সকালের ছবিটা বদলে গেল বেলা গড়াতেই।
‘নো হেলমেট নো পেট্রোল’— মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশ ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের হাত ঘুরে সোমবার ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের পেট্রোল পাম্পগুলিতেও পৌঁছে গিয়েছে। যে নিয়ম না মানলে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারায় যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে বলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তাই সপ্তাহের প্রথম কাজের দিনটিতে বিনা হেলমেটে পেট্রোল পাম্পে তেল নেওয়ার ছবিটা চোখে পড়লেও দ্বিতীয়ার্ধে দেখা গেল বেশ কড়াকড়ি। পুলিশি পাহারার প্রয়োজন হয়নি। সিসি ক্যামেরা থাকায় পেট্রোল পাম্পগুলির কর্তৃপক্ষই সচেতন থেকেছেন এ ব্যাপারে।
রবিবার বেশি রাতে পেট্রোল পাম্পগুলিতে তেল নিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা না দেওয়ার প্রবণতা আছে উঠতি মস্তানদের। তার জেরেই মূলত এক্সপ্রেসওয়ে ও বিটি রোড সংলগ্ন পেট্রোল পাম্পগুলিতে এক সময়ে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন পাম্প মালিকেরা। এখন পুলিশের টহলদারি ভ্যানের থেকে ওই সিসি ক্যামেরাকেই বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছেন কমিশনারেটের কর্তারা। শুধু নির্দিষ্ট দিনের ব্যবধানে ওই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এমনিতেও প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের মালিককে সতর্ক করা হয়েছে, যাতে হেলমেট ছাড়া তাঁরা কোনও দু’চাকা গাড়ির আরোহীকে পেট্রোল না দেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের যেন অন্যথা কোনও ভাবেই না হয়, সে বার্তা স্পষ্ট করা হয়েছে।
কিন্তু স্বভাব কী একদিনেই বদলাবে?
হেলমেট ছাড়াই বীরদর্পে পেট্রোল পাম্পে পৌঁছনোর পরে তেল মিলবে না শুনে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন এক যুবক। সবিনয়ের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন শ্যামনগরের ওই পেট্রোল পাম্পের কর্মী। হাত জোড় করেই ক্রেতাকে তিনি বললেন, ‘‘এ তো স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ। কী করব বলুন, আপনাকে ১০০ টাকার পেট্রোল দিয়ে আমার চাকরিটা যে চলে যাবে!’’
উদ্ধত যুবক মুখ্যমন্ত্রীকে যতই কড়া বাক্যবাণে বিদ্ধ করুন না কেন, শেষমেশ ডাল গলেনি। পেট্রোল না নিয়েই ফিরতে হয়েছে ওই যুবককে। অন্য একজন যুবককে দেখা গেল, পাম্প থেকে বেরোতেই দূরে দাঁড়ানো আর একজন বাইক আরোহীকে হেলমেট হস্তান্তর করছেন। জানা গেল, নিজের হেলমেট না থাকায় তেল ভরতে বন্ধুর হেলমেট ধার করেছিলেন!
জগদ্দলের হাঁসিয়ার একটি পেট্রোল পাম্পের মালিক তাপস চক্রবর্তী আবার অন্য চাপে পড়েছেন। বললেন, ‘‘এ বার আমি বা পাম্পের কর্মীদের দেখছি মোটরবাইকে আসাটা বন্ধ করতে হবে। না হলে চেনা ক্রেতারা এসে খালি আমাদের হেলমেট মাথায় দিয়ে তেল ভরতে চাইছেন। সব ক্ষেত্রে অনুরোধ ফেলাও যায় না। আবার রাখাও বিপদ।’’
সোমবারের এই নির্দেশিকা শুধু ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটেই নয় বারাসত, বনগাঁ ও বসিরহাটের পেট্রোল পাম্পগুলোতেও কার্যকরী হয়েছে। বনগাঁর এক পেট্রোল পাম্প মালিক বলেন, ‘‘আপাতত মোটরবাইক চালকের মাথাতেই হেলমেট আছে কিনা, সেটা দেখে তেল দিচ্ছি আমরা। সঙ্গের আরোহীর মাথায় হেলমেট না থাকলেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাইক আরোহীদের বোঝা উচিত, এই নিয়ম তাঁদের ভালর জন্যই।’’
সদ্য তৈরি করা এই নিয়মে অভ্যস্ত হতে যে আরও কিছু দিন সময় লাগবে, তা মানছেন মোটরবাইক আরোহীরা। সম্প্রতি বাইক নিয়ে ভারত ভ্রমণ করে আসা ডানলপের বাসিন্দা বীরেন্দ্র সিংহ মানসাহিয়া বলেন, ‘‘মোটরবাইক মানেই যে তার সঙ্গে হেলমেট, জুতো বাধ্যতামূলক তা এখনও মানুষের অজানা। মোটরবাইকের গতিতে সওয়ার হতে গেলে যে নিয়মগুলি মানতে হয়, সে সব আমরা ক’জন জানি? ক’জনকেই বা লাইসেন্স দেওয়ার সময়ে বাধ্যতামূলক ভাবে এ সব শেখানো হয়?’’
তবে হেলমেট পরার এই জবরদস্তিতে হেলমেট বিক্রি বেড়েছে খানিকটা। হালকা হেলমেটের চাহিদা সব থেকে বেশি। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে হেলমেটের বড় দোকানগুলির মধ্যে একটির মালিক কৌশিক বসু বলেন, ‘‘৫০০-৫০০০ টাকা দামের হেলমেট বিক্রি হচ্ছে। তবে সব থেকে বেশি বিক্রি হচ্ছে হালকা ও সামনে ফাইবার গ্লাস লাগানো হেলমেট।’’ তিনি জানালেন, অন্য দিন যদি গড়ে ১০টা হেলমেট বিক্রি হয়, সোমবার তা হলে সেই সংখ্যাটা অন্তত পাঁচগুণ বেড়েছে।