Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

হাইকোর্টের নির্দেশের পরে এ বার কি টাকা মিলবে, প্রশ্ন

ক্যানিং মহকুমায় ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়া নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ রয়েছে। ক্যানিং ১ ব্লকে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদন
০৩ ডিসেম্বর ২০২০ ০৫:০৯
—ফাইল চিত্র।

—ফাইল চিত্র।

আমপানে ক্ষতিপূরণ বিলির ফিনান্সিয়াল ও পারফরমেন্স অডিট করতে কন্ট্রোলার এবং অডিটর জেনারেলকে (সিএজি) নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে সিএজিকে।

আমপানের পরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। কিন্তু সেই ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে নানা জায়গায়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তেরা ক্ষতিপূরণ পাননি বলে অভিযোগ করেন। রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে পরিবার, পরিজন ও কাছের লোকজনকে ক্ষতিপূরণের টাকা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ভুরি ভুরি। বিতর্কের মাঝে তাঁদের অনেকে টাকা ফেরত দেন।

সরকারি ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রাপকদের নামের তালিকা টাঙানোর কথা থাকলেও, দুর্নীতি ঢাকতে অনেক ক্ষেত্রে তা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা। ক্ষতিপূরণে গরমিল নিয়ে একাধিক মামলাও হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার অডিটের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।

Advertisement

হাইকোর্টের নির্দেশের পরে, বুধবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি ঘুরে দেখা গেল, অনেকে এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। ক্ষতিপূরণ প্রাপকদের তালিকা ঠিকমতো টাঙানো হয়নি বলে অভিযোগ। স্থানীয় মানুষ জানালেন, ব্লক দফতরগুলিতে সামান্য সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা টানিয়ে তা খুলে নেওয়া হয়েছে। ব্লক দফতরের কর্মীদের দাবি, টাঙানোর পরে বহিরাগতেরা তালিকা ছিঁড়ে ফেলে।

ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, সন্দেশখালিতে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন ১৮ হাজার পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। আংশিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছে প্রায় ২৫ হাজার পরিবার। হাড়োয়া ব্লকে আংশিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছে ২১ হাজার এবং সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পেয়েছে প্রায় ১৫ হাজার পরিবার। তবে এখনও পর্যন্ত বেশ কিছু পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি। হাড়োয়া ব্লকে প্রায় ৫১ হাজার পরিবার সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ এবং প্রায় ১ হাজার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি। সন্দেশখালিতে প্রায় দেড় হাজার পরিবারকে কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। ব্লক প্রশাসনের দাবি, তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সমস্যার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রশাসন সূত্রে দাবি, স্বরূপনগরে আমপানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তার মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রায় ১২ হাজার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সাহায্য পেয়েছে।

হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকে আমপানের ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ। পাননি এখনও প্রায় চার হাজার মানুষ। হিঙ্গলগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অর্চনা মৃধা বলেন, “যখন যত মানুষের অ্যাকাউন্টে ক্ষতিপূরণের টাকা ঢুকেছে, তখন সেই তালিকা পঞ্চায়েতগুলিতে টাঙানো হয়েছে।”

হাসনাবাদ ব্লক সূত্রে খবর, প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের নামের তালিকা ক্ষতিপূরণের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তবে অনেকে এখনও পাননি। কতজন পাননি, সেই তথ্য ব্লক অফিস থেকে পাওয়া গেল না। ব্লক অফিস ও পঞ্চায়েত অফিসে তালিকা টাঙানো হয়েছিল বলে ব্লক প্রশাসন দাবি করলেও হাসনাবাদের বিজেপি নেতা তুলসী দাস বলেন, “সম্পূর্ণ তালিকা কোথাও ঝোলানো হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এক মাস আগেও স্মারকলিপি দিয়েছি আমরা। আসলে তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য ও নেতারা যে স্বজনপোষণ করেছেন, তা ঢাকতে তালিকা ঝোলানো হচ্ছে না।”

বাগদা ব্লকে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও ক্ষতিপূরণের সরকারি টাকা পেয়েছিলেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই ওই টাকা সরকারি কোষাগারে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বিডিও জ্যোতিপ্রকাশ হালদার। কিছু লোক টাকা ফেরালেও অনেকেই তা করেননি বলে জানালেন স্থানীয় মানুষ।

ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত বাগদা ব্লকের হেলেঞ্চা ও কোনিয়ারা ২ পঞ্চায়েত এলাকার ৪৩ জন সরকারি কোষাগারে টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন। অভিযোগ, ওই দু’টি পঞ্চায়েত এলাকা থেকেই সব থেকে গরমিলের অভিযোগ উঠেছিল।

