E-Paper

প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই মাধ্যমিকে বসছে নিশা

নিশা গাইঘাটার পাঁচপোতা ভারাডাঙা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী সে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৮
মায়ের কোলে নিশা।

মায়ের কোলে নিশা। নিজস্ব চিত্র।

মায়ের কোলে চেপেই জীবনের এক কঠিন পরীক্ষায় অংশ নিতে চলেছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী নিশা চক্রবর্তী। ছোট থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলা এই কিশোরীর স্বপ্ন—এক দিন সরকারি চাকরি করা।

গাইঘাটা ব্লকের মহিষাকাটি এলাকার বাসিন্দা নিশা জন্মের পর থেকেই এক বিশেষ রোগে আক্রান্ত। তাঁর উচ্চতা আড়াই থেকে তিন ফুটের বেশি নয়। ঠিক ভাবে দাঁড়াতে পারে না, চলাফেরা করতেও ভীষণ কষ্ট হয়। মায়ের কোলে চেপেই মূলত চলাফেরা করে। বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে রামচন্দ্রপুর পল্লি উন্নয়ন বিদ্যাপীঠে পরীক্ষাকেন্দ্রেও পৌঁছবে মায়ের কোলে চড়েই।

নিশা গাইঘাটার পাঁচপোতা ভারাডাঙা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। ছোট থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী সে। শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্রী, সহপাঠীদের কাছেও অনুপ্রেরণা। সহপাঠীরা যখন হেঁটে বা সাইকেলে স্কুলে যায়, তখন নিশাকে স্কুলে আসতে হয় মায়ের কোলে করেই।

পড়াশোনার পথটা সহজ নয় তার কাছে। লিখতে গেলে হাত কাঁপে, পড়তে গেলে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। তবুও দু’চোখে স্বপ্নে কোনও ঘাটতি নেই। নিশা বলে, “আমি ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি করতে চাই। বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে চাই।”

নিশার বাবা দেবকুমার চক্রবর্তী পেশায় একজন ফুচকা বিক্রেতা। মা শ্যামলী চক্রবর্তী গৃহবধূ। দুই মেয়ের সংসার। অর্থের অভাবে নিশার নিয়মিত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। তবে মেয়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে কখনও হার মানেননি বাবা-মা। তাঁরা মানসিকভাবে সবসময় মেয়ের পাশে থেকেছেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকতে ভালোবাসে নিশা। ইটের দেওয়াল আর ত্রিপলের ছাউনির ছোট্ট ঘরে বসেই জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের জগৎ দেখে। সেই দেখা দৃশ্যই রঙ-তুলিতে ফুটে ওঠে সাদা কাগজে। খেলাধূলা করার ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মনোবল ভাঙতে পারেনি কোনও প্রতিবন্ধকতাই।

সরকারি মানবতা ভাতা হিসেবে মাসে এক হাজার টাকা পেলেও তাতে সন্তুষ্ট নয় সে। নিশার স্পষ্ট বক্তব্য, “ভাতা নয়, পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।”

মেয়ের স্বপ্নই বাবা-মায়ের বেঁচে থাকার শক্তি। বাবা দেবকুমার বলেন, “ও যদি একটা চাকরি পায়, তাহলে এই লড়াই সার্থক হবে।” মা শ্যামলী বলেন, “যত কষ্টই হোক, মেয়ে যত দূর পড়তে চায়, আমরা পাশে থাকব। ওর স্বপ্ন বাস্তব হোক—এটাই চাই।”

শিক্ষক শিক্ষিকারা মনে করছেন, নিশার গল্প শুধুমাত্র এক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর নয়, এ’টি অদম্য মানসিক শক্তির প্রতিচ্ছবি। শারীরিক সীমাবদ্ধতা, আর্থিক অনটন এবং সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও সে যে স্বপ্ন দেখে, তা বহু স্বাভাবিক মানুষের কাছেও অনুপ্রেরণা হতে পারে। প্রশাসনিক সহায়তা, চিকিৎসা ও শিক্ষাগত বিশেষ সুবিধা পেলে নিশার মতো বহু প্রতিভা সমাজে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

madhyamik exam Bangaon Gaighata

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy