হয়েছে চারজনই। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্য একটি মোটর বাইকে ধাক্কা মারে বাইকটি।
মঙ্গলবার সকালে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, বারুইপুরের বেলেগাছি মোড়ের কাছে। পুলিশ জানিয়েছে, জখম রেজাউল গায়েন, ইব্রাহিম খান, মোশারেফ শেখ ও কামরুল গাজির বাড়ি ক্যানিঙের তালদিতে। তারা তালদি মোহনচাঁদ হাইস্কুলের ষষ্ঠ, অষ্টম ও নবম শ্রেণির ছাত্র। বছর পনেরোর কামরুল কলকাতায় দর্জির কাজ করে।
ঘটনাটা ঘটল এমন সময়, যখন রাজ্য জুড়ে ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’ কর্মসূচি নিয়েছে। পথ দুর্ঘটনা কমাতে নানা কড়া পদক্ষেপ করা হচ্ছে। হেলমেট ছাড়া তেল মিলবে না, এই নিয়ম রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই লাগু হয়েছে। ট্রাফিক আইনকে আরও শক্তপোক্ত করতে কেন্দ্র আইন পর্যন্ত আনতে চলেছে।
এমনই যেখানে পরিস্থিতি, সেখানে হেলমেটহীন ভাবে কিশোরেরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাইক নিয়ে, ঘটনাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আইন যতই কড়া হোক না কেন, নজরদারি না বাড়়ালে আইন ভাঙার প্রবণতা রোখা মুশকিল। সেই সঙ্গে আম আদমির সচেতনতা না বাড়লেও কাজের কাজ বিশেষ হবে না। ক্যানিঙের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, নাবালকদের হাতে মোটর বাইক গেল কী করে। অভিভাবকেরা তা হলে কী করছিলেন? বস্তুত, সমস্যাটা শুধু ক্যানিঙেই আটকে নেই। ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ, বনগাঁ, বসিরহাট— দুই ২৪ পরগনার সর্বত্রই এখনও দেখা যাচ্ছে আইনভাঙার এমন হাজারো ছবি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কামরুল বেশির ভাগ সময়ে কলকাতায় থাকে। মাঝে মধ্যে তালদিতে আসে। এলেই বন্ধুর মোটর বাইক নিয়ে বেরোয়। এ দিনও সকালে বাইক নিয়ে বেরিয়েছিল সে। স্কুলের সামনে পাড়ার ওই তিন বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয় তার। কামরুলের বাইকে ঘুরে এসে ক্লাস করবে বলে ঠিক করে সকলে। চার বন্ধু মিলে বাইকে করে গিয়েছিল বারুইপুরের বেলেগাছির দিকে। এ দিক সে দিক হাওয়া খেয়ে স্কুলে ফেরার সময়েই মোটর বাইকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আর একটি বাইকে ধাক্কা মারে। চারজনই ছিটকে পড়ে রাস্তায়। গুরুতর জখম হয়। তিন জনের হাত-পা ভাঙে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের ক্যানিং হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয় লোকজন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে কলকাতার চিত্তরঞ্জনে স্থানান্তরিত করা হয়।
কামরুলের মামা আনারুল গাজি জানান, মোটর বাইকটি ভাগ্নের নয়। অন্য এক বন্ধুর কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিল। তবে বাইক নিয়ে বেরোনোর কথা বাড়ির লোক জানতেন না। পুলিশ জানিয়েছে, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। মোটর বাইকটি আদপে কার, তা জানার চেষ্টা চলছে।
ক্যানিঙের এক পুলিশ কর্তা বলেন, ‘‘পুলিশ সব সময় বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে নাকা তল্লাশি চালাচ্ছে। তা ছাড়া, হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো বা এক বাইকে অনেকজন মিলে যাতায়াত দেখলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এটা ঠিক, কেউ কেউ লুকিয়ে এখনও আগের মতোই বেপরোয়া ভাবে যাতায়াত করছে।’’ কিশোরদের হাতে বাইক দেখলেই ধরা হচ্ছে বলে ওই পুলিশ কর্তা জানান। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এখন কিশোরদের হাতেই বাইক বেশি দেখা যাচ্ছে। পুলিশকে তোয়াক্কাও করে না তারা।
তালদি মোহনচাঁদ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয়কুমার নস্কর বলেন, ‘‘কোনও ছাত্র স্কুলে না এসে যদি কোথাও ঘুরতে চলে যায়, তা হলে আমাদের কিছু করার নেই। স্কুলের গেটে সকাল ১১টা নাগাদ তালা দিয়ে দেওয়া হয়। ছুটির আগে কেউ বেরোতে পারে না। তা ছাড়া, বিকেলেও ছাত্রদের রোল কল করা হয়।’’