বিজেপির বারাসত সাংগঠনিক জেলার সম্পাদক তথা বাগদা পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য অমৃতলাল বিশ্বাসের অভিযোগ, “প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও অনেকেই ক্ষতিপূরণের ২০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। অনেকেই টাকা ফেরত দেননি। প্রশাসনকে জানিয়েও কোনও ফল হয়নি। শাসকদলের নেতাদের মদতেই কেউ কেউ টাকা ফেরত না দিয়ে বসে আছেন।”

বিডিও বলেন, “লিখিত ভাবে প্রধানদের কয়েকবার নির্দেশ দিয়েছি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও যদি কেউ টাকা পেয়ে থাকেন, তা হলে সেই টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করতে। এখন পর্যন্ত ৪৩ জন টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন। প্রধানেরা লিখিত ভাবে জানিয়েছেন, এর বাইরে টাকা ফেরত দেওয়ার আর কেউ বাকি নেই। এ বিষয়ে কোনও অভিযোগও পাইনি।” ক্ষতিগ্রস্তদের নামের তালিকা ব্লক অফিসে টাঙানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।

গাইঘাটা ব্লকের সকলে টাকা ফেরত দেননি বলে স্বীকার করে নেন গাইঘাটা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তৃণমূলের গোবিন্দ দাস। তিনি বলেন, “ব্লকে সাড়ে ৮ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ২০ হাজার টাকা এবং ৩৩ হাজার পরিবার ৫ হাজার টাকা করে পেয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও যাঁরা টাকা পেয়েছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগ টাকা ফেরত দিয়েছেন। তবে সকলে দেননি।’’

বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, টাকা ফেরাতে প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল না। আবার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ২০ হাজার টাকার বদলে ৫ হাজার টাকা করে পেয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে অনেক জায়গায়।

রায়দিঘির মথুরাপুর ২ ব্লকের নগেন্দ্রপুর, নন্দকুমারপুর, কুমড়োপাড়া ও রায়দিঘি সহ বেশ কয়েকটি পঞ্চায়েতে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বদলে যাঁদের দোতলা বাড়ি, তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি, তাঁদেরই অ্যাকাউন্টে ২০ হাজার টাকা করে ঢোকে বলে অভিযোগ।

প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তেরা টাকা না পাওয়ায় এবং ক্ষতিপূরণ প্রাপকদের তালিকার দাবিতে পঞ্চায়েত থেকে ব্লক অফিসে লাগাতার ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলে। ব্লক দফতর থেকে তালিকা ঝোলানো হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই তা মানতে চাননি। ক্ষতিপূরণ-দুর্নীতির এখনও কোনও সুষ্ঠু সমাধান হয়নি বলেই দাবি স্থানীয় মানুষের।

ক্যানিং মহকুমায় ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়া নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ রয়েছে। ক্যানিং ১ ব্লকে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন বলে ব্লক প্রশাসন সূত্রের খবর। এর মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ১২ হাজার ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ২৩ হাজার মানুষ রয়েছেন। বাসন্তী ব্লকে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। সাড়ে পাঁচ হাজার বাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রায় ২৪ হাজার বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই মহকুমার সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গোসাবা ব্লকের প্রায় ৪৯ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। ১৪ হাজার সম্পূর্ণ ও সাড়ে ৩৪ হাজার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে জানিয়েছে ব্লক প্রশাসন। তবে এখনও সব ক্ষতিগ্রস্তেরা ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। গোসাবার বালি দ্বীপের বাসিন্দা সুমিত্রা মণ্ডল বলেন, “ঝড়ে আমার ঘর সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু আমি কোনও ক্ষতিপূরণ পাইনি। অথচ যাদের পাকা বাড়ি, কোনও ক্ষতিই হয়নি তারা কুড়ি হাজার করে সরকারি ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছে।”

গোসাবার বিডিও বলেন, “জেলায় সব ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে কিছু মানুষ টাকা পাননি তাঁদের প্রয়োজনীয় তথ্য ভুল থাকার কারনে। সেগুলি সংশোধন করে আবার জমা দিতে বলা হয়েছে।”

উত্তর ২৪ পরগনা জেলা তৃণমূলের কো-অর্ডিনেটর গোপাল শেঠ বলেন, ‘‘প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত একজনও ক্ষতিপূরণের টাকা থেকে বঞ্চিত হননি। ক্ষতিগ্রস্ত নন, অথচ টাকা পেয়েছিলেন, এ রকম আমাদের দলের যাঁরা ছিলেন তাঁরা সকলেই ফেরত দিয়েছেন। তবে বিরোধীদের অনেকে ফেরত দেননি।’’ একই বক্তব্য মথুরাপুরের তৃণমূল নেতা শান্তনু বাপুলির।

গোসাবার বিধায়ক জয়ন্ত নস্কর বলেন, ‘‘এই ব্লকের ক্ষতিগ্রস্তদের সিংহভাগই ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এই ব্লকে ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে বলে আমার জানা নেই।”

আরও পড়ুন

Advertisement